নামাজের ফরয ও ওয়াজিব ও নামাজ ভঙ্গের কারন কি কি?


অজুর নিয়ত, তায়াম্মুম কিভাবে করে, নামাজের ফরয কয় টি, নামাজের বাহিরে  কয় টি ফরয, নামাজের ভিতরে কয় টি ফরয, নামাজের ওয়াজীব কয় টি ও কি কি, নামাজের ভিতর কথা বলা কি, নামাজের মধ্যে কথা বলা যাবে, মসজিদে গল্পগুজব করলে কি হয়, নামাযের মধ্যে কি কি পড়তে হয়, নামাজ ভঙ্গের কারণ কি কি? নামাজ ভঙ্গের কারণ কয়টি, সংগৃহীত
image google

গত জানুয়ারির ঘটনা। একটা মাহফিলে গিয়েছিলাম ওয়াজ শুনতে। মাহফিল চলাকালীন সময়ে এশার আযান হলে সবাই নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। আমার পাশে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন তার ওজু ছিলো না। আর এই মুহূর্তে যে ওজু করবেন তারও কোনো সুযোগ নেই। মাহফিলে অনেক লোক সমাগম হয়েছিলো বিধায় বেরিয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিলোনা। তাই তিনি মাটিতে হাত ঘষে তায়াম্মুম করতে লাগলেন।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার তায়াম্মুম করা দেখছিলাম এবং আমি বেশ অবাক হলাম যখন দেখলাম তিনি ওজুর নিয়মে তায়াম্মুম করছেন। এই বয়সেও উনি তায়াম্মুমের নিয়ম জানেননা? উনার কাজ শেষ হলে আমি বললাম, ভাইয়া কিছু মনে করবেননা, আপনার তায়াম্মুম করা হয়নি। এই বলে আমি তাকে তায়াম্মুমের নিয়ম শিখিয়ে দিলাম। তখন তিনি আবার সঠিক নিয়মে তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করলেন।

শুধু ঐ ব্যক্তিই না, এমন অনেকেই আছে যারা ইসলামের বেসিক বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ বলা যায়। ফরয গোসল, তায়াম্মুম, ওজু, নামাজ ইত্যাদি বিষয়ে অনেকেই সঠিকভাবে জানেনা। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য। বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকে লজ্জায় কারো কাছে জিজ্ঞেসও করেনা। অথচ এগুলো জানা খুবই প্রয়োজন।

আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, আমরা ছোটবেলা একসাথে সুর করে এগুলো শিখতাম। শুধু মুখে মুখেই শিখতামনা, আমরা এগুলো ব্যবহারিকভাবেও শিখতাম। স্কুলের বারান্দায় পা রাখার আগেই বেসিক বিষয়গুলো মোটামুটি শিখা হয়ে যেত। কিন্তু এখন অনেক সময় ইন্টারপড়ুয়া ছাত্রকেও যদি এগুলো জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে বোবার মত চেয়ে থাকে। এরচেয়ে বড়রাও অনেক সময় পারেনা।

ছোটবেলা আমরা কত সুন্দর করে সুর দিয়ে পড়তাম, 'তায়াম্মুমের ফরয তিনটি। এক নম্বর- নিয়ত করা। দুই নম্বর- পাক মাটিতে হাত মাড়িয়ে সমস্ত মুখমণ্ডল মাসেহ করা। তিন নম্বর- পাক মাটিতে হাত মাড়িয়ে দুই হাতের কনুই পর্যন্ত মাসেহ করা।

তায়াম্মুমের নিয়ম হলো নিয়ত করে শুধু মুখ আর দুই হাত মাসেহ করা। এছাড়া আর কিছু লাগেনা।

[১] এজন্য প্রথমে পবিত্র মাটি খুঁজে নিয়ে তাতে উভয় হাতের তালু ঘষে নিতে হবে। এরপর ভালোভাবে সমস্ত মুখ মাসেহ করতে হবে।

[২] মুখ মাসেহ করা শেষ হলে আবার মাটিতে আগের মতো হাত ঘষে নিয়ে উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত মাসেহ করতে হবে ভালোভাবে।

তবে মাটি অবশ্যই পবিত্র হতে হবে। আর মাটি জাতিয় সব কিছুতে তায়াম্মুম করা যায়। কিন্তু বাশ, স্টিল, তামা, লোহা ইত্যাদি যেগুলো মাটি জাতিয় নয় সেগুলোতে তায়াম্মুম হবে না। কিন্তু যদি এতে ধুলো জমে থাকে তাহলে তায়াম্মুম হবে। আর হ্যা, তায়াম্মুম সবসময় করা যাবেনা। যদি পানি পাওয়া না যায় কিংবা কোনো শারয়ী ওজর থাকে কেবল তখনি তায়াম্মুম করা যাবে।

লেখক: নাবিল হাসান।

আরো পড়ুন:

অযুতে মোট আঠারোটি সুন্নাত আছে। যার উপর আমল করলে উযু পরিপূর্ণ হবে এবং হাদীসে বর্ণিত উযুর সকল ফযীলতও অর্জিত হবে।

১: উযুর নিয়ত করা। (অর্থাৎ আল্লাহ্ পাকের একটি মহান হুকুম তথা নামায আদায়ের জন্য উযু করছি, একথা মনে করা) (নাসায়ী শরীফ ১২ পৃঃ)

২: بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ  বলে উযু শুরু করা। হাদীসের কোন কোন রেওয়ায়েতে উযুর বিসমিল্লাহ্ এরূপও এসেছে। بِسْمِ اللهِ الْعَظِيْمِ وَالْحَمْدُ لِِلّه عَلى دِيْنِ الْإِسْْلَامِ
(ফতোয়ায়ে শামী ১ঃ ১০৯ পৃঃ)

৩: উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত (তিনবার) ধোয়া। (আবু দাউদ শরীফ ১ঃ১৫পৃঃ)

৪: মিসওয়াক করা। মিসওয়াক না থাকলে আংগুল দ্বারা দাঁত মেজে নেওয়া। (মারাকিউল ফালাহ্ ৩৭-৩৮-পৃঃ)

৫: তিনবার কুলি করা। (আবু দাউদ শরীফ ১ঃ১৪ পৃঃ)

৬: তিনবার নাকের ভেতর পানি দেওয়া, এবং প্রতিবার পানি দেওয়ার পর নাক ঝাড়া। (আবু দাউদ শরীফ ১:১৪ পৃঃ)
ফায়দা ঃ যদি রোযাদার না হয়, তাহলে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়ার সময় আধিক্য করা। অর্থাৎ ভাল ভাবে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া, অবশ্য রোযাদারের জন্য এটা নিষেদ। (আবু দাউদ শরীফ ১ঃ১৯ পৃঃ)

৭: প্রত্যেক অংগ তিনবার করে ধোয়া। (বুখারী শরীফ ১ঃ৭পৃঃ)

৮: মুখ ধোয়ার সময় আংগুল দিয়ে দাড়ি খিলাল করা। (আবু দাউদ শরীফ ১ঃ১৯ পৃঃ)
ফয়দা ঃ দাড়ি খিলাল করার সুন্নাত তরীকা হলো, তিনবার মুখ ধোয়ার পর ডান হাতে পানি নিয়ে থুতনীর কাছাকাছি চোয়ালে ঢালবে এবং হাতের তালু গলার দিকে রোখে দাড়ি খিলাল করবে। (আবু দাউদ শরীফ, ফাতোয়ায়ে শামী ১ঃ১১৭ পৃঃ)

৯: হাত, পা ধোয়ার সময় হাত ও পায়ের আংগুল সমূহ খিলাল করা। (আবু দাউদ শরীফ ১ঃ১৯পৃঃ)

১০: একবার পৃর্ণ মাথা মাসেহ করা। (ফাতোয়ায়ে শামী, ১ঃ১২০ পৃঃ)

১১: মাথা মাসেহ করার সাথে সাথে উভয় কান মাসেহ করা। (নাসায়ী শরীফ ১ঃ১৬ পৃঃ)

১২: মাথার সামনের দিকে থেকে মাসেহ আরম্ভ করা। (বুখারী শরীফ ১ঃ৩১ পৃঃ)

১৩: গর্দান মাসেহ করা, গলা মাসেহ না করা। কারন গলা মাসেহ করা বিদ'আত। (মারাকিউল ফালাহ ৪১ পৃঃ)

১৪: উযুর সবকটি অংগ ডলে ডলে ধোয়া। যাতে সামান্য অংশও শুকনো না থাকে। (মারাকিউল ফালাহ্ ৪০ পৃঃ)

১৫: উযুর, মাঝখানে অযথা বিলম্ব না করা। অর্থাৎ এক অংগ ধোয়া শেষ করে সাথে সাথে অন্য অংগ ধোয়া শুরু করা। (মারাকিউল ফালাহ্ ৪০ পৃঃ)

১৬: তারতীবের সাথে উযু করা। (অর্থাৎ ঃ কুরআনে পাকে উযু সম্পর্কে বর্নিত ক্রমধারা যেমন, প্রথমে মুখ, অতঃ পর হাত ধোয়া, তারপর মাথা মাসেহ করে পা ধোয়া) (হিদায়া ১ম খন্ড)

১৭: প্রথমে ডান দিক থেকে ধোয়া। (অর্থাৎ ঃ আগে ডান হাত, ডান পা ইত্যাদি ধোয়া, অতঃপর বাম হাত, বাম পা ইত্যাদি ধোয়া) (বুখারী শরীফ ১ঃ২৮ পৃঃ)

১৮: উযুর মাঝে এ দু'আ পড়া।
أَللهُمَّ اغْفِِرْلِيْ ذَنْبِيْ وَ وَ سِّعْ لِيْ فِيْ دَارِيْ وَ بَارِكْ لِيْ فِيْ رِزْقِيْ - অর্থ ঃ হে আল্লাহ ! আমার গোনাহ্ মাফ করুন, আমার ঘরকে প্রশস্ত করে দিন, এবং আমার রিযিকে বরকত দিন। (নাসায়ী শরীফ)

১৯: উযু শেষ করে প্রথমে কালিমায়ে শাহাদাত পড়া।:  أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ -অর্থাৎ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতিত কোন মাবুদ নেই, তিনি এক তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্যি দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর এ দু'আ পড়া >
 اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَوَّابِينَ ، واجْعَلْني مِنَ المُتَطَهِّرِينَ ،

অর্থাৎ ঃ হে আল্লাহ্ আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভূক্ত করুন এবং পবিত্রতা লাভকারীদের অন্তর্ভূক্ত করুন। (! তিরমিযী শরীফ ১ঃ১৮ পৃঃ)

ফায়দা: এ দু'আ সম্পর্কে মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) লিখেছেন যে, উযুতে বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জিত হয়, আর এখানে আল্লাহ্ পাকের নিকট অন্তরের (আধ্যাত্নিক) পবিত্রতা লাভের দু'আ করা হচ্ছে। অর্থাৎ বাহ্যিক পবিত্রতা লাভের বিষয়টি আমাদের সাধ্যের ভিতরে ছিলো, তা আমরা করেছি, এখন আপনি নিজ দয়ায় আমাদের অন্তরকেও যাবতীয় পাপ চিন্তা থেকে পবিত্র করে দিন। (মিরকাত শরহে মিশকাত)

২০: উযুর বেঁচে যাওয়া (অতিরিক্ত পানি) দাড়িয়ে পান করা সুন্নাত। 

উযুর ফরয সমূহ

মনেরাখা দরকার যে, উপেরে উল্লেখিত বিষয় উযুর সুন্নাত, তবে উযুর মধ্যে চারটি বিষয় ফরয, যদি এর মধ্য হতে একটিও বাদ পড়ে কিংবা কোন একটি পরিপূর্ণরূপে আদায় না হয়, তাহলে উযুই হবে না বরং পূর্বের ন্যায় উযুহীনই থেকে যাবে। 

উযুর ফরয চারটি

১: একবার সমস্ত মুখ ধোয়া। (অর্থাৎ কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনীর নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি হ'তে অপর কানের লতি পর্যন্ত) 

২: একবার কুনুই সহ উভয় হাত ধোয়া। 

৩: মাথায় চার ভাগের একভাগ একবার মাসেহ্ করা। 

৪: উভয় পা টাখনু সহ একবার ধোয়া।

উপরোক্ত চারটি কাজ করলেই উযু হয়ে যাবে, তবে পূর্বে বর্ণিত সুন্নাত তরীকা অনুযায়ী উযু করলে উযু পরিপূর্ণ হবে এবং অধিক ছওয়াব পাওয়া যাবে। 

আরো:

নামাজের ফরয ১৩ টি

[৭ টি নামাজের বাহিরে ]
১/ শরীর পাক
২/কাপড় পাক
৩/ নামাজের জায়গা পাক
৪/ সতর ডাকা
৫/ কেবলামুখী হওয়া
৬/ নামাজের ওয়াক্ত চেনা
৭/ নিয়্যাত করা

[ ৬ টি নামাজের ভিতরে ]
১/ তাকবীরে তাহরিমা বা আল্লাহু আকবার বলা
২/ দাঁড়াইয়া নামাজ পড়া
৩/ কেরাত পড়া
৪/ রুকু করা
৫/ সেজদা করা
৬/ শেষ বৈঠক

নামাজের ওয়াজিব ১৪টি
১/ সুরা ফাতিহা পড়া
২/ সুরা ফাতেহার সঙ্গে সুরা মিলানো
৩/ রুকু ও সেজদায় দেরী করা
৪/ রুকু হইতে সোজা হইয়া দাঁড়ানো
৫/ দুই সেজদার মাঝখানে সোজা হইয়া বসা
৬/ দরমিয়ানী বৈঠক
৭/ দুই বৈঠকে আত্ত্যাহিয়াতু পড়া
৮/ ঈমামের জন্য কেরাত আস্তের জায়গায় আস্তে পড়া এবং জোড়ের জায়গায় জোড়ে পড়া
৯/ বিতিরের নামাজে দোয়া কুনুত পড়া
১০/ দুই ঈদের নামাজে ছয় তকবীর বলা ৷
১১/ ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাত কেরাতের জন্য নির্ধারিত করা ৷
১২/ প্রত্যেক রাকাতের ফরজ গুলির তরতীব ঠিক রাখা৷
১৩/ প্রত্যেক রাকাতের ওয়াজিব গুলির তরতীব ঠিক রাখা ৷
১৪/ আসসালামু আ'লাইকুম ও'রাহ...বলিয়া নামাজ শেষ করা

১৯টি কারণে নামাজ ভঙ্গ হয়ে থাকে
১/ নামাজে অশুদ্ধ কোরআন পড়া ৷
২/ নামাজের ভিতর কথা বলা ৷
৩/ নামাজের ভিতর কাউকে সালাম দেওয়া
৪/ নামাজের ভিতর সালামের উত্তর দেওয়া
৫/ নামাজের মধ্যে বিনা ওজরে কাশি দেওয়া
৬/ নামাজের ভিতরে ওহ্ আহ্ শব্দ করা
৭/ নামাজের মধ্যে আমলে কাছির করা ( মোক্তাদি হয়ে ঈমামকে অনুসরন না করা)
৮/ নামাজের মধ্যে বিপদে ও বেদনায় শব্দ করা
৯/ নামাজের মধ্যে তিন তজবী পরিমান সতর খুলিয়া রাখা
১০/ মোক্তাতী ব্যতীত অপর ব্যক্তির লোকমা লওয়া
১১/ সুসংবাদ ও দুঃসংবাদের উত্তর দেওয়া
১২/ নাপাক জায়গায় সেজদা করা
১৩/ কেবলার দিক হইতে সীনা ঘুরিয়া যাওয়া
১৪/ নামাজের মধ্যে কোরআন শরীফ দেখিয়া পড়া
১৫/ নামাজের মধ্যে শব্দ করিয়া হাসা ৷
১৬/ নামাজের মধ্যে সাংসারিক বা দুনিয়াবী প্রার্থনা করা
১৭/ নামাজের মধ্যে হাচির উত্তর দেওয়া
১৮/ নামাজের মধ্যে খাওয়া ও পান করা
১৯/ ঈমামের আগে মুত্তাদী নামাজে দাঁড়ান।

এই নিয়ম গুলো মানার চেষ্টা করুন । (আমিন)

Post a Comment

0 Comments