রোজা রাখার নিয়ম এবং রোজা ভঙ্গের কারণ কি কি? কি করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে?


রোজা রাখার নিয়ম এবং রোজা ভঙ্গের কারণ কি কি? কি করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে?

يَأَ يُّهَاالَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَي الَّذِين مِن قَبلِكُم لَعَلَّكُم تَتَّقُونَ .................الآية

অর্থ হে ঈমানদারগন পূর্ববর্তী লোকদের উপর. যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো. (আয়াত: ১৮৩ সুরা: বাকারা )

حَدَّثَنَا يَحيى بنِ بُكَيرٍ .حَدَّثَنِي الَّيثُ عَن عُقَيلٍ عَن بنِ شِهَابٍ .قَالَ أَخبَرَ نِي سَالِمُ أَنَّ إِبنَ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنهُمَا .قَالَ سَمٍعتُ رَسُولَ اللهُ صلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ " إِذَا رَأَيتُمُوهُ فَصُو مُوا،وَإِذَا رَأَيتُمُوهُ فَأفطِرُو ا،فَإِن غُمَّ عَلَيكُم فَاقدُرُوالَهٌ "وَقَالَ غَيرُهٌ عَنِ الَّيثِ حَدَّثَنِي عُقَيلُ وَيُونُسَ لِهِلَالِ رَمَضَانَ.  أَو كَمَا قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ.

অর্থঃ ইয়াহহিয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা তা (চাঁদ) দেখবে তখন সাওম (রোযা/ রোজা/ সিয়াম/ ছিয়াম) পালন করবে, আবার যখন তা দেখবে তখন ইফতার বন্ধ করবে। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে তাঁর সময় হিসাব করে (ত্রিশ দিন) পূর্ণ করবে।

ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) ব্যতীত অন্যরা লায়স (রহঃ) থেকে ‘উকায়লা এবং ইউনুস (রহঃ) সূত্রে বর্ননা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি বলেছেন রমযানের চাঁদ সম্পর্কে  (সহীহ বুখারী. হাদীস নং ১৯০০) মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর বাণী ও রাসুলুল্লাহ সাঃ এর হাদিস দ্বারা আমাদের উপর রোজা ফরজ হওয়ার বিষয়টা বুঝে আসে।

এবং আয়াতে কারিমার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা আমাদের কে সান্তনা ও দিয়ে যাচ্ছেন যে এই রোজা শুধু তোমাদের উপর নয় তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ও ফরজ করা হয়েছিলো। হাজার লাখ ও কোটি শোকর যে আল্লাহ তায়ালা আমাদের কে তিনার এই মহান হুকুম আদায় করার জন্য তৌফিক দান করেছেন আমিন।

.صوم : এর অর্থ হলো।

শরীয়তের পরিভাষায়: পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম হলো`সওম`তবে সুবহে সাদেক উদয় হওয়া থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একাধারে এভাবে বিরত থাকলেই তা রোযা বলে গণ্য হবে।

তবে শর্ত হলো রোযার নিয়ত লাগবে। নিয়ত ছাড়া কোন ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়না, তাই প্রতিদিন আমাদেরকে খেয়াল করে রোযার নিয়ত টা করে নিতে হবে। যা অপরিহার্য রোযা আদায় হওয়ার জন্য।

আমাদের রোযা রাখা অবস্থায় কিছু জিনিস খেয়াল করা খুবই জরুরি যে গুলা খেয়াল না রাখার কারণে আমাদের অনেকের রোযা আদায় হচ্ছেনা বা আদায় হলেও মাকরুহ হয়ে যাচ্ছে। যেটাকে আমরা সহজ ভাষায় হালকা হয়ে যাওয়া বলে থাকি।

প্রথমে নিয়ত যেটার কথা একটু আগেই বল্লাম খেয়াল করে আমাদের কে এই কাজ টা করে নিতে হবে।

রোজার নিয়ত আরবি:

نَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضَا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّل مِنِّى اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم

আরবি নিয়ত: নাওয়াইতু আন আছুম্মা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।

বাংলায় নিয়ত: হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ (নিয়্যত) করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে (আমার রোযা তথা পানাহার থেকে বিরত থাকাকে) কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী। এটা না করলে আপনার রোযা আদায় হবেনা।

দ্বিতীয়ত: কোন ভাবে কোন জিনিস মস্তিষ্কে বা পেটে যেন না যায় যদি এমনটি হয়ে যায় তাহলে আপনার রোযা আদায় হবে না। সেটি পূনরায় কাজা বা কাফফারার মাধ্যমে আদায় করে নিতে হবে।

অনেকে দুর্বলতার কারণে শরিরের মধ্যে ইনজেকশন বা স্যালাইন দিয়ে থাকেন সেটার কারণে রোযা নস্ট হবে না। কারন এগুলোর কোনটাই পেটে বা মস্তিষ্কে যায়না. যদিও এসব এর মাধ্যমে ক্ষুধা নিবারন হয় এবং কেহ কাউকে রক্ত দান করলে ও একি হুকুম রক্ত গ্রহীতার ও রোযা ভঙ্গ হবে না। যে রক্ত দিলো তার ও রোযা ভঙ্গ হবেনা (ফাতওয়ায়ে দারুল উলুম দেউবন্দ ৬/৪০৮ আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৪২২ বাদায়িউস সানায়ে ২/৯৩ ফাতওায়ে শামী ২/৩৯৬)

স্ত্রীর সাথে সহবাস তো করা যাবেইনা রোযা অবস্থায়. আর এমন কোন স্ত্রী সূলভ আচরন ও করা যাবেনা যার কারণে বীর্যপাত হয়ে যায়, অন্যথায় রোযা হবেনা। এবং কেহ হস্তমৈথুনের মাধ্যমেও যদি বীর্যপাত ঘটায় তার ও রোযা নস্ট হয়ে যাবে।

তাই রোযা অবস্থা স্ত্রীর সাথে এমন আচরন করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন যার দ্বারা বীর্যপাত ঘটার সম্ভাবনা থাকে তবে হ্যাঁ যদি বীর্যপাত না হওয়ার পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা থাকে তাহলে এমন করার দ্বারা সমস্যা নাই রোযা ঠিক থাকবে।

নিশ্চয়তা না থাকা অবস্থায় এমন কিছু করে বসলে এবং বীর্যপাত হয়ে যায় তাহলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর বীর্যপাত না হলেও নিশ্চয়তা না থাকা শর্তে ও এরুপ করার দ্বারা রোযা মাকরুহ হয়ে যাবে। তাই আমরা যারা বিবাহিত বিবাহিতা আছি তাদের এসব বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি. রোযা অবস্থা স্বপ্ন দোষের কারণে বীর্যপাত হলে রোযা ভঙ্গ হবেনা। (ফাতওয়ায়ে শামী ২/৪০৪)

রোযা অবস্থায় কোন এমন কিছু মুখে দেওয়া মাকরুহ যা পেটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে যেমন রোযা রেখে ট্রুথপেস্ট দিয়ে দাত মাজন করা বা অন্য কিছু দিয়ে হলেও যা পাকস্থলীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, গুল ব্যবহার করা ইত্যাদি (ফাতওয়া শামী ২/৪১৬ ফাতওয়া আলমগীরী ১/২৬১)

রোযা অবস্থায় নামাজের ওজুতে কুলি করার সময় গরগরা করা মাকরুহ নাকে পানি দেওয়ার সময় নরম জায়গা পর্যন্ত পৌঁছানো মাকরুহ (ফাতওয়া আলমগীরী ১/২৬২)

রোযা অবস্থায় মুখের থুথু গিলে ফেলার দ্বারা রোযার কোন ক্ষতি হবেনা। তবে ইচ্ছাকৃত থুথু জমা করে সেগুলা গিলে ফেলা মাকরুহ। (ফাতওয়া আলমগীরী ১/২৬০)

রোযা অবস্থায় স্বামী স্ত্রী এমন কিছু করা মাকরুহ যার কারণে সহবাস বা বীর্যপাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে যেমন: চুম্বন করা খোশখোশগল্প করা ইত্যাদি তবে যদি সহবাস বা বীর্যপাত না হওয়ার পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা থাকে তাহলে এসব কাজের জন্য রোযার কোন ক্ষতি হাবেনা (ফাতওয়া শামী ২/৪১৭ ফাতওয়া আলমগীরী ১/২৬২)

রোযা অবস্থা যে কোন ধরনের গুনাহ করার দ্বারা রোযা মাকরুহ হয়ে যায় চাই সেটা যবান দ্বারা হোক (যেমন. মিথ্যা বলা /কারো গিবত করা) চাই চোখ দ্বারা হোক (যেমন. টেলিভিশন দেখা /শরীয়ত বিরোধী কোন ভিডিও ক্লিপ দেখা) চাই কান দ্বারা হোক (যেমন. গান বাদ্য ইত্যাদি শ্রবন করা) অথবা হাত'পা দ্বারা কোন গুনাহের কাজ করা (সুনানে তিরমিযী হা.নং ৭০৭)

যদি কোন ব্যাক্তি সেহরি খাওয়ার সময় উঠে দেখে যে তার বীর্যপাত হয়েছে. তখন সে পর্যাপ্ত সময় থাকলে গোসল করে নিবে যদি সময় না থাকে তাহলে হাত মুখ ধুয়ে সেহরি খেয়ে নিবে এতে রোযার কোন সমস্যা হবেনা। (আল-বাহরুর রায়িক ২/৪৭৬ ফাতওয়ায়ে কাসেমিয়া ১১/৪৬৮)

সেহরি বিলম্ব করে খাওয়া মুস্তাহাব। তবে এতো বিলম্ব করবেন না। যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে যায় যে সেহরির সময় আছে? নাকি সময় শেষ হয়ে গেল? কেননা এরুপ করার দ্বারা রোযা মাকরুহ হয়ে যায়। (ফাতওয়া আলমগীরী১/২৬২)

ইফতার তারাতারি করা সুন্নাত কেননা রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন. সাহল ইব্‌নু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: লোকেরা যতদিন শীঘ্র ইফতার করবে ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে। (আবূ দাউদ ২২৫৩, ইব্‌নু মাজাহ ১৬৯৮) সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৯৫৭ হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন। রোযাদার ব্যাক্তির জন্য দুইটি আনন্দের মুহুর্ত রয়েছে একটি হলো ইফতারের সময় অন্যটি হলো পরকালে মহান আল্লাহ তায়ালার দিদার।

তাই আসুন আমরা আল্লাহর দরবারে দু'হাত তুলে প্রার্থনা করি আমরা যেন যথানিয়মে রোযা রেখে এই দুই আনন্দে আনন্দিত হওয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন আমিন
ছুম্মা আমিন।

লেখা: হাঃ মোহাম্মাদ সাজ্জাদুর রহমান

©obohelalife-blog/অবহেলা জীবন

Tags: কোরআন ও হাদীস, রোজা রাখার নিয়ম এবং ফযীলত, রোজা ভঙ্গের কারণ কি কি?, কি করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে?


Post a Comment

0 Comments