এ ভালোবাসা তোমাকে পেতে চায় কেনো বারে বার? ভালোবাসার গল্প


এলোমেলো তোমার আমার ভালোবাসার গল্প, ভালোবাসার গল্প, ভালোবাসার ছন্দ, ভালোবাসার কথা, ভালোবাসার ছবি, ভালোবাসার পিক, ভালোবাসা মানে কি, ভালোবাসা কাকে বলে গল্প, ভালোবাসা নিয়ে কিছু কথা, ভালোবাসা অভিমানের গল্প, ভালোবাসা অবহেলার গল্প, ও ভালোবাসা শেখায় ছিলি নিজে আবার সরে গেলি, ও ভালোবাসা পুতুল গল্প, ও ভালোবাসা কেন অসহায় গল্প, ভালোবাসা আজকাল এমনই হয় গল্প, ভালোবাসা আসলে কি, ভালোবাসা আর ভালোলাগার পার্থক্য গল্প, ভালোবাসা উড়ে গেছে গল্প, ভালোবাসা এত কষ্ট কেন,  ভালোবাসা এমন একটা জিনিস, ভালোবাসা এক অদ্ভুত অনুভূতির গল্প, এ ভালোবাসা তোমাকে পেতে চায় কেনো বার বার, ভালোবাসা ও বিশ্বাস গল্প, ভালোবাসা ও ঘৃণা গল্প, ভালোবাসা ও আবেগ, ভালোবাসা এতো মায়া কেনো, ভালোবাসা কেন এত অসহায় Love Story bangla, ভালোবাসার খোঁজে Story bangla, ভালোবাসার গল্প কথা


সিগারেটটা ঠোঁটে দিতেই মাসুদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। থুতু ফেলে বলল সিগারেটের ফ্লিটারটা কে ভেজালো রে। সালা সিগারেটে টান দিস নাকি ফিডারের মতো চুষে খাস? মাসুদ আরেকবার থুতু ফেলে পাশের জনের দিকে সিগারেটটা এগিয়ে দিল।

নীতুকে রিকশায় করে আসতে দেখে মাসুদ বেঞ্চ থেকে উঠে দোকানের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। রিকশাটা চলে যেতেই মাসুদ বেড়িয়ে আসলো। নীতু তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাসুদকে লুকাতে দেখে নীতু দোকানের সামনে রিকশা থেকে নেমে গেছে। মাসুদ কিছু বলার আগেই নীতু বলল তুমি আমাকে দেখে লুকালে কেন? কোথায় লুকালাম?

মাসুদ সত্যি করে বলো তো সমস্যা কি তোমার। ফোন ধরছোনা, দেখা হলে লুকাচ্ছো। কি হয়েছে সেটা বলবে তো? আমার আবার কি হবে, ব্যস্ত থাকি তাই তোমাকে সময় দিতে পারি না। চায়ের দোকানে বসে চা সিগারেট খাওয়া। বাউণ্ডুলেদের মতো ঘুরে বেড়ানো। স্কুল কলেজ যাওয়া মেয়েদের দেখা। 
এটাকে ব্যস্ততা বলেনা।
তাহলে কি বলে?

মাসুদের প্রশ্ন শুনে নীতু চুপ করে আছে। আসলে মাসুদের আচরনকে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো শব্দ এই মুহূর্তে তার মাথায় আসছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে নীতু বলল, ‘চলো আমার সাথে, কিছু কথা আছে। তুমি বাসায় যাও। পরে ফ্রি হয়ে তোমাকে কল দিব। এখন ব্যস্ত আছি। তুমি কি আসবে আমার সাথে? বললাম না এখন ব্যস্ত আছি। ঘ্যানঘ্যান করো না তো। যাও এখন।

নীতুকে যেতে বলে মাসুদ নিজেই উল্টো দিকে দ্রুতপায়ে হেঁটে চলে গেল। মাসুদের বন্ধুরা যারা চায়ের দোকানে বসে ছিল তারা নীতুর দিকে তাকিয়ে আছে। নীতু কোন রকম অপমান হজম করে বাসার দিকে পা বাড়াল।

মাসুদ এক ধরণের দোটানায় ভুগছে। একদিকে নীতুর ভালোবাসা অন্যদিকে নীতুর অতীত। মাসুদ জানে নীতু তাকে ভালোবাসে। শুধু ভালোবাসে তা না। অনেক বেশি ভালোবাসে। ভালোবাসে বলেই এতো অবহেলা অপমান সহ্য করেও সম্পর্কটা টিকিয়ে রেখেছে। সে যে নীতুকে ভালোবাসেনা তা না। সেও নীতুকে অনেক বেশি ভালোবাসে কিন্তু হুট করে নীতুর অতীত সামনে আসায় সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে।

বন্ধুরা যখন আড্ডায় হাসি তামাশা করে নীতুর অতীত টেনে আনে তখন মাসুদের ভালোবাসাটায় কেমন যেন ভাটা পড়ে। মাসুদ কয়েকবার ভেবেছে সম্পর্কটা রাখবে না। কথাটা বলার জন্য নীতুকে কয়েকবার ফোন ও করেছে কিন্তু কেন যেন শেষ পর্যন্ত আর বলতে পারেনি। এ যেন না পারি রাখিতে না পারি ছাড়িতে অবস্থা।

মাসুদ পকেট থেকে ফোনটা বের করে নীতুকে কল দিল। রিং হচ্ছে নীতু ফোন ধরছে না। মাসুদ ফোনটা কেটে দিবে ঠিক সেই মুহূর্তে নীতু ফোনটা রিসিভ করে জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ বলো’।
নীতুর জড়ানো কণ্ঠ শুনেই মাসুদ বুঝতে পারল নীতু কান্না করছিল। মাসুদ বলল, কান্না করছিলে?
কই না তো। কান্না করব কেন?
আমি জানি তুমি কান্না করছিলে।
নীতু চুপ করে আছে। নীতুকে চুপ থাকতে দেখে মাসুদ বলল ‘তুমি কী যেন বলতে চেয়েছিলে।
ভুলে গেছি কী বলতে চেয়েছিলাম। আচ্ছা আমি ফোন রাখছি বাসায় বাবা আছেন।’
নীতু ফোনটা রেখে দিল।

কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলল লুবনা। দরজা খুলেই একটা হাসি দিল। তাকে দেখে হাসি দেয়ার কোন কারন নেই। নিজের স্বামীকে খুশি করার জন্য সে হাসতে পারে, মাসুদ তার স্বামী নয়। মাসুদের কাছে লুবনার এই হাসিটা বিরক্তিকর লাগে। লুবনা মুখের হাসিটা ধরে রেখে বলল, ‘তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। গোসল করে খেয়ে নাও। তোমাকে সাথে নিয়ে একটু বের হব।

মাসুদ কথার জবাব না দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। লুবনা মেয়েটা তাকে তুমি করে ডাকে যা মাসুদের মোটেও পছন্দ না। লুবনা মেয়েটা সম্পর্কে বড় হলেও বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট। মাসুদ শার্টটা খুলে চেয়ারের উপর রেখে বিছানায় ফ্যানের নিচে বসলো।
আয়েশা বেগম ছেলের বাসায় ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মাসুদের ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘আজাদ আজ দুপুরে বৌমাকে নিয়ে বের হতে চেয়েছিল। এখনো বাসায় ফিরেনি। বৌমা রাগ করে আজাদকে আর ফোন করেনি। বৌমা বলছিল তোকে নিয়ে বের হবে। কি যেন কেনাকাটা করবে।

মাসুদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মেয়েটা কি বলেছে সেটা আমাকে শুনতে হবে। তার খরচের ব্যাগ নিয়ে কুলির মতো তার পেছন পেছন ঘুরতে হবে। সে এসব করে কি বুঝাতে চাচ্ছে তার স্বামীর টাকায় সংসার চলছে? তাকে বলে দাও দোতলা বাসার নিচতলা থেকে যে ভাড়ার টাকা আসে, বাবার পেনশনের যে টাকা আসে তাতে আমারো ভাগ আছে। তার স্বামীর টাকা বসে বসে নষ্ট করছিনা।’
ছেলেকে রেগে যেতে দেখে আয়েশা বেগম বললেন, ‘রেগে যাচ্ছিস কেন? আস্তে বল। বৌমা শুনতে পাবে তো।
শুনতে পেলে পাবে। তাতে আমার কি?
‘সাথে গেলে কি হয়?
কিছু হয়না। আমি যাবোনা।

লুবনা এসে ব্যালকনিতে দাঁড়াল। মাসুদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনেছে সে। লুবনা এ বাড়িতে আসার পর থেকে বড্ড একা হয়ে পড়েছে। আজাদ সেই সকালে বাসা থেকে বের হয় ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। শাশুড়ির সাথে কি গল্প করবে ভেবে পায় না সে। আর মাসুদ কেন যেন তাকে সহ্য করতে পারে না।

গতকাল সকালে মাসুদের ঘরে চা নিয়ে যাওয়ায় মাসুদ বলেছে, আপনাকে তো আমি চা এনে দিতে বলিনি। আমার কিছু প্রয়োজন হলে আমি মাকে বলব। আমাকে নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে।’ যাকে বলে ভদ্র ভাবে অপমান করা। বিয়ের তিন মাসের মধ্যে আজাদ কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। আগে চোখের আড়াল হলেই ডাকাডাকি করত। সাজগোজ করতে বলত। এখানে সেখানে ঘুরতে নিয়ে যেত। এখন চেম্বার থেকে এসে খাওয়া গোসল করে শুয়ে পড়ে। লুবনার কিছুই ভালো লাগছে না। মনের মধ্যে এক ধরনের অশান্তি বাসা বাঁধতে শুরু করেছে।

আজাদ কম্পাউন্ডার ছেলেটাকে বলল, ‘বাইরে কি আর রোগী আছে?’
ছেলেটা খাতা দেখে বলল, ‘আর একজন আছে স্যার।’
‘তাহলে আজকে আর কোন সিরিয়াল দিও না। বিকালের পরে চেম্বারে আসব না। এর পরেরজনকে দেখেই বের হব।’
‘জ্বি আচ্ছা স্যার।’
আজাদ সামনে বসে থাকা মহিলাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার নাম?’
‘সানজিদা আক্তার।’
‘বয়স?’
‘ছাব্বিশ।’
আজাদ প্রেসক্রিপশনে নাম লিখল কিন্তু বয়স লেখার আগে মহিলার দিকে আরেকবার তাকাল। এই মহিলার বয়স তেত্রিশ-চৌত্রিশের কম হবে না। মহিলার পাশে একটা ছেলে বসা। আজাদ ছেলেটার দিকে ইশারা করে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কি হয় আপনার?’
‘আমার বড় ছেলে।’
আজাদ এবার ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার বয়স কতো?’
‘তেরো।’
আজাদ এবার মহিলার প্রেসক্রিপশনে বয়সের জায়গায় লিখল বত্রিশ। মহিলা প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে আজাদের দিকে তাকিয়ে বের হয়ে গেল। এবারে যেই মহিলা ঢুকলেন তিনি বোরখা পড়েছেন। চোখ দুটো ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চোখের নিচে কালি জমেছে। আজাদ লক্ষ্য করল মহিলার হাত কাঁপছে। বেশ কিছুক্ষণ হলো মহিলা এসে বসেছেন।

আজাদ কিছু জিজ্ঞাসা করছে না, মহিলাও কিছু বলছে না। আজাদ কম্পাউন্ডার ছেলেটাকে বাইরে যেতে বলল। মহিলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছো নাজিয়া?’
নাজিয়া অবাক হলো। সে সিরিয়ালে নাম দিয়েছে নেহা। রুমে ঢুকে কোনো কথা বলেনি। তার চোখ দুটো ছাড়া পুরো শরীর বোরখায় ঢাকা। এমনকি এই গরমে সে হাতমোজা পর্যন্ত পরেছে। নাজিয়া প্রথমে বোরখা খুলল। একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে বলল, ‘কিভাবে চিনলে?’
‘জানি না।’
‘তুমি কেমন আছো’ নাজিয়া জিজ্ঞাসা করল।
‘আছি ভালো আছি।’
‘সত্যি ভালো আছো।’ নাজিয়ার চোখে মুখে প্রশ্ন।
‘খাওয়ার রুচি নেই মনে হচ্ছে অনেক শুকিয়ে গেছ। রাতে মনে হয় ঘুম কম হয়, চোখের নিচে কালি জমেছে।’ জিজ্ঞাসা করল আজাদ।
‘খেতে ইচ্ছে করে না। মাঝ রাতে হুট করে ঘুম ভেঙ্গে কাকে যেন পাশে খুঁজি। তারপর আর ঘুম হয় না। জানালা খুলে বসে থাকি।

নাজিয়ার কথা শেষ হবার আগেই টেবিলের উপর রাখা ফোনটা বাঁজতে শুরু করল। আজাদ হাত বাড়িয়ে ফোনটা রিসিভ করল।
‘হ্যালো।’
‘কয়টা বাজে সেদিকে খেয়াল আছে?’ ফোনের ওপাশে লুবনার কণ্ঠস্বর।
‘আসছি’ বলে আজাদ ফোনটা রেখে দিল।
ফোনটা রাখতেই নাজিয়া প্রশ্ন করল, ‘বাসা থেকে ফোন করেছে?’
আজাদ কিছু বলল না। প্রেসক্রিপশনটা ভাঁজ করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। দরজা ঠেলে বের হয়ে আসলো। তার পেছন পেছন বের হয়ে আসলো নাজিয়া। অষুধের দোকান থেকে অষুধগুলো কিনে প্রেসক্রিপশন সহ নাজিয়ার হাতে দিল। একটা রিকশা ডেকে দিল। নাজিয়া রিকশায় বসে বলল, ‘তুমি যাবে সাথে। কিছুদূর গিয়ে নেমে যেও।’
আজাদ রিকশায় উঠে বসলো।

রাস্তার মোড়ে মাসুদকে সিগারেট ধরাতে দেখে নাজিয়া ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকল। তাতে কোন লাভ হলো না। মাসুদ নাজিয়া আর আজাদকে একসাথে দেখে ফেলেছে। রিকশা কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরে নাজিয়া আজাদকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মাসুদের চাকরি কি এখনো হয়নি?’
আজাদ বলল, ‘সারাদিন উড়নচণ্ডির মতো ঘুরে বেড়ালে চাকরি হবে কিভাবে? কবেই বিএসসি করেছে। মনে হয় না চাকরি বাকরি কিছু করবে।’
‘তুমি বড় ভাই আছো কী করতে? ওর সাথে তো কথা বলতে পারো। আচ্ছা নীতু নামের মেয়েটার কী খবর? মেয়েটা কিন্তু আমার অনেক পছন্দ। এক কাজ করতে পার নীতুর সাথে বিয়ে দিয়ে দাও দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।’
নাজিয়ার কথা শুনে আজাদ অবাক হয়ে বলল, ‘নীতু কে?’
‘নামটাই যখন শুনোনি তখন বলে কি হবে। পরে একসময় বলব।’
আজাদের ফোনটা বাঁজছে। নাজিয়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল লুবনা ফোন করেছে। আজাদ রিকশাওয়ালাকে থামতে বলল। আজাদ রিকশা থেকে নেমে ফোনটা রিসিভ করল। আজাদ হেঁটে চলে যাচ্ছে। নাজিয়া আজাদের দিকে তাকিয়ে আছে। রিকশাওয়ালা প্যাডেলে পা রাখতেই নাজিয়া রিকশাওয়ালাকে থামতে বলল। যতক্ষন আজাদকে দেখা গেল নাজিয়া তাকিয়ে থাকল।

যেই মেয়েটাকে কালকে এভাবে অপমান করেছে। যাকে কাঁদিয়েছে। সেই মেয়েটা বিকেলে দেখা করার জন্য অনুরোধ করছে। বিষয়টা সবার কাছে অদ্ভুত ও অগ্রহনযোগ্য হলেও যে মানুষটা কখনো কাউকে অনেক বেশি ভালোবেসেছে সেই মানুষটার কাছে বিষয়টা খুব স্বাভাবিক। বিকেল বেলা পার্কে মানুষের ভীড়টা ভালোই হয়। পার্কে ঢুকে একটু সামনে যেতেই মাসুদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। শীর্ণ দেহের এক বুড়ি যার গায়ের রঙ দিনের পর দিন রোদে পুড়ে গাঢ় কালো হয়ে গিয়েছে, গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। ছোট্ট একটা পুটলি থেকে সারাদিন ভিক্ষা করা কয়েনগুলো বের করে গুনছে। মাঝে মাঝে ঘেমে যাওয়া কপাল শাড়ির আঁচলে মুছছে। মাসুদ পার্ক থেকে বের হলো।

নীতু ঘাসের মধ্যে বসেছে। মাসুদের জন্য অপেক্ষা করছে, একটা দুটো করে ঘাস ছিঁড়ছে আর মুখে দিয়ে চিবুচ্ছে। মাসুদ থাকলে নিশ্চই ধমক দিত। নীতুর এই অভ্যাস মাসুদ খুব অপছন্দ করে। নীতু লক্ষ্য করল মাসুদ পার্কের গেইট দিয়ে ঢুকছে তার হাতে একটা পানির বোতল। গাছের ছায়ায় বসে থাকা এক বৃদ্ধাকে পানির বোতলটা দিল। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা দিল। নীতু এ কারনেই মাসুদকে এতো ভালোবাসে। কঠিন স্বভাবের মানুষটার মাঝে এতো মায়া মমতা কীভাবে থাকতে পারে বুঝতে পারে না নীতু। মাসুদ কাছাকাছি আসতেই নীতু বলল, ‘তুমি সবার সাথে এতো ভালো ব্যবহার করো তাহলে আমার সাথে এতো রাগারাগি করো কেন?’
‘এই কথাটা বলার জন্য ডেকেছ? এটাই তোমার দরকারি কথা?’ নীতু সামনে থাকলে মাসুদ রেগে যাচ্ছে আবার যখন সামনে থাকে না তখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে, দেখতে ইচ্ছে করছে। যেন তার দোষে তাকে দোষারোপ করা আবার চোখের আড়াল হতে না দেয়া।

আজাদ বাসায় ফিরে দেখলো লুবনা আনমনে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিনের মতো দরজা খোলার জন্য তাড়হুড়া করে আসেনি। আজাদ লুবনার কাঁধে হাত রাখল। লুবনার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আজাদ লুবনাকে ধরে তার দিকে ফিরালো। লুবনা কাঁদছে। আজাদ লুবনার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, ‘সরি, অনেক রোগী ছিল তাই আসতে দেরি হলো।’
‘তুমি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসোনা। শুরুর দিকে সব ঠিক ছিল কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি তুমি আমার মাঝে অন্যকাউকে খুঁজছো।’
পরিস্থিতি হালকা করার জন্য আজাদ বলল, ‘একদিন আসতে লেট করেছি তাতেই কতোকিছু ভেবে বসে আছো। চলো তো তোমাকে নিয়ে বের হবো। আচ্ছা বলো কোথায় যাবে।

লুবনাকে নিয়ে বাইরে থেকে বাসায় ফিরে আজাদ দেখল বসার রুম এলোমেলো। ফুলদানি ভাঙ্গা। মা মুখ গোমড়া করে বসে আছেন। আজাদ লুবনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি ঘরে যাও বিষয়টা আমি দেখছি।’
মাকে জিজ্ঞাসা করে আজাদ যা জানতে পারল- তারা বাসা থেকে বের হবার কিছুক্ষন পরে মাসুদ বাসায় ফিরেছিল। মাসুদের শরীর থেকে সিগারেটের তীব্র গন্ধ আসছিল। আয়েশা বেগম শুধু বলেছেন, ‘এভাবে ঘোরাফেরা করে, বিড়ি সিগারেটের পেছনে টাকা নষ্ট না করে কাজ কর্ম তো কিছু করতে পারিস।’
এতেই মাসুদ রাগারাগি করে ভাংচুর করেছে। আয়েশা বেগম চিন্তিত গলায় বললেন, ‘মাসুদ নেশা টেশা করে না তো আবার। নাহলে অল্পতে এমন কেউ করে?’

বেকার সময় পার করছে। পকেটে সবসময় টাকা পয়সা থাকে না। সারাক্ষন একটা চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরে। তাড়াছাড়া মাসুদ একটু রগচটা মেজাজের ছেলে। অল্পতে রেগে যায় আবার কিছুক্ষনের মধ্যে স্বাভাবিক। তুমি চিন্তা কোরো না আমি ওর সাথে কথা বলছি। নিজের ঘরে আছে সে, নাকি বাইরে গেছে?’

‘ছাদে গেছে মনে হয়।’
ছাদের কোণে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসে সিগারেট টানছিল মাসুদ। বড় ভাইকে আসতে দেখে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ছাদ থেকে চলে আসছিল কিন্তু আজাদ মাসুদকে থামালো।
‘কিরে কি হয়েছে তোর?’
‘কিছু না।’
‘মা বলল রাগারাগি করেছিস। কোন সমস্যা?’
‘আমার ইচ্ছা হয়েছে আমি রাগারাগি করেছি। কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।’
‘তুই কিন্তু অকারণে আমার সাথে তর্ক করছিস মাসুদ। আমি তোর সাথে তর্ক করতে আসিনি। এমনি কথা বলতে এসেছি।’
‘এখন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।’ কথাটা বলে মাসুদ চলে যাচ্ছিল আজাদ বলল, ‘নীতুর সাথে কিছু হয়েছে?’
‘তোকে নীতুর কথা কে বলল?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো মাসুদ।
নাজিয়ার কথা মাসুদকে বলা যাবে না তাই আজাদ বলল, ‘দেখ একটা সম্পর্কে সমস্যা থাকে। কথা বলে ঠিক করে নিলেই হয়।’
মাসুদ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হেসে বলল, ‘সম্পর্কের জ্ঞান তুই না দিলেই ভালো হয়।’
‘মানে কি?’
‘প্রেম করে নাজিয়া ভাবিকে বিয়ে করলি তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করলি লুবনা মেয়েটাকে। এ পর্যন্ত মেনে নেয়া যায়। কিন্তু এখন তুই কী করছিস? লুবনাকে ধোঁকা দিচ্ছিস আবার ওদিকে নাজিয়া ভাবিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। তোদেরকে আজ রিকশায় দেখেছি আমি। নাজিয়া ভাবিকে কি রক্ষিতা বানিয়েছিস? আমি যখন বাসায় ফিরি তখন দেখলাম নাজিয়া ভাবি রিকশা নিয়ে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তুই আর লুবনা ব্যালকনিতে। মানুষকে কষ্ট দিয়ে নিজে সুখী হওয়া যায় না। তুই ও সুখী হতে পারবিনা।’ কথাগুলো বলে মাসুদ ছাদ থেকে নেমে আসলো।

ঘরের দরজা বন্ধ করে চেয়ারটায় বসে পড়ল। মাসুদের মনে শান্তি নেই। নীতুর সাথে তিন বছরের সম্পর্ক তার। আজ পার্কে নীতুর সাথে অনেক বাজে ব্যবহার করে এসেছে সে। চলে আসার আগে নীতুর মুখটা দেখেছিল সে। বড় বড় চোখ দুটি ছলছল করছিল নীতুর। কিছুক্ষণ বসে থাকার পরে রাগটা যখন কিছুটা কমলো মাসুদ বুঝতে পারল বড় ভাইয়ের সাথে সে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে। ঘর থেকে বের হয়ে বড় ভাইয়ের ঘরে গেল।
লুবনা বলল, ‘আজাদ মনে হয় এখনো ছাদে আছে।’

মাসুদ ছাদে গিয়ে দেখল আজাদ আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মাসুদ বড় ভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
‘সরি তোকে ওভাবে কথাগুলো বলা উচিত হয়নি আমার’
‘তুই ভুল তো কিছু বলিসনি। তুই ঠিকই বলেছিস আমি কখনো সুখী হতে পারব না।’
‘দেখ আমি রাগের মাথায় কি বলতে কি বলেছি।

মাসুদকে থামিয়ে আজাদ বলল, ‘নাজিয়ার সাথে আমি সুখেই ছিলাম। কিন্তু সমবয়সি মেয়েকে বিয়ে করার জন্য অনেকেই অনেক কথা বলতো। প্রথমের দিকে সে কথা কানে নিতাম না। কেননা বিয়ের আগে নাজিয়ার সাথে আমার প্রায় সাত বছরের সম্পর্ক ছিল। আমার এমবিবিএস, এমডি, কার্ডিওলজি সব কমপ্লিট করে নিজের চেম্বার করা পর্যন্ত সে আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল। অথচ বিয়ের বছর পার না হতেই নাজিয়াকে আমার আর মনে ধরছিল না।

মনের অমিল ছিল না শুধু নাজিয়ার শরীরটা আমার কাছে বয়ষ্ক মনে হতো। অথচ তখন এটা মাথায় ছিল না যে, যাকে নিয়ে আমার এতো অভিযোগ সে কতোগুলো বছর আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। নাজিয়াকে নিয়ে যখন কোন অনুষ্ঠান বা বন্ধুমহলে যেতাম সবাই নাজিয়া আর আমার বয়স নিয়ে কথা বলতো। ঠাট্টার ছলে হোক বা ইশারা ইঙ্গিতে সবাই বুঝাতো আমাদের দুজনকে মানাচ্ছে না। তাদের কথা শুনতে শুনতে একসময় আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম আমার সাথে নাজিয়াকে মানাচ্ছে না।

নাজিয়াকে সাথে নিয়ে বের হওয়া বন্ধ করে দিলাম। কারনে অকারনে নাজিয়াকে ছোট করে কথা বলা শুরু করলাম। খুব বেশি বাজে ব্যবহার করতাম। কম বয়সি মেয়েদের দেখলে এক ধরনের আফসোস হতো। ভাবতে পারিস আমার মানসিকতা কতো নিচে নেমে গিয়েছিল। আমি সরাসরি নাজিয়ার কাছে ডির্ভোস চাইলাম। নাজিয়া কিছু বলল না। আমার আচরনে হয়তো সে সবকিছু আগেই বুঝে ফেলেছিল। নাজিয়া কয়েকদিন চুপচাপ করে থাকল। এদিকে আমি লুবনার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি।

লুবনা জানতো না আমি বিবাহিত। হুট করে একদিন নাজিয়ার হাতে ডিভোর্সের কাগজ ধরিয়ে দিলাম। নাজিয়া বাসা থেকে যাওয়ার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক্ষন কেঁদেছিল। আমি লুবনাকে বিয়ে করলাম। শারীরিক সুখে কিছুদিন ডুবে থাকলাম। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঘোর কাটতেই বুঝতে পারলাম কি হারিয়েছি। ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আমি লুবনার মাঝে নাজিয়ার মতো কেয়ার ভালোবাসা টান মায়া খুঁজতে শুরু করলাম। কারো মাঝে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

লুবনা তার মতো করে আমাকে ভালোবাসে কিন্তু আমি তার মাঝে খুঁজি নাজিয়াকে। এখন হুট করে রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। লাইট অন করে নাজিয়াকে খুঁজি। জানিস নাজিয়া মাঝে মাঝে ফোন করে। তার আবদার গুলো খুব সামান্য থাকে কিন্তু আমার অন্তরের ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। কখনো বলে, তোমার কণ্ঠটা শুনতে একটু ইচ্ছে করছে। কখনো বলে, তোমাকে একবার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। বিশ্বাস কর মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সবকিছু ছেড়ে নাজিয়ার কাছে ফিরে যাই। কিন্তু লুবনা, তার দোষটা কোথায়? আমার ভুলের শাস্তি সে কেন পাবে। বাইরের মানুষের কথায় বেশি প্রাধাণ্য দিতে দিতে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু দেখ এখন যে আমার এতো কষ্ট হচ্ছে, নাজিয়ার এতো কষ্ট হচ্ছে সেটা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। তারা কোথায় এখন? নেই, তারা কেউ নেই। বাইরের মানুষেরা ক্ষণস্থায়ী মেঘের মতো। তারা আসে চলে যায়। তাদের কথায় কান দিতে নেই।’

মাসুদ এতোক্ষন বড় ভাইয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। মাসুদ প্রশ্ন করল, ‘দোষটা কি শুধু তাদের?’
আজাদ বলল, ‘নারে দোষটা আমারও। নারীদের নিয়ে পুরুষের মনে লালসা বাসনা আসা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে সে লালসা বাসনার আগুনে ঘি ঢালবে নাকি পানি সেটা পুরুষের নিয়ন্ত্রনে। আমি ঘি ঢেলেছিলাম। দোষটা আমারই। সেই দোষের শাস্তি পাচ্ছি রে।

মাসুদ লক্ষ্য করল বড় ভাইয়ের চোখ ছলছল করছে। মাসুদ কি বলে শান্তনা দিবে ভেবে পাচ্ছে না। এই মুহূর্তে নীতুর ছলছলে চোখে তাকিয়ে থাকা মুখটা তার চোখের সামনে ভাসছে। মাসুদ বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিল। মাসুদের আগে নীতুর আরেকটা সম্পর্ক ছিল। এটা মাসুদ জানতে পারে কিছুদিন আগে যখন কেউ একজন বিষয়টা তাকে জানায়। সেই কেউ একজনটা নীতুর পুরোনো প্রেমিক। বন্ধুদের সামনে কথাটা বলেছিল বলে বন্ধুরা নীতুকে নিয়ে নানান কথা বলতো। তখনি নীতুর প্রতি মাসুদের ভালোবাসার ভাটা পড়ত। সেও তার ভাইয়ের মতো তৃতীয়পক্ষের কথায় গুরুত্ব দিচ্ছিল ভালোবাসার মানুষটার থেকে। অথচ মাসুদ নীতুর চোখে মুখে স্পষ্ট তার জন্য ভালোবাসা দেখে, অনুভব করে।

‘নীতু এত রাতে তোর কোন বন্ধু বাসায় এসেছে? তোর বাবা ঘরে বকাবকি শুরু করেছে। ছেলেটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। জলদি বিদেয় কর ছেলেটাকে।’ মায়ের কথা শুনে নীতু দ্রুতপায়ে বাসা থেকে বের হলো। বের হওয়ার সময় স্যান্ডেলগুলোও পায়ে দেয়ার সময়টুকুও নষ্ট করল না।
বাসার সামনে মাসুদকে দেখেই নীতু মাসুদকে জড়িয়ে ধরলো। মাসুদের মনে হচ্ছে নীতুর স্পর্শ যেন নগ্ন শরীরে বৃষ্টির শীতল ফোঁটা।

লেখক- নুর ইসলাম আলিফ

Post a Comment

0 Comments