ও সাথী আমার - পরিবর্তন গল্প ৮ম শেষ পর্বঃ, জীবন পরিবর্তনের উক্তি, জীবন ও বাস্তবতা, জীবন এবং বাস্তবতা, জীবনের গল্প, জীবন নিয়ে উক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি কাকে বলে, বাস্তব জীবন নিয়ে কিছু কথা, বাস্তব জীবনের ছোট গল্প, জীবনের বাস্তবতা নিয়ে স্ট্যাটাস, জীবনে বাস্তবতা, জীবন কি, জীবনের কঠিন সময়, ও সাথী আমার - পরিবর্তন গল্প ৫ম পর্ব, ভালোবাসার মন্তব্য, ভালোবাসার থিওরি, শ্রদ্ধা ভালোবাসা, ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা, হৃদয়ের ভালোবাসা, সত্যিকারের ভালোবাসা কেমন হয়, আবেগের ভালোবাসা, আবেগ ও ভালোবাসা, ভালোবাসার আবেগি চিঠি, আসলে ভালোবাসা কি, ভালোবাসা বলতে কিছু নেই, ভালোবাসার সূত্র, ও সাথী আমার - গল্প ৩ম পর্ব

ও সাথী আমার ৮ম (শেষ পর্ব)

বিয়ে বাড়ীতে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন চলছিলো! সবাই নিজেদের মতো করে মন্তব্য করে যাচ্ছে !তাদের সবার মন্তব্যের বিষয়বস্তু একটাই আর তা  হলো... জারা একজন ডাক্তারী পড়া মেয়ে হয়েও হুজুর টাইপ লোককে বিয়ে করছে"! কেউ কেউ আবার সেই মন্তব্যকে খন্ডন করে বলছিলো, আরে হুজুর কিসের!ছেলেটা তো একটা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক.... কিন্তু যাই বলেন, সে ডাক্তার পাত্র ছেড়ে এই দাড়ীওয়ালা টিচারের প্রেমে পড়লো? শুনলাম, ছেলে নাকি খুব রাগী? আরে টিচার মানুষ, রাগী তো হবেই! আমিতো শুনেছি একেবারে কাঠখোট্টা টাইপের। 

ওর বড়চাচাকে নাকি কটকট করে দুনিয়ার কথা শুনিয়েছে! আপনি জানলেন কি করে?... আরে আমার ছেলে তো ওর বড়চাচার ছেলের বন্ধু, ঐ ডাক্তার ছেলেটাই বন্ধুদের বলেছে যে, কোন্ কাঠমোল্লার হাতে পড়েছে জারা এবার বুঝবে! কি জানি বাপু, জারা এর মধ্যে কি যে দেখেছে আল্লাহই জানে! আরে এর মধ্যে রহস্য আছে রে ভাই... আজকালকার মেয়েরা ছেলেদের পকেট দেখে বুঝলেন! দেখেন গে, ছেলে নিশ্চয়ই মালদার পার্টি। আরে ভাই কি যে বলেন, টিচার মানুষ ক'টাকাই বা বেতন পায়! না..না শুনেছি, ছেলের নিজের নাকি বিরাট মাদ্রাসা আছে! তাহলে তো হলোই... যখন বোরকা আর হাতমোজা পড়িয়ে ঘরে ফুলদানিতে ফুল বানিয়ে রাখবে জারাকে!এখন বুঝবে প্রেম কাকে বলে...!

এমনতরো অজস্র কানাঘুষার মধ্য দিয়ে জারার শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হয়ে গেলো! তনুকেও বিভিন্ন জন বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলো। তিনি স্মিতহাস্যে সবার কৌতুহলের উত্তর দিচ্ছিলেন। কাবিননামাতে সম্পূর্ণ উসুল লেখার সময়ও কেউ কেউ মুখ বাঁকা করেছে... ওরকম উসুল সবাই লেখে, দেয় কয়জন? কিন্তু যখন পাত্র ক্যাশ পাঁচলক্ষ টাকা মোহরানা বাবদ কনের হাতে তুলে দিলো! তখন সবগুলো জোঁকের মুখে নুন পড়লো! আলাপের মোড় তখন উল্টে গেলো! কথাবার্তা তখন চললো অন্যভাবে.... আমার বিয়ের বিশবছর হয়ে গেলো তোমার ভাই তো আজ পর্যন্ত ফুটো পয়সা দিলোনা আমাকে.....আরে আপনার ভাই তো বাসর রাতেই মাফ চেয়ে নিয়েছে!

আরে, না না ভাবী এভাবে নাকি বউ হালাল হয়না...... যাক্, জীবনে প্রথম একটা বিয়ে দেখলাম যেখানে বর বউকে দেনমোহরানা পুরোটা উসুল করে দিলো! ভালোই তো!

তনু কান্নারত কন্ঠে নাজারার হাত চেপে ধরে বললেন-"মেয়েটাকে শুধু পেটেই ধরেছিলাম নাজারা! বাকী আদর আব্দার সবই তো তোমার কাছে পেয়েছে। আমার মেয়েটার সৌভাগ্য যে তোমার পরিবারে সে বউ হয়ে যাচ্ছে। ওকে তুমি তোমার মেয়ে বানিয়ে রেখো! নাজারা তনুকে জড়িয়ে ধরে বললেন -"ইনশাআল্লাহ! তোমার যখনি ইচ্ছে হবে চলে আসবে, ওরও যখনি তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হবে চলে আসবে। তুমি ভেবোনা!" আনান সানন্দে আফনানকে জড়িয়ে ধরলো!

নাজারা তার বউমা নিয়ে রাত সাড়ে বারোটার মধ্যেই বাড়ী ফিরে এলেন ! যদিও বাড়তি কোনো আলোকসজ্জা ছিলোনা আফনানের বাড়ীতে। তবে জারার হদয়ের আকাশে হাজারো আলোর ঝলকানি তার বিদ্যুতচ্ছটা জ্বালিয়ে রেখেছিলো!
নাজারা জারার হাত ধরে ওকে ঘরে নিয়ে গেলেন! 'বিসমিল্লাহ' বলে পরম করুনাময়ের নাম নিয়ে জারার গৃহপ্রবেশ ঘটলো!

নাজারাই ওদের দুজনের নামাজের ব্যবস্থা করলেন! আফনানের ইমামতিতে জারা তার বিবাহিত জীবনের প্রথম নামাজটি আদায় করলো।নামাজ শেষে জারা নাজারার রেখে যাওয়া স্যালোয়াড় কামিজটা হাতে নিলো! আফনান এগিয়ে এসে জারার হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে সরিয়ে রেখে ওর হাত ধরে বিছানার এসে ওকে নিয়ে বসলো! জারা বিহ্বলের মতো ওর সাথে বসলো! সে একবারও চোখ তুলে তাকাচ্ছিলো না!আফনান ওর লাজনম্রতা দেখে মুচকি হাসলো!তারপর নিজের ডানহাতটা ওর কপালে রেখে দু'আ পাঠ করলো! জারা স্থানুর মতোই বসে রইলো!ওর কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছিলো! আফনানই প্রথম নিরবতা ভাঙ্গলো-"কথা নেই কেন? এমনিতে তো এলেই কান ঝালাপালা করে দিয়ে যেতে ,আজ এমন চুপচাপ?

জারা মুখ নিচু রেখে বললো-"আপনি কিভাবে জানলেন!কখনো তো আপনার সামনে আসিনি!-"না এলেই কি!কথার আওয়াজ তো প্রতিনিয়তই পেতাম।কন্ঠেরও পর্দা আছে,জানো তো!"
জারা মাথা নাড়লো!

আফনান মৃদু হেসে বললো-"আল্লাহপাক কার রিযিক কোথায় রাখেন, কেউ জানেনা!আমার রিযিকে তুমি ছিলে বলেই আজ দুজনে একত্রিত হতে পেরেছি!" জারা সামান্য হাসলো! আফনান বললো-"মায়ের কাছে তাহলে এ জন্যেই নিয়মিত আসা হতো? -কি জন্যে?" জারা তাকালো! ওকে তাকাতে দেখে আফনান নিজের দৃষ্টি দিয়ে যেন ওর দৃষ্টিকে আটকে ফেললো!

জারা চোখ নামাতে পারছিলোনা! কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আফনান ভারী স্বরে বললো-"তুমি এখনো সেই ছোট্টবেলার  জারাই আছো!" -"আর আপনি? আমি তো বড় হয়ে গেছি দেখছোনা, দাঁড়ী গোঁফ...আফনান হেসে হাত দিয়ে ইঙ্গিতে দেখালো!জারাও হেসে ফেললো!তারপর বললো-"আপনার থুতনীতে একটা কাটা দাগ ছিলো না?

-সেটা দাড়ীর নিচে চলে গেছে।দেখতে চাও!" জারা মাথা নাড়লো-"না,থাক্.! -"চাইলে  দেখতে পারো!- "না....পরে..! -"হমম....ঈশার নামাজ পড়া হয়েছিলো?" -"জ্বী!" -"ফজর পড়তে ওঠা হয়? নাকি নাক ডাকিয়ে ঘুমানো হয়? জারা দ্বিধাজড়িত কন্ঠে বললো-"সবসময় পারিনা,মাঝেমধ্যে মিস হয়ে যায়! -এখন থেকে আর হবেনা ইনশাআল্লাহ!"
কথা বলতে বলতে জারা ডান হাতটা ঘাড়ে রাখলো! আফনান সেটা লক্ষ্য করে বললো-"কি ঘাড় ব্যথা করছে?" -"না.... সামান্য !" -"এসো ঘাড় মেসেজ করে দেই!" -"আরে না না...." জারা লজ্জায় একদম জড়োসরো হয়ে গেলো!

আফনান হঠাৎ হাত বাড়িয়ে জারার ডান হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে নরম সুরে বললো-"একা একা এতো কষ্ট করেছো, আমাকে জানতেও দাওনি!"
জারা উত্তর দিলোনা!
আফনান ফের বললো-
-"একটু জানালে কি হতো?"
-"কিভাবে জানাবো...আপনি তো...!"
-"মা'কেও তো বলতে পারতে!"
-"আপনার মনের খবর না জেনে....!"
-"হ্যাঁ...! এটা ঠিক, আমার মনের খবর না জেনে তুমি এগোবে কিভাবে! আমিতো মাত্র গতকালই জেনেছি সবকিছু। মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিলো শুনে! কেবল মনে হচ্ছিলো যে করেই হোক, ঐ অসম বিয়ে ঠেকাতে হবে! অসম কেন বলছি  বলো তো?"
-"কেন?"
-"তুমি বাস্তবিক একজন ডাক্তারী পড়ুয়া মেয়ে হলেও মনমননে তুমি একজন দ্বীন মেনে চলা নারী! তোমার এই খবরটা তো আমার অজানা নয়!পরিস্থিতির ফাঁদে পড়ে প্রপার দ্বীন মেনে চলা তোমার জন্য কঠিন ছিলো , এটাও বুঝি! তাই কথাটা শোনার পর মনে হলো..... (বলে জারার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল) তুমি বোধহয় কমফোর্ট ফিল করছো না।পা তুলে আরাম করে বসো তো!এরকম ছাত্রী সেজে  বসেছো কেন?" জারা একটু নড়েচড়ে হেলান দিয়ে বসতে গেলে আফনান নিজ হাতে ওর পা দুটো ধরে বিছানায় তুলে দিয়ে বললো-"কিছু খাবে?"

-"পানি....থাক্,আমিই নিয়ে নেবো,আপনার কষ্ট করতে হবেনা!"
-"কেন,আমি দিলে ক্ষতি কি?"বলে আফনান উঠে গিয়ে একগ্লাস পানি নিয়ে এলো।জারার হাতে তা দিলে জারা মৃদু শব্দে বললো-"যাজাকাল্লাহ!"
-"বারাকাল্লাহ ! আচ্ছা,তুমি একটু বিশ্রাম নাও !এই ফাঁকে আমি বরং আম্মার সাথে একটু কথা বলে আসি চাইলে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারো !"

জারা সোজা হয়ে বসার আগেই ওর কাপড়টা এগিয়ে দিলো আফনান। জারা মনে মনে ভাবলো লোকটাকে বাইরে থেকে দেখতে যতটা কঠোর মনে হয় ভেতরে সে ততটাই নরম। আফনান বেরিয়ে গেলে জারা পোশাক বদলে একদম ঘরোয়া হয়ে গেলো! একটু পর আফনান ঘরে এলো হাতে একটা বক্স নিয়ে! তাতে বিভিন্ন শুকনো খাবার, পিঠা সন্দেশ। জারার দিকে তাকিয়ে প্রথমে একটু থমকে গেলেও নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে বললো-"পোশাকটাতে তোমাকে কিন্তু বেশ মানিয়েছে... মাশাআল্লাহ্!" জারা কোনো উত্তর করলোনা!

আফনান ওর সামনে এসে বসে জারার হাত ধরে ওকে বসিয়ে বললো-"তুমি আমার কাছে কতটুকু কি আশা করো আমি জানি না!আমি হয়তো তোমাকে বিলাসী জীবন দিতে পারবোনা বা ইউরোপ, আমেরিকা ঘোরাতে নিয়ে যেতে পারবোনা তবে....! -"ঐ জীবন আমি কখনোই চাইনি আফনান...! আফনানের কথা শেষ হবার আগেই বললো জারা! বলেই সাথে সাথে জিভ কেটে বললো- "স্যরি, আপনার নাম বলে ফেললাম, এতে গুনাহ হলো না তো?


আফনান শব্দ করে হেসে বললো-
-"না...ইনশাআল্লাহ! কারন আল্লাহর রাসুল সাঃ আম্মাজান আঈষা রাঃ এর সন্তষ্টি বা অসন্তষ্টি বুঝতে পারতেন কিভাবে জানো? রাসুল সাঃ বলতেন, তুমি কখন আমার ওপর খুশি থাক আর কখন অখুশি থাকো, তা আমি বুঝতে পারি! তুমি আমার উপর খুশি থাকলে বলো মুহাম্মাদের রবের কসম আর অসন্তষ্ট থাকলে বলো ইব্রাহিমের রবের কসম!"এ থেকে একটা ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে স্ত্রী স্বামীর নাম উচ্চারন করতে পারে! তবে উচ্চারন করা আর ডাকার মধ্যে একটা পার্থক্য তো রয়েছেই!

-"তাহলে উম্মুল মুমীনিন নবী সাঃ কে কি বলে ডাকতেন?"জারা প্রশ্ন করলো!
-"আল্লাহর রাসুল" বলে ডাকতেন, সম্বোধন করতেন! -"ও.... আচ্ছা, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম।আমার দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো বা বিলাসী জীবন যাপনের প্রতি এতটুকু মোহ নেই বিশ্বাস করুন!আমি প্লেনে করে সুইটজারল্যান্ড ভ্রমনের চেয়ে আপনার সাথে নৌকাভ্রমন করতে বেশী পছন্দ করবো...সত্যি বলছি!"
-"আলহামদুলিল্লাহ,তোমার এ জাতীয় পছন্দগুলো আমাকে জানিয়ো তো,আমি সাধ্যমতো সেগুলো পূরণ করতে চেষ্টা করবো!"
জারা এবার হেসে ফেললো।

আফনান বক্স খুলে একটা সন্দেশ বের করে জারার মুখে দিলে জারা তা হতে অর্ধেক কামড় দিয়ে নিলো!বাকি টুকরাটা আফনান নিজের মুখে চালান করে দিয়ে বললো-"স্ত্রী'র মুখে খাবারের একটি লোকমা তুলে দেয়াও একটি সদকা!"

এভাবে গল্পে কথায় রাত ভোর হয়ে এলো!আফনান জানালো একটু পরেই আযান হবে!জারা ঘরেই নামাজে দাঁড়ালো আর আফনান মসজিদের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো! বাড়ী ফিরে দেখলো জারা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে!আফনান মুচকি হেসে ওর গায়ে কম্বলের অর্ধেকটা চাপিয়ে দিয়ে নিজেও একপাশে শুয়ে পড়লো!

বেশ একটু বেলা করেই ঘুম ভাঙ্গলো জারার।চোখ মেলতেই দেখলো ও আফনানের বাহুর ওপর শুয়ে আছে।আর আফনান ডানহাতটা ভাঁজ করে মাথার নিচে রেখে চিৎ হয়ে ঘুমিয়ে আছে!জারা গালে হাত রেখে ওকে কিছুক্ষণ দেখলো তারপর ওর দাঁড়ীতে হাত দিতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলো! তারপর আস্তে করে উঠে পড়তে গেলে বাধা পেলো আফনান চোখ বন্ধ করেই বললো- "থাকোনা কিছুক্ষণ!

-"এমা...আপনি কখন জাগলেন?"
-"যখন তুমি আমাকে দেখছিলে তখন..!
-"এটা কিন্তু অন্যায়...ভান করে থাকাটা!
-"আর চুরি করে কাউকে দেখাটা বুঝি খুব ন্যায়!"
জারা চুপ হয়ে গেলো! আফনান মৃদু স্বরে বললো-"তখন না আমার থুতনীতে কাটা দাগটা দেখতে চেয়েছিলে?
-"হমম....গভীর হয়ে কেটে গিয়েছিলো!ছোটবেলায় আপনি অনেক ডানপিটে ছিলেন!"
-"এখন নেই কে বললো?দাগটা কোথায় ছিলো মনে আছে?"
-"সম্ভবত বাঁ পাশে!"
-"খুঁজে দেখো তো পাও কিনা !"
জারা লজ্জিত হেসে আফনানের মুখে হাত রাখলো 

সপ্তাহখানেক পরেই মাদ্রাসা খুলে গেলো!আফনান এবার নাজারা আর জারাকে সাথে নিয়েই রাজশাহী চলে এলো! মাদ্রাসা ঘুরে দেখে তো জারা মুগ্ধ।মাদ্রাসাটা আরো যুগোপযোগী আর আধুনিকীকরনের কিছু পরামর্শও দিলো আফনানকে! মহিলা বিভাগের শিক্ষিকাদের সাথে কথাবার্তায় মোটামুটি দিনটা কেটে গেলো ওর! রাতে শোবার সময় জারা আফনানকে বললো-"একটা অনুরোধ করতে চাই,রাখবেন?"
-"ইনশাআল্লাহ!বলেন শুনি!" -"আমি কয়েকটা দিন এখানেই থাকতে চাই আপনার সাথে! এখনি ঢাকায় যেতে চাচ্ছিনা! -"সে কি....তোমার ইন্টার্ণীর কি হবে !" -"হবে নে! প্লিজ....আপনাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছেনা!" -"আচ্ছা,ঠিকআছে।"বলে আফনান হঠাৎ উঠে পড়লো!

জারা ওর পাঞ্জাবীর কলার মুঠোর মধ্যে ধরে রেখে বললো-"এখন আবার কোথায় যাচ্ছেন?"
-"একটা জরুরী কাজ আছে...আসছি আমি!"
জারা হাত সরিয়ে নিলো আফনান বেরিয়ে গেলো!আফনানের অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে চোখটা লেগে আসছিলো জারার।এমন সময় কানের কাছে আফনানের ডাক শুনে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো আফনান ওকে দুহাতে টেনে তুললো-"এসো আমার সাথে!" -"এতো রাতে কোথায় যাবো?"
-"আহা!এসোইনা!"

হাঁটতে হাঁটতে কয়েকবার জিজ্ঞেস করলো-"কোথায় যাচ্ছি আমরা?"
-"নৌকা ভ্রমনে!"
-"কিহ্?এতো রাতে?"
-"রাতের মজাটা অন্যরকম...!না গেলে বুঝবেনা!"
নৌকায় সুন্দর একটা চাদর বিছানো হয়েছে।জারা বসে চারদিক তাকাতেই মুগ্ধ হয়ে গেলো!বিরাট ঝিলটার ওপর চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে অপূর্ব দেখাচ্ছে!

-"আপনি নৌকা বাইতে পারেন?"
-"যা পারি মোটামুটি মন্দ না!কাজ চলে! "
-"ইস্....চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক!" জারা মুগ্ধ হয়ে বললো!
-"হমম,আইয়ামে বীজ শুরু হয়েছে!"
জবাবে আফনান বললো!
ঘন্টাখানেক ঝিলটা ঘুরে ওরা অপর পারে নেমে গেলো!জারার হাত ধরলো আফনান!
-"এদিক দিয়ে এসো!"
-"ওদিকে কোথায় যাবো?"
-"তুমি বড় বেশী প্রশ্ন করো!আমার সাথে যেতে আপত্তি আছে?"

জারা হেসে ফেললো-"একদম না!চলুন,দুজনে হারিয়ে যাই!পরিবেশটা দারুন লাগছে!
-"এদিকের পথটা হাঁটার জন্য একটু কষ্টকর!প্রচুর ঝোপঝাড়। জুতাটা খুলে আমার হাতে দাও!"
-"না...থাক্! আমি হাঁটতে পারবো!" একটা সরু মেঠো পথ ধরে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে একটা জীর্ণ কুটিরের সামনে এসে দাঁড়ালো!আফনান ডাক দিতেই কুটিরের ভেতর থেকেই এক অশীতিপর বৃদ্ধা বেরিয়ে এলো!আফনানকে দেখে তার মুখে বিস্তৃত হাসি দেখা দিলো!সে খুব খুশি হয়ে এগিয়ে এসে জারার হাত ধরে বললো-
-"এইডা কি আমাগো আম্মাজান?"
-"জ্বী,বুড়িমা!ওকে একটু গ্রাম দেখাতে নিয়ে বেরিয়েছি!"

বুড়ি খুব খুশি হয়ে জারাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলো!তারপর দুজনকে বসিয়ে রেখে ছোট নাতিটাকে ঠেলে তুললো!আফনান বাধা দিলেও সে শুনলো না! নাতিটা আফনানকে হেসে দেখে সালাম দিলো! ওদের দাদী নাতির তৎপরতা দেখে জারা আফনানকে বললো-"এরা আপনাকে খুব ভালোবাসে!" আফনান কিছু বলার আগেই বুড়ী শতমুখে আফনানের প্রশংসা করতে শুরু করলো!কিভাবে আফনান তার চিকিৎসা করিয়েছিলো!তার নাতিটাকে এই চায়ের টং ঘর বানিয়ে দিয়েছে।দোকান করে দিয়েছে।সে এতোদিনে না খেয়ে মরতো যদি আল্লাহ আফনানকে না পাঠাতো.... ইত্যাদী বলেই যেতে লাগলো!আফনান তাকে থামালো!

একটু পরেই গুড় নারকেলে মাখানো একবাটি মুড়ি আর গুড়ের চা পরিবেশন করলো ওদের সামনে। আফনান বললো- "এতো রাতে এসব ঝামেলা করতে গেলে কেন বুড়ীমা?" -"এডা কুনু জামেলা না গো বাপ!তুমি নয়াবৌ নিয়া মোর ঘরে আসিছো ,আমি বড্ড খুশি হইচি! সন্ধ্যাকালে আইলে ভাত খাওয়াই দিতি পারতাম!" পরম তৃপ্তি নিয়ে জারা গুড়মুড়ি খেলো!ওর কাছে খুব ভালো লাগছে সবকিছু। বুড়ী বারবার অনুরোধ করলো রাতটা তার এখানে থেকে যাবার জন্য।আফনান বললো, আজ না বুড়ী মা,আরেকদিন আসবো ওকে নিয়ে!তখন থাকবো!

-"আসবা কিন্তুক বাপ!কতা দ্যাও!"
-"ইনশাআল্লাহ আসবো।সেবার তোমার হাতের ছোট মাছের চচ্চড়ি খেয়ে যাবো!" বুড়ী ভেজা চোখে ওদের ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিলো!নাতিটাকে বলেছিলো ওদের নৌকা চালিয়ে পৌঁছে দিতে!কিন্তু আফনান বাধা দিলো!বুড়ী শতমুখে দোয়া দিতে লাগলো জারাকে!নৌকায় বসে জারা বললো-
-"ওনাকে কিছু টাকা দিতে পারলে ভালো হতো!
আফনান চারদিক তাকিয়ে বললো-"দিয়েছি!"
-"তাই নাকি? কখন দিলেন?সারাক্ষণ তো আপনার সাথেই ছিলাম দেখলাম না তো?"

-"দানের নিয়ম হচ্ছে ডান হাত দান করলে বাম হাত জানবেনা!" জারা চারিদিক তাকিয়ে খুশিতে দুহাত দুদিকে মেলে দিয়ে বললো-"উফ্,অসাধারন লাগছে!মনে হচ্ছে এভাবেই ঘুরতে থাকি!বাড়ী ফিরতে ইচ্ছে করছেনা!" আফনান হা হা করে হেসে উঠলো!

পরদিন রাতে ঘুমোবার সময় জারা আফনানের বুকে মুখ গুঁজে বললো-"কাল রাতের জার্ণিটা সারাজীবন মনে থাকবে!" আফনান হেসে বলেছে-"এখনই এতো নষ্টালজিক হওয়ার কিছু নেই!আবার আরেকদিন যাবো তোমাকে নিয়ে!"
-"সত্যি?" -"হমম....এখন চলো!আজ রাতের মিশনে নামি!"
-"মানে?"
-"আরে এসোইনা!"

বলে জারার হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলো!জারা অবাক হয়ে গেলো যখন দেখলো আফনান ওকে সাইকেলে নিয়ে ঘুরবার প্ল্যান করেছে!জারা তো হাসতে হাসতেই শেষ যখন সে সাইকেলে চাপলো!ভয়ে আফনানকে আঁকড়ে ধররো-"প্লিজ,নামান আমাকে!পড়ে যাবো!" -"উঁহুঁ...চুপ করে টাইট হয়ে বসে থাকো!শখ বলে কথা!" আফনান ওকে নিয়ে পুরো পুকুর পাড়টা দুবার চক্কর খেলো!রাতের নিরবতা ওদের মিহি গুঞ্জনে মুখর হয়ে উঠলো!

সারাদিন কলেজ মাদ্রাসা শেষে প্রতিরাতেই কিছু না কিছু এডভেঞ্চারের স্বাদ পায় জারা।জীবনটা ওর কাছে সম্পূর্ণ অন্যরকম রোমাঞ্চকর হয়ে উঠলো!সে এখন ঢাকা ফিরে যাবার নামটাও নেয়না!
আফনান নিজেই ঘোষণা দিলো, আগামী সপ্তাহেই ঢাকা যাবে ওরা!জারা গাল ফুলিয়ে বললো-"এতকিছু হলো,সাঁতারটাই শেখা হলোনা!" আফনান ওর মাথায় মৃদু চাঁটি মেরে বললো-"আজ হবে!" -"ইস্,একদিনেই...?
-"আমি শেখালে একদিনেই হবে!

সত্যি সত্যিই রাত সাড়ে এগারোটার দিকে আফনান ওকে বাড়ীর লাগোয়া ঘাটে নিয়ে গেলো!আজ সেদিনের মতো চাঁদ নেই বলে পুকুরপাড় অন্ধকার।
জারা সভয়ে আফনানকে আঁকড়ে ধরলো-"যদি অন্ধকারে ডুবে মরি তো?" -"কি যে বলোনা!এই পুকুরে কোমড় পানি!এসো!" -"গ্রীস্মকালের দিন।গা ভেজাতে কোন কষ্টই হলোনা!তবে একবার আফনানের হাত ফসকে ঝুপ করে পানিতে পড়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে জারা রেগে গেলো!আর শিখবেনা সে সাঁতার!অবশেষে আফনান স্যরি,ট্যরি বলে আবার শেখানো শুরু করলো!

ঢাকা যাবার আগের দিন জারা সমানে হাঁচি দিতে লাগলো!আফনান হেসে বললো-"এ কি অবস্থা!এটুকুতেই ঠান্ডা লেগে গেলে সাঁতার শিখবে কি করে!"
-"সব দোষ আপনার!সাতার শেখানোর নাম করে আমাকে পানিতে নামিয়ে....!"
-"পানিতে নামিয়ে কি....?"
-"জানি না...যান!"

আফনান হা হা করে হেসে উঠলো! পরদিন ঢাকা ফিরে এলো ওরা। কিন্তু গ্রামের সেই মধুর স্মৃতিগুলো জারাকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলো। সে রাজশাহী যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো! পরে স্থির হলো প্রতি সপ্তাহের তিনদিন সে রাজশাহীতে থাকবে! আর তখন সেখানে রুগীও দেখবে!

মাদ্রাসা লাগোয়া চেম্বার খোলা হলে সপ্তাহের সেই দিনগুলোতে মহিলা রুগীরা ভীড় করতে লাগলো সেখানে! গ্রামে জারা মোটামুটি আম্মাজান হিসেবে বেশ খ্যাতি পেয়ে গেলো! কারন আম্মাজান শুধু রুগীই দেখেননা সাথে করে ওষুধপথ্যও ফ্রিতে দিয়ে থাকেন। খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগলোনা! পাশের গ্রাম থেকেও রুগীরা ভীড় জমাতে লাগলো! জারা নিজেই এখন কঠোর পর্দা মেনে চলে!

দিনের অর্ধকটা সময় রুগী দেখে কাটায়। কিছুটা সময় মাদ্রাসার প্রশাসনিক দিকটা দেখে বাকীটা সময় স্বামী আর সংসারে ব্যয় করে! চমৎকার এক অর্থপূর্ন জীবন সে লাভ করেছে যে জীবনের শুরুতেও আফনান শেষেও আফনান!

একে একে তিনটি সন্তানের জননী হয়ে গেলো জারা! সে এখন পুরোদস্তর পর্দানশীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। বেশীরভাগ সময় সে এখন রাজশাহীতেই থাকে! মাদ্রাসার মহিলা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে। পাশাপাশি চেম্বার আর রুগীতো আছেই! তবে সবকিছুর ওপরে সে তার সংসার জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তার ফলাফলও মিলেছে। তিনজন ছেলেই পড়াশোনায় শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখেছে। তিন পুত্রই ক্বুরআনের হাফেজ।

বড় ছেলেটা এবার মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে মদীনা চলে গেলো। ছোট দুটোও সে পথের অনুসরনেই চলেছে। গর্বে জারার বুক ভরে ওঠে।মহান রাব্বুল আ'লামীন তাকে এক বরকতময় সংসার দান করেছেন! সে এখন শুধু আফনানের স্ত্রী'ই নয়, তার জীবনে চলার পথের প্রেরনাদায়িনী, তার সহকর্মী, সহমর্মী আবার একইসাথে তার প্রেমিকা আর সহধর্মিনীও!
এমন জীবন দান করার জন্য সে প্রতি মুহূর্তেই রাব্বুল আলামীনের কাছে পরম শোকর আদায় করে! 

সমাপ্ত

লেখাঃ মোর্শেদা হাবিব!

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post