কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) - We Love Mohammad (ﷺ) Prophet Muhammad (ﷺ)
কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) - We Love Mohammad (ﷺ) Prophet Muhammad (ﷺ)


১:
পুরানো কিছু দিন মনে করতে চাই। 

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ২৯ আগস্ট মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবারে প্রত্যুষে আরবের মক্কা নগরীতে মা আমেনার কোলে শিশু মুহাম্মাদের জন্ম হয়। 

শিশু মুহাম্মাদ! হ্যা, তিনিই হলেন সেই ব্যক্তি যার বরকতের প্রভাবে হালিমা (রা:) এর অভাবের সংসারে সূর্যের কিরণ দেখা দেয়। তিনিই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কি না মক্কায় সিদ্দীক উপাধি লাভ করেন। যাকে বিনা বাক্যে, বিনা কোন সন্দেহে, এক কথায় লোকেরা বিশ্বাস করতো। 

লোকেরা যখন কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ) স্থাপন স্থাপন নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, নিচ্ছিল রক্তাক্তের প্রস্তুতি, তরবারি উন্মুক্ত করে পরেছিল সাদা কাফন তখন মক্কার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি উমাইয়া পরামর্শ দেয়, "আসুন আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তে সম্মত হই যে, আগামীকাল ভোরে মাসজিদুল হারামের দরজা দিয়ে যিনি সর্বপ্রথম প্রবেশ করবেন তার ফয়সালা সকলে মেনে নিব। 

পরদিন ভোরে মুহাম্মাদ (সা:) সর্বপ্রথম হারামে প্রবেশ করেন। তখন লোকেরা আনন্দে দাঁড়িয়ে বলেন 'ইনি তো সত্যনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত! আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিলাম'।

নবুওত প্রাপ্তির পর তিনিই সেই ব্যক্তি ছিলেন যাকে লোকেরা জানত যে তিনি "সত্য" কিন্তু মানত না। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ,অপমান, আজেবাজে নামে ডাকা, আপস-সমঝোতা, প্রলোভন-চ্যালেঞ্জ, চাপ প্রয়োগ, হত্যার পরিকল্পনা কিচ্ছুটি বাদ রাখে নি ইসলাম কে গোড়া থেকে তুলে ফেলার জন্য। কোন একটা পন্থা বাকি ছিল না তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার জন্যে। কিন্তু পারে নি।

দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তারা আমার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছিল। সেজদারত অবস্থায় আবু জেহেল (রাসুলের আপন চাচা) তার উপর নাড়িভূঁড়ি চাপিয়ে দেয়। তায়েফে পাথর মেরে মেরে রাসুলের মাথার রক্ত পায়ে ঝরিয়ে দেয় কাফের মুশরিকরা। কিন্তু আমার রাসুলের মুখ থেকে একটা, শুধুমাত্র একটা শব্দও বের হয় নি। 

আরে! তিনি তো সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি শত্রুকেও বুকে জড়িয়ে ধরতেন। আবু সুফিয়ান (রা:)! যিনি কি না সারা জীবন রাসুলের বিরোধিতা করে এসেছিল তাকে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সাদরে গ্রহণ করেন। 

তিনি তো সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি নিজের চাদর খুলে হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান এর শরীরে খন্দকের যুদ্ধে শত্রুদের সেনাক্যাম্প থেকে ফেরার পর জড়িয়ে ধরেছিলেন। ফজরের সময় নিজে গিয়ে আদুরে গলায় ডেকে তুলেছিলেন, বলেছিলেন 'এই যে ঘুমকাতুরে! ওঠো!'

সাহাবিরা কেউ দুঃখ পেলে তিনি দুঃখ পেতেন। তাদের কষ্ট নিজে অনুভব করতেন। 

তিনি তো সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি উহুদ যুদ্ধের সময় তার সাথীদের একা ফেলে চলে যাননি। কাধে কাধে মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি তো সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি কি না নিজে পাথর-মাটি কেটেছিলেন। ক্ষুদার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বেধেছিলেন। রক্তাক্ত হয়েছিলেন। ঘাম ঝরিয়ে ছিলেন। নিজের পায়ে কাঁটা ফুটিয়েছিলেন। 

তিনি তো সেই ব্যক্তি যিনি রাতের পর রাত নামাজে দাড়িয়ে উম্মতদের জন্য কাঁদতেন। এমন মানুষদের জন্য যাদেরকে তিনি দেখেনও নি জীবনে। মৃত্যুর মতো কঠিন পরিস্থিতিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার বেলায়ও তিনি তার উম্মতদের কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলেন নি। 

আর আজ আমরা? ছিঃ! ধিক আমাদের উপর। লজ্জায় মুখ দেখানোর যোগ্য না। এত জঘন্য এত নিচ কবে হলাম? রাসুল (সা:) তো সেই মানুষ যাকে কাফেররা পর্যন্ত সর্বোত্তম মানুষ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাহলে এখন তাদেরই কি হলো? নিজেদের কথা থেকেই সরে গেল? আমরাই বা কি করছি? মুসলিম দেশগুলো কি করছে? 

কে কি করছে জানি না। আপনি আমি কি করছি? 

এখন রবিউল আউয়াল মাস। কেউ কিছু করুন আর না করুন, এই মাসে সীরাহটা অন্তত পড়ুন। সীরাহ জাতীয় কিতাবগুলোও পড়ুন। এটা মুসলিম হিসেবে দায়িত্ব। আমাদের নবীজির জীবনী জানা আমাদের উপর ফরজ। 

বেশ কিছু বই আছে যার যেটা সুবিধা হয় পড়বেন।

১. আর রাহিকুল মাখতুম (বাংলা) 

২. সীরাহ (রেইনড্রপস)

৩. যেমন ছিলেন তিনি (শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ)

৪. সিরাতুন নবী ( ড. শায়খ আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবি)

৫. মহানবী (মাজেদা রিফা)

৬. নবীজির সাথে/নবীজির পাঠশালা (আদহাম আশ-শারকাবি)

আমার কাছে অতি পরিচিত নাম এগুলো। বইগুলোও চমৎকার। এই মাস হোক সীরাহ অধ্যায়নের মাস। এই মাস হোক নবীজিকে জানার মাস। আল্লাহ তায়ালা নবীজির প্রতি আমাদের ভালোবাসা আরও তীব্র করে দিক। আমিন।

লেখা: Khadiza Raihana - জাগরণএক্সক্লুসিভ


২:
আরো পড়ুন:

এক বেদুঈন সাহাবী রাসুলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল কেয়ামত কখন হবে? 

উত্তরে রাসূল ﷺ ঐ সাহাবীকে বললেন তুমি কেয়ামতের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছ? 

আরবের ঐ বেদুঈন সাহাবী তার হৃদয়ের গহীনে লুকানো অভিব্যক্তিকে দুই লাইনে ব্যাক্ত করলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এর ভালোবাসা ছাড়া আমার আর কোন অর্জন নেই, নেই কোন প্রস্তুতি।

ঐ সাহাবীর এই আবেগপূর্ণ  উত্তর শুনে আল্লাহর  রাসূল ﷺ বললেন, তুমি এই দুনিয়াতে  যাকে ভালোবাসবে কেয়ামতে তার সাথেই থাকবে। মুসলিম২৬৩৯-১৬১

আমি কল্পনা করতে পারি না একথা শুনে সেই সাহাবী কতোই না খুশি হয়েছিল। আল্লাহর নবী যেন ঐ সাহাবীকে তার কাঙ্ক্ষিত উত্তরটিই দিয়েছেন। 

আসলে সাহাবীরা এটা চিন্তাও করতে পারতেন না যে তারা তাদের প্রানের প্রিয় নবীজিকে ছেড়ে জান্নাতে কি করে থাকবে। 

হে আল্লাহ আমাদের হৃদয়কেও তোমার নবীর ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দাও। নবীর ভালোবাসা যেন হয় আমাদের কাল কেয়ামত দিনের আশার আলো। 

লা ইলা- হা ইল্লাল্লাহ

ফিদা- কা ইয়া রাসূলাল্লা-হ

ফিদাকা আবি ওয়া উম্মি ইয়া রাসুল আল্লাহ্‌ 

সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 

আমার নবী প্রেমের নবী

Boycott French Products

তোমাকে ভালোবাসি হে নবী

লেখা: Mohammad Irfan - জাগরণএক্সক্লুসিভ


৩: 
আরো পড়ুন:

চিন্তা করে হয়রান হয়ে যাই, তাঁর কামালিয়াত, আল্লাহর কাছে মকবুলিয়াত এর লেভেল কত উর্ধ্বে!!! আর কেউ নয়, বলছি শত কোটি মানুষের ভালোবাসার স্পন্দন এবং অন্যান্য সমস্ত মাখলুকেরও পরম প্রিয় সাইয়্যেদুল মুরসালিন রহমাতুল্লিল আলামীন হুযুরে আকরাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা।

দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে বড় রূহানী বাদশাহ ছিলেন তিনি। তাই তাঁর ওফাতের হাজারের বেশি বছর পার হয়েছে কিন্তু অনুসরণকারীর সংখ্যা কমেনি বরং বেরেছে। অথচ সম্পদ, শক্তি, ক্ষমতার বাদশাহ অনেক ছিল দুনিয়ায়, এখনো আছে, কিন্তু তাদের মৃত্যু হয়ে গেলে কয় বছরই বা মনে রাখা হবে। সত্যিকারের বাদশাহী তো অন্তরের বাদশাহী, যে বাদশাহী অন্য মানুষের অন্তরকেও প্রভাবিত করে ফেলে।

কল্পনা করে হয়রান হয়ে যাই, কি ছিল তাঁর রূহানী শক্তি, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, সাহস, শক্তি, ধৈর্য, ত্যাগ, কামালিয়াত, যে একা একজন মানুষ এমন একটা সময়ে (আইয়্যামে জাহেলিয়াত) 

দুনিয়ায় এসে সমগ্র দুনিয়ার নকশা বদলে দিলেন, দুনিয়ার মানুষদের চেহারা পালটে দিলেন! তাঁর সোহবত যেই লাভ করেছে সেই হয়ে গিয়েছে উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আমরা তো একজন মানুষকেও প্রভাবিত করতে পারি না,অথচ উনি একাই প্রভাবিত করেছেন কোটি কোটি মানুষকে এবং সেই প্রভাব তাঁর ওফাতের পরও দুনিয়ায় জারি আছে, ইংশা আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। 

ভেবে ভেবে পেরেশান হয়ে যাই, আমাদের মতো রক্ত মাংসের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কি এমন ছিল উনার মধ্যে, যে কোটি হৃদয়ের অন্তঃস্থলে আসন করে নিয়েছেন, অগণিত মানুষের মনের মাঝে অমর হয়ে আছেন! কি এমন ছিল তাঁর মধ্যে, যে তাঁকে না দেখেই তাঁকে এত ভালোবাসে অসংখ্য মানুষ, তাঁর জন্য নিজের প্রানপ্রিয় জীবনকে উৎসর্গ করতেও কুন্ঠিত হয় না একবিন্দু! 

উনার প্রতি বেয়াদবি ও অপমানের বিরোধিতায় সব মতভেদ, পার্থক্য ভুলে আবার উম্মাহ এক হয়ে গিয়েছে শুধুমাত্র তাঁর প্রতি অন্তরের সত্যিকারের ভালোবাসা থেকে। এসবই তাঁর রূহানীয়াত, কামালিয়াত, মকবুলিয়াত এর প্রমাণ দিচ্ছে বার বার। উনাকে যে ভালোবাসতে পারলো না তার মত হতভাগ্য কে আছে! 

অসংখ্য দরুদ ও সালাম উনার এবং উনার পরিবার-পরিজনের প্রতি। 

হে নবীয়ে রহমত, আপনাকে ভালোবাসি এই কথাটি বলতেও লজ্জা বোধ করি, কারণ ভালোবাসার হক আদায় করতে আমি ব্যর্থ হয়েছি। আপনাকে ভালোবাসি বলতেও ভয় পাই পাছে আপনার অসীম মর্যাদা ও শানের প্রতি আমার মতো নগন্যের অসার দাবির বেয়াদবি না হয়ে যায়। শুধু এই দুআই করতে পারি, আল্লাহ যেন আমাদের কে আপনার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা দান করেন এবং আমাদেরকে আপনার প্রতি ভালোবাসার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করার তাওফিক দেন। আমিন ইয়া রব্বাল আলামিন

লেখা: Abdullah Al Mas'ud - জাগরণএক্সক্লুসিভ


৪: 
আরো পড়ুন:

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

আপনার নামের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে শৈশবে। আব্বু-আম্মুর হাত ধরে পরিচিত হয়েছিলাম 'মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ' সা. নামটির সাথে।কতো রাত ঘুমোতে যাবার আগে আপনাকে শুনেছি, কতোদিন আব্বুর মুখে আপনার নাম উচ্চারিত হতে দেখেছি। ইয়া রসুলাল্লহ (ﷺ)! আমি তখন শিশু। আমি সীরাহ পড়িনি, তখনো ভালোভাবে চিনিনি আপনাকে। কিন্তু তবুও সেই শিশুমনে আপনার প্রতি অপরিমেয় ভালোবাসা লালন করেছিলাম। কারণ আপনি যে আমার রাসূল! আপনি যে আমার নবী! আমি যে আপনারই উম্মাত!

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

তারপর রব্বের দয়ায় আমার অক্ষরজ্ঞান হলো। আমি পড়তে শিখলাম। আমি প্রথম পড়েছিলাম আপনারই সীরাহ। শিশুদের উদ্দেশ্যে লেখা সীরাহ। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো, আপনি আস সফা পাহাড়ের উপর দণ্ডায়মান। সবাইকে ডাকছেন, 'ওয়া সুবাহা! ওয়া সুবাহা!' সবাই একত্রিত হয়ে দৃঢ় কন্ঠে স্বাক্ষ্য দিচ্ছে, 'হ্যাঁ, আপনি আল-আমিন'। 

তারপর আপনি সোজা-সাপটা ভাষায় তাদের দা'ওয়াহ দিচ্ছেন। তাওহিদ-রিসালাতের বাণী ছড়িয়ে দিচ্ছেন।কিন্তু মক্কাবাসীরা, আপনারই পরিজনরা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। একের পর এক জুলুম নেমে আসছে আপনার উপর। আপনার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। আপনি যেখানে দা'ওয়াতের বাণী ছড়িয়ে দিতে যাচ্ছেন সেখানে তারা অর্থহীন চিৎকার করছে। ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করাই ছিল তাদের কাজ। তবুও আপনার ফিকির, আপনার চিন্তা আপনার এই উম্মাহকে যেন জাহান্নামের আগুন স্পর্শ না করে।

ইয়া রাসূলাল্লহ (ﷺ)!

আপনি হারালেন আপনার প্রাণপ্রিয় চাচাকে। মক্কায় দা'ওয়াহ দেয়া আরো কঠিন হতে লাগলো। হঠাৎ মনে হলো আপনার, শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সবুজের ছায়ায় আচ্ছাদিত তা'ইফের কথা। আপনার আশা ছিল, এই তা'ইফবাসী আপনাকে নিরাশ করবে না। তারা শুনবে আপনার কথা। শুনবে তাওহিদের বাণী। কিন্তু হতভাগা তা'ইফবাসীরা কুরাইশদের কথায় প্রভাবিত হয়ে আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করলো। আপনার পেছনে লেলিয়ে দিলো দুষ্কৃতিকারীদের। দুষ্কৃতিকারীরা আপনাকে পাথরের পর পাথরের আঘাতে জর্জরিত করলো। যাইদ বিন হারিসা রা.। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন আপনার সামনে ঢালস্বরূপ। যাতে কোন পাথুরে আঘাত আপনার দেহ মুবারাক স্পর্শ করতে না পারে।

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)! সেদিন তা'ইফে আপনার দেহ মোবারক হতে রক্ত ঝরেছিল। তবুও আপনি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। তাদের অকল্যাণ কামনা করেননি। বরং দু'আ করেছেন হিদায়াতের।

ইয়া রাসূলাল্লহ (ﷺ)! সবরের মাধূর্যতা এবং ক্ষমার মাহাত্ম্য আপনিই তো শিখিয়ে গেছেন আমাদের।

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

আপনি মদিনাতে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আপনার সঙ্গী হলেন আবূ বাকার রা.। সেদিন ছাওর পাহাড় ধন্য হয়েছিল আপনার আগমনে। কিন্তু অর্থলোভী যুবকেরা আপনার পবিত্র পদচিহ্ন অনুসরণ করে ছাওর পাহাড় অব্দি পৌঁছে গেল। সঙ্গী আবূ বাকার রা. প্রচন্ড বিচলিত হলেন আপনার নিরাপত্তা নিয়ে। কিন্তু সেই মূহুর্তেও আপনি ছিলেন প্রশান্ত। নিরুদ্বিগ্ন কন্ঠে স্বান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, 'চিন্তা করো না, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঙ্গে আছেন'।

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)! আপনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অধ্যায়ে তাওয়াক্কুলের অপুর্ব সব নিদর্শন রেখে গেছেন৷ আর আমাদেরও মহামূল্যবান শিক্ষা দিয়ে গেছেন, কিভাবে সব পরিস্থিতিতে তাওয়াক্কুল করে শান্ত কন্ঠে বলতে হয়, 'আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঙ্গে আছেন'।

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের বাণী নিয়ে আপনি মাদিনাহ গেলেন। মাদিনাবাসীর অন্তরে তখন খুশির জোয়ার বইছে। রাসূল আসছে! শোন শোন রাসূল আসছে! 

আমার তখন পড়ে বড্ড ঈর্ষা হতো। ঈর্ষা হতো সেইসব শিশুদের যারা আপনাকে অভিবাদন জানিয়েছিল। কিন্তু আমি ঈর্ষা ভুলে চোখের পানি মুছে তাদের মতোই আবার বলে উঠতাম, 'ত্বলাআ'ল বাদরু আ'লাইনা...'

সেদিন মাদিনাহবাসীরা এক এক করে সবাই বলে উঠেছিল, 'ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)! আপনি আমার ঘর আলোকিত করুন। আপনি আমাকে ধন্য করুন।' জবাবে আপনি বলেছিলেন, 'মাদিনাহবাসী! আমি তো তোমাদের সবারই মেহমান। তবে জানি না কোন গৃহে হবে আমার অবস্থান। আমার উটনীকে পথ করে দাও। কারণ সে আদিষ্ট'।

তারা সকলে খুশি হয়ে পথ ছেড়ে দিল আর আপনার উটনী একের পর এক গৃহের সীমানা অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে পরলো আবূ আইয়্যুব আনসারী রা. এর গৃহ-অঙ্গনে। মাদিনার আকাশে- বাতাসে তখন মারহাবার ধ্বনি। 'মারহাবা আবূ আইয়্যুব! মারহাবা!' 

ঠিক সেই মুহূর্তে আবূ আইয়্যুব আনসারি রা. এর অনুভূতি লেখার মতো দুঃসাহস আমার নেই। তবে ১৪৫০ বছর পর যখন আমি পড়ি, যখন ভাবি, তখন সেই আনন্দানুভূতি আমার শিরা-উপশিরা কাঁপিয়ে তোলে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। আমি আর কিচ্ছু দেখতে পাইনা ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

আমি সীরাহের পাতায় দেখতাম, আপনি সস্নেহে আনাস রা. ভুল শুধরে দিচ্ছেন। আপনি ভালোবেসে সালমান ফারসি রা. কে বলছেন, 'সালমানু মিন্না আহলুল বাইত!' আপনি আদর করে আলী রা. কে ডাকছেন, আবুত ত্বুরব! ওঠো হে আবুত ত্বুরব! আপনি উম্মু হারাম রা. বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। ঘুমের মধ্যে হাসছেন। আবার জেগে উঠছেন। আপনি হাসান-হোসাইন রা. দের সাথে খেলছেন। তাদের কাঁধে নিয়ে সলাতে দাঁড়িয়েছেন। ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)! আমার চোখের সামনে সব জ্বলজ্বল করতো। আর আমি আফসোস করতাম, হায়! আমি যদি আমার রাসূলকে দেখতে পেতাম! যদি তার সান্নিধ্যের সৌরভে নিজেকে স্নিগ্ধ করতে পারতাম!

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

আপনি একাকী হেরা গুহা থেকে বের হয়েছিলেন নবূওয়াতের নূর নিয়ে, সাফার পাদদেশে প্রথম সত্যের আহবান জানিয়েছিলেন, তারপর মক্কার পথে- তা'ইফের মাটিতে হয়েছিলেন রক্তাক্ত, লাঞ্চিত। উহুদ প্রান্তরে দান্দান মুবারাক শহিদ করেছিলেন, রাতের পর রাত, দিনের পর দিন উম্মাহের মুক্তি, উম্মাহের দা'ওয়াহ নিয়ে ফিকির করে গেছেন। সেই আপনার সামনে তেইশটা বছর পর হাজার হাজার সাহাবা সমবেত হয়েছিলেন। তারা সবাই ছিলেন এক এবং অভিন্ন উম্মাহের অংশ! আরাফার উত্তপ্ত বুকে দাঁড়ানো সেদিন সবার উদ্দেশ্য ছিল এক। সবার দ্বীন ছিল এক। ইয়া রাসূলাল্লহ (ﷺ)! আপনার তেইশটা বছরে ঝরানো রক্ত, অশ্রু, শতো-শতো জি হা দ, কুরবানি, মোজাহেদা পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে আপনার রিসালাতের সুসমাপ্তির ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন-

اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمْۡ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ۚ 

-আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। (সূরা মা'ঈদা- ৩)

ইয়া রাসূলাল্লহ (ﷺ)! আমি থেমে যাই। আর সামনে এগুতে পারি না। বিদায় হজ্জে বলা আপনার সেই কথাটা যতোবার পড়ি ততোবার ভেতর থেকে হুঁ হুঁ করে কান্না বেরিয়ে আসে। নিজেকে বড্ড ইয়াতিম লাগে।

'হয়তোবা আগামীবছর এ সময় আমি তোমাদের মাঝে থাকবো না!' 

ইয়া রসূলাল্লহ(ﷺ)! ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

আমি মাসজিদে নববীর এক কোণে চুপটি করে বসতাম। সবুজ স্নিগ্ধ গম্বুজের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। আমার চোখ জুড়াতো, স্নিগ্ধতায় ছেয়ে যেতো দেহ-মন। দুরু দুরু বুকে ধীর পদক্ষেপে নববীতে প্রবেশ করার পর মন আনচান করে উঠতো রওযা মুবারাকের কাছে যাওয়ার জন্য। আমি একটু এগোতাম। আবার একটু.. আবার..আমার আরো কাছে যেতে ইচ্ছে করতো। আরো কাছে৷ শতো-শতো মানুষের ভীড়, সবার জিকিরের মৃদু শব্দ সবকিছুর মাঝেও সেদিন এক অপূর্ব নিস্তব্ধতা টের পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল সময় যেন থমকে গেছে। কেউ নেই চারপাশে। শুধু আমি আর আপনি-- ইয়া রসূলাল্লহ! 

সেদিন এই গুনাহগার উম্মাত অশ্রুভেজা কন্ঠে হৃদয়ের গভীরে জমানো অপরিমেয় ভালোবাসায় আবৃত করে আপনার কাছে সালাম পাঠিয়েছিল। আসসালামু আ'লাইকা ইয়া রসূলাল্লহ!

মাদিনাহ ছেড়ে চলে এসেছিলাম যেদিন সেদিন বারবার তাকিয়েছিলাম সবুজ গম্বুজের দিকে। ঠিক কতোক্ষণ তাকিয়ে উল্টোপথ হেঁটে ছিলাম মনে নেই। তবে শেষবার ঝাপসা চোখে পলক ফেলার পর যখন আবিষ্কার করলাম, দেখা যাচ্ছে না! আর দেখা যাচ্ছে না সবুজ গম্বুজ! তখন মনে হয়েছিল হৃদয়ের এক অংশ আমি নববীতে আপনার কাছেই রেখে এসেছি ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)!

কিয়ামাত পর্যন্ত কোন জালিম আপনার সম্মান ক্ষুন্ন করতে পারবে না। আপনি তো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব! সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা! 

আজ আমরা বড্ড ভীরু, বড্ড কাপুরষ। কিন্তু আজ আমাদের মনে আপনার প্রতি ভালোবাসা গভীর হতে গভীর হচ্ছে। ঠোঁটগুলো মগ্ন হচ্ছে আপনার দরুদ পাঠে। অনেক অমনোযোগী উম্মাত আজ সীরাহ পাঠে মনোযোগী হচ্ছে। সুন্নাহ পালনের ব্যাপারে সচেষ্ট হচ্ছে। আজ আমাদের সবার অন্তর একসাথে স্বাক্ষ্য দিচ্ছে,

আপনাকে ভালোবাসি ইয়া রসূলাল্লহ (ﷺ)! আপনাকে ভালোবাসি!

-বিনতে আব্দুল হান্নান -জাগরণএক্সক্লুসিভ


৫: 
আরো পড়ুন: 

আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি। আপনার কাছে দুনিয়া বড় না আল্লাহ বড়?

উত্তর অবশ্যই হবে, আল্লাহ। কিন্তু আমি যদি বলি প্রমাণ কি? আপনার সব কাজেই তো দুনিয়া বেশি প্রাধান্য পায়। আল্লাহ এবং দুনিয়ার মাঝে তো আপনাকে দুনিয়াকেই বেছে নিতে দেখি। অবাক হলেন মনে হচ্ছে। না না অবাক হওয়ার কী আছে? যেটা সত্য সেটাই তো বলতেছি।

বুকে হাত দিয়ে একটা সত্য কথা বলেনতো। শেষ কবে আপনি ফজরের নামাজে মসজিদে গিয়েছিলেন? কী হলো? আমতা আমতা করছেন কেন? দুনিয়ার আরামের ঘুমকে ফেলে রেখে ফজরের সময় মসজিদে না গিয়ে আপনি কী প্রমাণ করলেন? অথচ গতবার পিকনিকে যাওয়ার জন্য ঠিকই ঘুমকে বিদায় জানাতে পেরেছিলেন। কোনটা প্রাধান্য পেল দুনিয়া নাকি আল্লাহ?

আচ্ছা বাদ দেন এসব। এবার বলেন, আপনার পাশের মসজিদে ফজরের জামাতে কয়জন উপস্থিত হয়? না জানলে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নিয়েন। সংখ্যাটা ৪/৫ এর বেশি হবেনা। এশার নামাজে নিশ্চই মসজিদে যান। কতজন মুসল্লি থাকে? দুই কি তিন কাতার বা তারচেয়েও বেশি তাই তো? এবার নিজেই একটা অঙ্ক কষে নিন। যারা এশার নামাজে যায় তারা সবাই ফজরের নামাজে যেতে পারেনা। এই সৌভাগ্যটা কেবল তিন থেকে চারজনের বা এর আশেপাশে হয়।

কী বুঝলেন? ফজরের জামাতে উপস্থিত হওয়া সবার ভাগ্যে থাকেনা। পুরো গ্রামে মাত্র ৪/৫ জনের সেই সৌভাগ্যটা হয়। অর্থাৎ যারা আল্লাহর খুব প্রিয় বান্দা তাদেরকেই আল্লাহ এই সুযোগটা দান করেন। বাকিরা কেউ ঘুমে কিংবা বাড়িতে একা একা পড়ে নিয়ে যথেষ্ট মনে করে। 

সত্যি করে বলেন, আপনার কি ইচ্ছা হয়না সেই সৌভাগ্য অর্জন করতে? দুনিয়াকে লাত্থি মেরে ফজরের জামাতে উপস্থিত হওয়া সেই চার পাঁচজনের একজন হতে কি আপনার ইচ্ছা করেনা? তবে আর চিন্তা করছেন কেন? আগামীকালের সূর্যোদয়টা তাহলে মসজিদের ভেতর থেকেই উপভোগ করি। পারবেননা? দেখেন আপনার এই প্রতিজ্ঞাটা দেখে আমার রব কত খুশি হয়ে গেছেন।

-নতুন সূর্যোদয়-
লেখা: -নাবিল হাসান- জাগরণএক্সক্লুসিভ


-
اِنَّ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ لَعَنَہُمُ اللّٰہُ فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ وَ اَعَدَّ لَہُمۡ عَذَابًا مُّہِیۡنًا ﴿۵۷﴾
-অনুবাদঃ
নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লানত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অপমানজনক আযাব। 
(সূরা আল আহযাব:আয়াত ৫৭)

-
We Love Mohammad ﷺ
We Follow Mohammad ﷺ
My Prophet My Honour ﷺ
We Are Ummah of Mohamad ﷺ

Boycott French Products
We Hate French President
Boycott France
Love Prophet Muhammad ﷺ


আমাদের অ্যাপ ফ্রি

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post