Facebook SDK


জীবনের গল্প - ২য় পর্ব - গল্প কথার ভেতর থাকে কথা - কিছু কষ্টের জীবনের কথা - বাংলা koster kichu kotha


শাশুড়ি মা এবার বললেন, 'ফোনটা করো!'
আমার সারা শরীর কেমন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। হায় আল্লাহ! বদমাশটাকে আমার ফোন করতেই হবে এবার। মন না চাইলেও নম্বর তুলে শিশিরকে ফোন করলাম আমি। শিশির ও পাশ থেকে ফোন রিসিভ করেই বলতে শুরু করলো, 'হ্যালো মা, তুমি আমায় বাসায় আসার জন্য রিকোয়েস্ট করো না কিন্তু একদম। তোমার বউমা তোমার কাছে কী বলেছে? আমি খারাপ? অর্নির সাথে আমার রিলেশন ছিল। 

ওর পেটে আমার বেবি? তাই না? আর তুমি তো তা জানতেই ফোন করেছো না? এরপর বাসায় ডেকে নিয়ে বাড়িতে সালিশ বসাবে? আচ্ছা মা তোমার বোঝ হবে কোনদিন বলো? এইসব বিষয় নিয়ে বাড়িতে কথাবার্তা হলে, আলোচনা হলে বাইরের মানুষ কী বলবে শুনি? এরচেয়ে আমি দূরেই থাকি! দূরে থাকলেই ভালো থাকবো! তোমরা সালিশ ডেকে সালিশ করো।আমি এ ব্যাপারে ছিলাম না জানিও না কিছু। আমাকে এসবে টেনো না বলছি! শিশির একদমে কথাগুলো বলে শেষ করলো। ও ভেবেছে ওর মাই তাকে কল করেছে। মা সামনে। 

এই মুহূর্তে ওকে কী বলবো বুঝতে পারছি না। ও ভেবেছে আমি এতোক্ষণে সবকিছু বলে দিয়েছি মার কাছে। কিন্তু আমি তো এখনও কিছুই বলিনি কারোর কাছে! তাই ফোন কানে ধরেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এদিকে মা তাড়া দিচ্ছেন। ফিসফিস করে মা বললেন,' বলো।বলে ফেলো। ছাগল। অ্যাই ছাগল! না চাইলেও মুখ ফসকে আমার বেরিয়েই গেল, 'অ্যাই ছাগল, তুমি এখন কোথায় আছো? এতো বেলা হয়েছে এখনও বাইরে কী হুম? কথাগুলো বলে নিজের জিভে নিজেই কামড় দিয়ে বসলাম। মা চুলোর কাছে দাঁড়িয়ে কড়াইয়ের উপর চামুচ নাড়তে নাড়তে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আর লজ্জায় আমার মুখ লাল হয়ে উঠতে লাগলো মুহূর্তে! ও পাশ থেকে শিশিরও বেশ চমকে উঠলো। গলাটা আমার ঠিকই চিনতে পেরেছে। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না কীভাবে হঠাৎ আমি স্বাভাবিক হয়ে গেছি। 


শিশির ও পাশ থেকে চমকে ওঠা গলায় বললো, 'পৃথু তুমি? আমি জানি এখন কথা বললেই কথা বাড়বে।আর ওর সাথে কথা বলতে গেলেই রাগে আমার মাথা গরম হয়ে উঠবে। তখন মুখ ফসকে অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে!মার সামনে যদি মুখ ফসকে কোন খারাপ কথা বেরিয়ে আসে তখন সর্বনাশ হবে! তাই দ্রুত বললাম, 'শুনো, তুমি দশ মিনিটের ভেতর বাড়ি ফিরবে।দেরি করবে‌ না কিন্তু। বলেই এ পাশ থেকে ফোন কেটে দিলাম। মা তখন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'শেষের কথাটা হয়নি। শেষের কথাটা আরেকবার থেকে এভাবে বলবে, দেরি করলে খবর আছে কিন্তু! 

এই কথা বললে দেখবে বেচারা বাথরুমে থাকলে ওখান থেকে কাজ বাকী রেখেই দৌড়ে তোমার কাছে আগে আসবে! একবার হলো কী, তোমার শশুর বাজারে গিয়েছেন সেভ করতে। তার সেভ তখন অর্ধেক হয়েছে। গালের এক পাশের দাঁড়ি কেটেছে আর অন্য পাশ হয়নি। তখন আমি ফোন করে বললাম ,এই শুনো, বাড়িতে একটা সমস্যা হয়েছে। তোমাকে পাঁচ মিনিটের ভেতর আসতে হবে। না আসলে খবর আছে! সেদিন পাঁচ মিনিটও লাগেনি। 

বিশ সেকেন্ড থাকতেই গালের এক পাশ সেভ করা আর অন্য পাশে দাড়ি নিয়ে হদারামের মতো আমার সামনে এসে হাজির হয়েছে তোমার শশুর। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে শেষ।সে দমের উপর দম ফেলতে ফেলতে বললো, 'কী হয়েছে বাড়িতে? কী সমস্যা হয়েছে? আমি হেসে বললাম, তোমার এক গালে দাঁড়ি অবস্থায় দেখতে আমার মন চেয়েছিল। 

তুমি না আসলে সমস্যা হতো। আমি কেঁদে কেটে জ্বর বসিয়ে ফেলতাম। এটা কী সমস্যার মধ্যে পড়ে না? বেচারা তখন যেন কেঁদে ফেলে কেঁদে ফেলে অবস্থা। আর আমি তাকে এভাবে দেখে তো হাসতে হাসতেই শেষ! আমার শাশুড়ির হাস্য রসাত্মক কথাবার্তা শুনে হাসতে হাসতে আমিও শেষ! পৃথিবীতে এমন ভালো শাশুড়ি থাকলে বরের শত অত্যাচার সহ্য করা যায়! কিন্তু শিশির তো আমায় আর অত্যাচার করে না। 

ওর সমস্যা চরিত্রে। চরিত্র খারাপ ছেলে ও। এর জন্য আমার কী করা উচিৎ। সোজা বাপের বাড়ি চলে যাওয়া নাকি আরো কদিন এখানে থেকে আসল বিষয়টা বোঝা? অর্নিকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। আমি এ বাড়ির নতুন বউ। ঘর থেকেও তো বের হতে পারি না। অর্নির মাও এখানে আসছে না। আসলে তো তার কাছে বলে দিতে পারতাম অর্নিকে ডেকে পাঠাবার জন্য। 

আচ্ছা মার কাছে কী একবার জিজ্ঞেস করা যায় না অর্নির বিষয়ে? মা তো অত সিরিয়াস মানুষ না। তিনি বোধহয় কোন কিছু সন্দেহ করবেন না! আবার আরেকটা বিষয়ও মনে হচ্ছে আমার। এই যে অর্নির সাথে শিশিরের সম্পর্ক ছিল সেই সম্পর্কের কথা কী শিশিরের মা কিংবা বাড়ির আর কেউ জানতো না? 

মা যদি জেনে থাকেন তবে তার কাছে অর্নির বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি সন্দেহ করবেন না তো কিছু! তবুও আমি জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। মা বয়ামে জলপাইয়ের আচার রাখছিলেন। আমি তখন তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'টক পছন্দ করো না খুব তুমি?' এই কথা বলে আমার হাতে অনেক খানি আচার দিয়ে বললেন, 'খাও মা।যখন ইচ্ছে হবে বয়াম খুলে খাবে।পারলে সবটুকু খেয়ে ফেলবে কেমন!' আমি মৃদু হেসে বললাম, 'আচ্ছা মা ও ঘরের মেয়েটার কী নাম জানি, অর্নি না কী যেনো?
মা-- 

আমি মৃদু হেসে বললাম, 'আচ্ছা মা ও ঘরের মেয়েটার কী নাম জানি, অর্নি না কী যেনো?' মা সহজ সরল ভাবেই বললেন, 'অর্নিইতো।কেন, ওর কী তোমার সাথে পরিচয় হয়নি? ওর কী হলো বুঝলাম না! চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে গেল তার কোন আনন্দ উল্লাস নাই। আগে তো ও এমন ছিল না!' মা বারান্দার একপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ডাকলেল,'অর্নি, এই অর্নি, তোর নতুন ভাবী তোকে ডাকে। একটু শুনে যা মা!' অর্নি মায়ের ডাকের কোন সাড়া দিলো না। কী অদ্ভুত ব্যাপার! এবার আমার সন্দেহ আরো গাঢ় হতে লাগলো। আমার মনে হচ্ছে শিশিরের সাথে আসলেই অর্নির সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের কথা বাড়ির আর কেউ জানতো না।অর্নি তাই আমার কাছে লুকিয়ে চুরিয়েই রাতের বেলা এসেছিলো। 

সে এখন পর্যন্ত বিষয়টা কাউকে জানাতে চায় না। হয়তোবা ওর ভেতর লজ্জা বেশি বলেই! শিশির এসেছে আধ ঘন্টা পর। সে তার মার কাছে না গিয়ে সরাসরি আমার কাছে এসেছে।ও আসতেই আমি বললাম,'অর্নি ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেন? শিশির হো হো করে হেসে উঠে বললো, 'আমি কী ওর গার্ডিয়ান? 'না তুমি ওর প্রেমিক। 

প্রেমিকের অনুমতি না থাকলে প্রেমিকা বের হবে কী করে ঘর থেকে! শিশির চোখ মুখ লাল করে বললো, 'পৃথু, বার বার একটা কথা শুনতে ভালো লাগে না। তুমি এটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছো! বেশি বাড়াবাড়ি করছি?' তো কী? আমি বললাম তো রাতে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না! তবুও কেন বারবার এক কথায় বলছো? ওর এই কথাগুলো আমার কেন জানি ভালো লাগলো না। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। কেঁদে উঠলাম আমি। শিশির বললো, 'এতে কাঁদবার কী আছে? কাঁদছো কেন আবার? কাঁদবো না তো কী? তুমি আমার সাথে যা তা করবে আর আমি সব মেনে নিবো তাই না? তোমার সাথে যা তা কী করেছি আমি? 'কী করেছো তা কী তোমার মাকে এখানে ডেকে এনে বলবো নাকি উনার সামনে? শিশির বললো, 'আনো। 

ডেকে আনো। আমি তো ভেবেছিলাম তুমি অনেক আগেই মার কাছে সবকিছু বলে দিয়েছো! ওর সাহস দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। আসলে ব্যাপারটা তাহলে কী? শিশির বললো, 'কী ডাকছো না কেন?' আমি বুদ্ধি করে বললাম, 'এবারের মতো বাঁচিয়ে দিলাম। কিন্তু এর একটা বিনিময় দিতে হবে আমায় তোমার!' শিশির হাসলো। হেসে বললো, 'মেয়েরা সবকিছুর জন্যই একটা বিনিময় চাইবেই। যাজ্ঞে, বলো কী বিনিময় চাও?' আমি আজ রাত অর্নিকে চাই। ওর সাথে কথা বলতে চাই। শিশির বললো,'এখনও সেই অর্নিই। আচ্ছা অর্নির যদি সৎ সাহস থাকতো তবে তো এতোক্ষণে সবকিছু ওলট পালট করে দিতো সে। তোমার কী মনে হয় ওলট পালট করে দিতো না? হ্যা দিতো। 

আবার অনেকেই দিতোও না।অর্নির লজ্জা বেশি বলে সে সাইলেন্ট আছে। শিশির এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে খাটের উপর বসলো। বসে একগাল হেসে বললো, একজনের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে তখনও সে লজ্জার কারনে চুপ হয়ে থাকবে। আচ্ছা দু'দিন পর যখন তার পেট বাড়বে, মানে একটা আনমেরিড মেয়ে প্রাগনেন্ট হয়ে গেছে এটা যখন পাড়ার মানুষ জানবে তখন লজ্জা কোথায় থাকবে? আমি বললাম, সেটাইতো। 

আজ রাতে তুমি যদি ওকে ডেকে আনো তবে আমি এই বিষয়টাই বুঝাবো তাকে। বলবো, সবার সামনে বিষয়টা খুলে বলতে। আর ও যখন সবকিছু খুলে বলবে তখনই তো আমার সুযোগ। তোমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বো তখন আমি!' শিশির হো হো করে হেসে উঠে বললো, 'তুমি আমার বারোটা না একটাও বাজাতে পারবে না। চ্যালেন্জ।'
'চ্যালেন্জ।' 

'যদি চ্যালেন্জ তুমি জিতো তবে তোমার যা ইচ্ছে তা করবে আমায়। আর আমি জিতে গেলে- 
'তুমি জিতে গেলে কী?' 'আমায় যেভাবে কাল সারা রাত বাইরে রেখেছো সেভাবে তোমায়ও এক রাত বাইরে রাখবো আমি।' আমি বললাম, 'সে দেখা যাবে।' অর্নিকে শিশিরের গিয়ে ডেকে আনতে হলো না।

রাতের বেলায় আমরা সবাই খেতে বসেছি তখন অর্নি আর অর্নির মা আমাদের ঘরে এলো। মা ওর দিকে তাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন, 'এতোক্ষণে এসেছিস। কী হলো তোর বল তো অর্নি? নিজের ভাইয়ের বিয়ে আর এতে তোর কোন আনন্দ উল্লাস নাই। 

সারাদিন বসে আছিস ঘরের ভেতর!' অর্নি মার কথা শুনে কিছু বললো না। মুখ ভার করে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মা এবার তার হাতটা ধরে প্রচন্ড ভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, 'এখনও যদি না বলতে পারিস তবে কখন বলতে পারবি রে মুখপুড়ি? অর্নির মা এবার তার হাতটা ধরে প্রচন্ড ভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, 'এখনও যদি না বলতে পারিস তবে কখন বলতে পারবি রে মুখপুড়ি?'

অর্নি তার মুখ ওড়না দিয়ে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তার মা এবার মুখ থেকে ওড়না টেনে খুলে নিয়ে ওর গালে দুটো চড় বসিয়ে দিয়ে বললেন, 'যখন ভুল করেছিলে তখন শরম কই ছিলো? এই কান্না তখন কই লুকাই ছিলো? এখন কান্না করে লাভ নাই। তোর সাথে যা হয়ছে তা বল।' অর্নি কিছু বলতে পারছে না কান্নার জন্য। সে আরো জোরে জোরে কাঁদছে। আর তার মা তার হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেই চলছে, 'এই মুখপুড়ি বল। 
বলস না কেন? মুখে কী কুলুপ আঁটছস?' অর্নি তবুও কাঁদে। ওর কান্না দেখে আমার কী যে মায়া হয়!আমি বুঝতে পারি ওর দুঃখটা। বেচারি মনে হয় আমার সংসারটা নষ্ট করে দিতে চাইছে না। লুকিয়ে রাখতে চাইছে সবকিছু। কিন্তু ওর মার জন্য পারছে না। মা যে সবকিছু জেনে গেছে! তাছাড়া পৃথিবীর কোন মা-ই কী চাইবে আর তার মেয়ের জীবনে দুঃখ নেমে আসুক! অর্নিকে এমন ভাবে কাঁদতে দেখে মা তার কাছে এগিয়ে গেলেন। 

মাকে এগিয়ে যেতে দেখে অর্নি গিয়ে জলের মতো লুটিয়ে পড়লো মার বুকের উপর।মা ওর পিঠে তখন আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,'কী হয়েছে রে অর্নি?খুলে বল তো মা!' অর্নির মা তখন সামান্য এগিয়ে এসে বললেন,'ওর কাছে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নাই। ও মুখে কুলুপ আঁটছে।যা জিজ্ঞাস করার আপনার ছেলের কাছে জিজ্ঞাস করেন! মা বড্ডো অবাক হলেন। 

আর অবাক হওয়া গলায় অর্নিকে ছেড়ে দিয়ে সামান্য সড়ে এসে বললেন, 'কী বলতাছো ছোটো? আমার ছেলের কাছে কী জিজ্ঞাস করবো? অর্নির মা তার মুখটা কেমন ভার ভার করে বললেন, 'আপনি জিজ্ঞাস করুন না আগে। বলুন,অর্নির সাথে সে কী করেছে?' 'মানে?' মার মুখ কেমন লাল হয়ে গেছে।হাত পা কাঁপছে। শিশির টেবিলের উপর বসে আছে।তাকেও কেমন বোকাসোকা দেখাচ্ছে। মা শিশিরের দিকে একবার তাকালেন। আরেকবার তাকালেন অর্নির দিকে। 

Koster kichu kotha bangla, Koster kotha bangla, Koster kotha sms, Onek koster kotha, Koster status Bangla, Koster kobita, Khub koster sms, Koster kotha pic, Koster pic, Khub koster pic, Bangla valobashar koster sms, Koster status pic, কিছু না বলা কষ্টের কথা, Koster kichu Kotha na bola kotha, obohelajibon blog, Life100, Life24, জীবনের গল্প - ১ম পর্ব - গল্প কথার ভেতর থাকে কথা - কিছু কষ্টের জীবনের কথা - বাংলা koster kichu kotha, কথার কষ্টের, জীবন কেনো এতো কষ্টের, এসো দুইজন মিলে, koster kichu kotha bolbo, ২য় পর্ব - গল্প কথার ভেতর থাকে কথা
free picture in bangla

অর্নির কান্না তখন অবশ্য থেমেছে। কিন্তু চোখ দিয়ে জল গড়ানো থামেনি। চোখের জল তখনও গাল বেয়ে টপটপ করে নীচে গড়িয়েই যাচ্ছে! মা আবার তাকালেন শিশিরের দিকে। কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কিরে শিশির, তোর ছোট কাকী মা কী বললো রে এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! নশিশির চুপ করে রইলো। 

কোন কথা বলছে না। অর্নির মা দূর থেকে দাঁড়িয়েই বললেন, 'এখন চুপ কেনো রে? অবুঝ মেয়েটাকে বুলিয়ে বালিয়ে দিলি তো সর্বনাশ করে! এখন যে তুই বিয়ে করে ঘরে বউ আনলি অর্নির কী হবে এখন?রআর ওর পেটের বাচ্চাটার?' মা এই কথা শুনে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি তার কাছে যেতে চাইলে তিনি ইশারা করে না করলেন। তারপর তিনি হাঁটতে হাঁটতে শিশিরের কাছে গেলেন। গিয়ে শিশিরের জামার কলার টেনে ধরে বসা থেকে উপরে তুলে নিয়ে মেঝেতে টেনে এনে প্রচন্ড জোরে তার গালের দুপাশে টানা চড় বসাতে লাগলেন। শিশির তবুও চুপ করে আছে। 

কিন্তু ও পাশ থেকে অর্নি হাউমাউ করে আবার কেঁদে উঠেছে।আর অর্নির মা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে শিশিরের মার খাওয়া দেখছে। তাকে দেখে বোঝা যায় তিনি খুব ভালো ভাবেই উপভোগ করছেন বিষয়টা। আমারও প্রথম প্রথম খারাপ লাগছিলো ওর মার খাওয়া দেখে। কিন্তু এখন ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে যে অপরাধ ও করেছে এর জন্য ওকে বটি দিয়ে কুটিকুটি করে কেটে ফেলা উচিত! আমার ভাবতে দেরি হলো কিন্তু মার এ কাজ করতে দেরি হলো না। 

মা ওকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে এসে শিশিরের একেবারে কাছে গিয়ে বললেন, 'কুত্তার বাচ্চা, তোরে আমি জীবনে একটা ফুলের টোকাও দেইনি।যা চাইচস তাই দিছি জীবন ভর। কোন কিছুর অভাব রাখিনি তোর আমি। আর তুই কি না কথা শেষ না করেই মা বটির কোপ ছেড়ে দিলেন শিশিরের ঘাড়ের উপর। কিন্তু ততোক্ষণে বটি আর শিশিরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে অর্নি। 

আমি মুহূর্তের জন্য ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলাম। চোখ খুললাম আমি অর্নির মায়ের প্রবল আর্তনাদে। তিনি আর্তনাদ করে বলে উঠলেন,'মা মারে তুই এইটা কী করলি? আমি চোখ খুলে দেখি অর্নির একেবারে কাঁধে পড়েছে বটির কোপটা। ওখান থেকে দরদর করে রক্ত নামছে প্রবল স্রোতে। মা হাতে বটি নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখে কোন শব্দ নেই। শিশির এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অর্নির গায়ের উপর।অর্নির মাথায়, মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে কান্নামাখা গলায় বলছে,'এটা কী করলি রে তুই বোন?এটা কী করলি তুই?' 

অর্নির মাও দৌড়ে এলো অর্নির কাছে। তিনি এসে অর্নির হাতটা ধরতে চাইতেই সে হাত সরিয়ে নিয়ে বললো, 'আল্লার দোহাই লাগে এই পাপি হাত দিয়া তুমি আমারে ছুঁইও না মা!' অর্নির মা মুখে আঁচল চেপে কেঁদে উঠলেন। অর্নি এবার হাতের ইশারায় আমায় ডাকলো।ডাকলো আমার শাশুড়ি মাকে। তারপর দু হাত দিয়ে আমাদের দুজনের হাত ধরে কাঁপতে কাঁপতে বললো, 'শিশির ভাইয়া আমার আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি আপন। ওর জন্য কোনদিন আমি ভাইয়ের অভাব বোধ করিনি।আমি ভুলেও জানি না শিশির ভাইয়া আমার দিকে খারাপ চোখে কোনদিন তাকাতে! আর তার উপর এই মিথ্যা অপবাদটা সাজিয়েছে এই আমার মা! কথাটা বলে সে কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতেই সে আবার বললো, 'আসলে শিলা আপুর বাবু যখন পেটে তখন আমি তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম আপুকে কাজে সাহায্য করতে। 

কদিন থেকেছিলাম ওখানে। আর ওই সময়ই দুলাভাই আমায় রেপড করে। কথাটা বলতে গিয়ে হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠে অর্নি। তারপর কান্নার গতি খানিক কমিয়ে এনে বলে,'আমি ভয়ে কারোর কাছে বলিনি কথাটা। এরপরই আমার পেটে বাচ্চা আসে।মা তখন সবকিছু বুঝে যায়। আমি খুলে বলি মার কাছে সবকিছু তখন। আর মা শুনে বলেন,তোর দুলাভাইকে এ নিয়ে কিছু বলা যাবে না।বললে, তোর বোনকে ডিভোর্স দিয়ে দিতে পারে ও।ডিভোর্স দিয়ে দিলে দুটো বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে তোর বোন! এরচেয়ে তুই ওই বিষয়টা ভুলে যা।আর মনে কর তোকে রেইপড করেছে তোর শিশির ভাইয়া।ওর যেহেতু বিয়ে ঠিকঠাক তবে এখন কিছু বলে লাভ নাই। বউ বাড়িতে আনুক। তারপর বউয়ের কাছে গিয়ে সব বলবি বানিয়ে। 

বলবি, আপনি শিশির ভাইয়াকে ডিভোর্স দিয়ে দিন। ও আমার সর্বনাশ করেছে।আমি কিছুতেই রাজি হইনা এ কথায়।এর জন্য মা আমায় অনেক মারে। অবশেষে রাজি হই আমি কোন উপায় না দেখে।আর তোমাদের বাসর ঘরে এসে এইসব কিছু বলি!' কথাগুলো বলে কাঁদতে থাকে অর্নি। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে সে।তার দু চোখ বেয়ে অজড় ধারায় জল নামে। অর্নি আর কথা বলতে পারছে না।ওর জখম হওয়া স্থান থেকে এখনও রক্ত গড়িয়ে নামছে। বাড়িতে এম্বুলেন্স আনা হয়েছে ফোন করে। কিন্তু অর্নি কিছুতেই হসপিটালে যাবে না।সে বললো,'আমার সময় শেষ।আর বাঁচবো না আমি। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো হসপিটালে গেলেও আর কাজ হবে না। 

তারপর সে তার মাকে কাছে ডেকে নিলো। কাছে ডেকে নিয়ে বললো, 'মা, এই তোমাদের মতো কিছু মায়ের জন্যই এভাবে অকালে ভেঙে যায় অনেক মেয়ের স্বপ্ন। অনেক মেয়ের সংসার। কখনো বা অনেক মেয়ের প্রাণ। তোমরা অন্যের ক্ষতি করতে চাও। কিন্তু এই কথা জানো না যে অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে উল্টো নিজের ক্ষতিই করে বসো তোমরা। অর্নির মা কাঁদছে। অর্নির গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। অর্নি শেষমেশ আমার দিকে তাকালো।আর আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে দীর্ঘ একটা শ্বাস ছাড়লো। তারপর আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে ফেললো। আর কিছুতেই সে চোখ খুললো না! সারা বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গিয়েছে। মা কাঁদছেন, অর্নির মা কাঁদছে , কাঁদছে বাড়ির অন্য সবকজন মানুষই। 

শিশির তখনও অর্নির একটা হাত চেপে ধরে কাঁদছে। আমি এবার তার কাছে গেলাম। গিয়ে শিশিরের একটা হাত ধরে বললাম,'আমায় ক্ষমা করে দাও শিশির।আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম! শিশির আমার দিকে জলভরা চোখে তাকালো। তাকিয়ে বললো, 'তোমার প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নাই। কিন্তু এই মিথ্যুক মহিলা আর তার মেয়ের জামাই যার জন্য আমার বোনের জীবন অকালে নষ্ট হলো তাদের আমি ছাড়বো না। কিছুতেই ছাড়বো না! অর্নির মার দিকে হুংকার ছেড়ে দিয়ে কথাটা বললো শিশির। 

-সমাপ্ত- 

লেখা: অনন্য শফিক

আমাদের অ্যাপ ফ্রি

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post