Facebook SDK


গল্প মায়াবতী - ৩য় পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প


পৃথু এক ধমক দিলো ভাইয়াকে।আর বললো, 'একবার বলেছি শুনোনি?এটা আমার আর আমার বোনের একান্ত ব্যাপার। এখানে এসে তোমার নাক গলানোর কোন প্রয়োজন দেখি না আমি!' ভাইয়া মনে হয় এক ধমক খেয়েই বেশ থতমত খেয়ে গিয়েছে। তবুও কিছু মানুষ আছে যারা বেহায়া হয়েই জন্ম গ্রহণ করে। এরা শতবার অপমানিত হওয়ার পরেও একই কাজ বারবার করে। ভাইয়া ঠিক এই ধাতের মানুষ।

ভাইয়া আবার বললো, 'একটু আগেই তো বৃষ্টিকে তোমার শত্রু বলেছো আর এখন বোন হয়ে গেল কীভাবে সে?'

পৃথু এখন যা ক্ষেপলো!সে রাগতস্বরে বললো,'শুনো মিতুল, তুমি হলা একটা কুত্তা।কুত্তার যেমন লাজ শরম কিছু নাই,তোমারও নাই।কথায় তোমারে ফুটবে না। আমি অন্য চেষ্টা করবো। তোমার মাকে ডাকি? বলি, জননী, আপনার ছেলে আমার সর্বনাশ করে ফেলেছে!আমি ওর নামে মামলা করতে থানায় যাচ্ছি। আপনার নামেও একটা মামলা দিবো। আপনি আপনার ছেলের সহযোগী!' ভাইয়া বললো, 'উঠো।' উঠে কী করবো। আরেকটু বসি। ডাক দেই তোমার মারে।' পৃথু ডাকতে চাইলো। ভাইয়া বোধহয় এরমধ্যে পৃথুর মুখ চেপে ধরেছে।

তারপর ভাইয়ার কন্ঠে কাঁপুনি। ভাইয়া বললো, 'তুমি অলোক্ষণে কান্ড-কারখানা করো না প্লিজ!আমি তোমার সব কথাই শুনতে রাজি!' পৃথু আনন্দে গদগদ হয়ে বললো, 'তোমার কপালটা এইদিকে আনো মিতুল। আমার ঠোঁটের কাছে আনো।'
ভাইয়ার কন্ঠে তখনও কাঁপুনি।
সে বললো, 'কেন কেন?'
'আরে ভয় নাই। কপাল ফাটাবো না। আদর করে চুমু খাবো।' এর খানিক পর ভাইয়া আর পৃথু রেডি হয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। এটা তুমি, মা সবাই জানো। আমি শুধু ভেতরের না জানা কথাগুলো তোমায় শুনিয়ে দিলাম ভাবী!

এতো কিছু ঘটে গেছে তবে!
কথার ভেতর এতো কথা সুপ্ত থাকে। অথবা একটা সুন্দর ঘটনার ভেতর অনেকগুলো কুৎসিত ঘটনা চুপচাপ বিষাক্ত সাপের মতো লুকিয়ে থেকে সুযোগের অপেক্ষা করে তা আমি কোনদিন ভাবিওনি পর্যন্ত! আমার শরীর ভীষণ রকম কাঁপছে।

কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই মাথায় আসছে না।পৃথুর মাকে আমার বাবা খুন করেছে মানে? আমার বাবা আর পৃথুর বাবা তো একই। মাও এক।বাবা তো দ্বিতীয় কোন বিয়ে করেননি।আর যেহেতু পৃথুর বড়ো আমি সুতরাং সবকিছু ওর চেয়ে আমার ভালো জানার কথা। কিন্তু ও এসব কী বলে বেড়াচ্ছে? এবার নিতুও আমায় সেই একই কথা জিজ্ঞেস করলো। সে বললো, 'আচ্ছা ভাবী, সব বুঝলাম কিন্তু একটা বিষয় ঠিক আমার মাথায় ধরছে না!'
'কোন বিষয়টা?'
'ওই যে তোমার বাবা পৃথুর মায়ের খুনি। তোমরা না আপন বোন?'
আমি এর উত্তরে কী বলবো? নিজেই তো কিছু জানি না! এর উত্তর একমাত্র পৃথুর কাছে আছে।
আমি বললাম, 'এই নিতু, এই বিষয়ে কিছু জানি না বোন। আমার এখন খুব খারাপ লাগছে। তুই এখান থেকে যা প্লিজ!'

আমি গেলে কী হবে? এখানে শুয়ে থেকে তুমি কাঁদবা তাই না? আচ্ছা তুমি অত ভীতু কেন ভাবী? তোমার বোন তোমার কথা একবার চিন্তা করছে না!তোমায় সে শত্রু মনে করে। দু'দিন পর এই পৃথুই তোমায় এ ঘর থেকে বের করে দিবে। তখন তো তোমার কান্না ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না! সুতরাং সময় থাকতে কিছু  একটা করো। এখন না কেঁদে প্রতিবাদ করো।আজ যে লজ্জার ভয়ে চুপ করে আছো এরচেয়ে বেশি লজ্জা তখন হবে যখন তোমার বোনকে ঘরের বউ বানিয়ে তোমায় ডিভোর্স দিবে ও!'

কান্নায় আমার বুক ভেঙে আসছে।নিতু তো আর জানে না পৃথুর জন্য কতটা মায়া আমার বুকে!কতটা ভালোবাসি ওকে আমি! এই মায়া থেকে বের হওয়া যে কঠিন! খুব কঠিন!'
আমি বললাম,'যা নিতু যা প্লিজ!'
নিতু বললো,'যাচ্ছি। কিন্তু আমি বলে যাচ্ছি তোমার কপাল তুমি নিজেই কিন্তু খাচ্ছো! আবার মাকেও বলতে নিষেধ করছো।'
এই কথা বলে নিতু এক রকম রাগেই বেরিয়ে গেল।

ও চলে যাওয়ার পর ঘরের সব দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে আমি বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ ডুবিয়ে কাঁদতে লাগলাম।আর ভাবতে লাগলাম,পৃথু কী সত্যিই কনসিভ করেছে? আচ্ছা ও যদি এটা করে থাকে তবে এর শেষ পরিণতি কী? আমি ভাবতে পারছি না।মাথা ভীষণ রকম ঘুরছে! এমন অসুস্থ শরীর নিয়ে অতকিছু ভাবা যায় না। তবুও আমি ভাবছি। দুশ্চিন্তার অথৈ জলরাশিতে ভাসছি আর ডুবছি। বারবার বারবার!

সন্ধ্যা বেলায় বিছানায় শুয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। মাগরিবের পর হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। তারপর ঘুম জড়ানো গলায় বললাম,'কে কে?'
ঘুম তখনও একেবারে চোখ থেকে যায়নি।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মা বললেন, 'আমি। দরজা খুলো।'
আমি ছোট ছোট পা ফেলে দরজা খুলে দিতেই মা ঘরে ঢুকলেন। তারপর বললেন,'কী গো বউমা ব্যাপার কী?'
ভয়ে আমি কেঁপে উঠলাম। বললাম, 'কেন মা কী হয়েছে?' এই যে অবেলায় ঘুমাইতেছো! ইদানিং দেখি তুমি নামাজ কালামও পড়ো টড়ো না। ঘটনা কী?'

আমি বললাম, 'মা,কাল থেকে পড়বো।'
তারপর মা চুপচাপ আরো খানিক সময় দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ করে বললেন,'আচ্ছা বউ মা, ওদের ভাব সাব তো কিছু বুঝতাছি না!'
'কাদের ভাবসাব মা?'
মা একটু রাগমাখা গলায় বললেন,'দুনিয়ায় তোমার মতন বেক্কল মেয়ে ছেলে বোধহয় আর একটাও নাই! কিছুই বুঝে না। 

এই যে তোমার শেয়ানা বোন একটা পুরুষ মানুষের সাথে রাত বিরাতে ঘরে বাইরে চলাফেরা করে।হাসি তামাশা আরো কত কী করে! আজকে আবার ডাক্তারের কাছে গেলো! এইসব কিছু কিন্তু আমার কাছে ভালো ঠেকতাছে না! কিন্তু তোমার তো দেখি এইদিকে কোন নজরই নাই!'

আমি কী বলবো এখন? এতো দিন তো আমি বুঝতে পারিনি। ভেবে এসেছি ওরা ভাই বোনের মতোই। কিন্তু এই ভাই বোনের সম্পর্কের আড়ালেও যে আরেক সম্পর্ক তারা গড়ে তুলেছে তা তো আগে জানতাম না। কোনদিন ভাবতেও পারিনি এমন! আসলে আমরা শুধু বাইরের বিষয়গুলো দেখি। ভেতরকার কিছুই আমাদের নজরে পড়ে না। 

কিংবা ভেতরকার কোন কিছু আমরা ভেবেও দেখি না কোন সময়! পর্দার আড়ালেও অনেক কিছু ঘটে।আর তা চাপা স্বভাবের মেয়েরা কোনদিন ভয়ে, লজ্জায় প্রকাশ পর্যন্ত করতে পারে না! এবার আর চুপ থাকা নয়। আমি কথা বলবো। একটা প্রতিবাদ গড়ে তুলবো। মা বললেন, 'চুপ করে আছো কেন? সমস্যা টা আমার না তোমার! পুরুষ মানুষ ভেজা বেড়ালের মতো। উম পেলেই ওরা মুখ গুঁজে।আদর করে খাবার দিয়ে ডাকলেই লোভে সেই খাবার খেতে যায় এরা। আর খাবার খুলে রেখে আড়ালে গেলেই সর্বনাশ।বিড়াল সেই খাবার খাবেই! পুরুষেরাও ঠিক তেমন!' আমি বললাম, 'মা ওরা আজ ফিরুক। এর একটা বিহিত করবো আমি! অত ঘুরাঘুরি কিসের তা আজ জিজ্ঞেস করবো!'
মা বললেন।

* মা বললেন, 'ওদের দু'জনের কথা নয়। একজনের কথা বলো। আগে তোমার বোনকে ঠিক করো। তারপর আমার ছেলে ছেলে এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে।' মার কথাটা শুনে আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। যে মাকে আমি একজন ইনসাফওয়ালা মানুষ মনে করতাম এতো দিন আসলে তিনি  ততটা নন। 

একজন ইনসাফওয়ালা নারী তার ছেলে মেয়ের প্রতি যেমন হবে,অন্যের ছেলে মেয়ের প্রতিও ঠিক তেমনই হবে। অন্যের মেয়ের দোষ বলে নিজের ছেলেকে নিরপরাধ দাবি করবে না কিংবা নিজের অপরাধী সন্তানের পাপকে প্রশ্রয় দিবে না!মার এই মাত্র একটি কথায়ই আরেকটি কথার প্রমাণ হলো যে পৃথিবীতে নারীগণই নারীদের বড়ো শত্রু, পুরুষগণ নয়।

গল্প মায়াবতী - ৩য় পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প, মায়াবতী গল্প, মায়াবতী কবিতাগুচ্ছ, মায়াবতী নিয়ে উক্তি গল্প, অখিলেশ যাদব, মায়াবতী নিয়ে উক্তি, মায়াবতী ৫ম ৬ষ্ঠ ৭ম গল্প, মুগ্ধতা নিয়ে গল্প, সংসার নিয়ে গল্প, মায়া নিয়ে মায়াবতী গল্পের কথা, স্নিগ্ধতা নিয়ে গল্প, জীবন নিয়ে গল্প ১ম, মায়াবতী নিয়ে গল্পকার ৩য় পর্ব, মায়া নিয়ে স্ট্যাটাস বাংলা, মায়াবতী কষ্টকর, কেনো এতো মায়াবতী, কষ্টের সংসার, লেখা পিকচার কষ্টের, কষ্টের পিকচার মেসেজ, দুঃখ কষ্টের ছবি, শুধু কষ্টের পিকচার, কষ্টের পিকচার ডাউনলোড, কষ্টের কিছু ছবি, কষ্টের পিকচার HD, ভালবাসার কষ্টের পিকচার, কষ্টের পিক ছেলে, ছেলেদের কষ্টের পিক, কষ্টের পিকচার চাই, কষ্টের পিক মেয়ে
স্বপ্ন নিয়ে লেখা পিকচার বাংলা

আমি মুখ ফুটে বলেই ফেলতে চেয়েছিলাম,মা আপনি এটা কীভাবে বলতে পারলেন? আপনার তো উচিৎ ছিল নিজেই নিজের সন্তানের শাসন করা! কিন্তু বলতে পারলাম না। বলতে পারলাম না এই ভয়ে যে শেষে যদি আমার শাশুড়িও আমার প্রতি রুষ্ট হন। তিনি যদি আমায় সহ্য করতে না পারেন তখন কী হবে আমার? একা একা কী ই বা করতে পারবো আমি!

শাশুড়ি ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যে মিতুল আর পৃথু ঘরে ফিরলে দুজনকেই কড়া কথা বলবো আমি। মাকে ডেকে মায়ের সামনেই সবকিছু বলে দিবো। আগে আমার বাঁচতে হবে তারপর অন্যকে ভাবনা! ভুল যা করেছি তা তো আগেই করেছি। এখন আর নয়!পরে পৃথু করবে তা সে নিজেই ভেবে নিবে। বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলে সে একাই যাবে।অতকিছু যে মেয়ে বুঝে সে তার বোনের ব্যাপারে কেন কিছুই বুঝবে না? এখানে কোন একটা কিন্তু তো আছেই! এই কিন্তু টা আসলে কী?

রাত বাড়ছে। ওরা ফিরছে না। চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠছি আমি! ওরা কোথায় আছে? কী করছে? নিতু এলো একটু পর। এসে বললো, 'ভাবী, ব্যাপার কী বল তো? আমার তো কেমন সন্দেহ সন্দেহ লাগছে!'
'কী সন্দেহ লাগছে?'
'না তেমন কিছু না। কিন্তু ওরা দেরি করছে কেন?'
'এটা আমি কী করে বলবো যে ওরা দেরি করছে কেন!'
'ফোন দেওনি তুমি?'
'দিয়েছি। রিসিভ করেনি।'
'তোমার কী ওদের জন্য টেনশন হচ্ছে না?'
'না।'
'কেন? টেনশন হচ্ছে না কেন?'
'কার জন্য টেনশন করবো?আপন মানুষের বিপদের কথা ভেবে মানুষ টেনশন করে কিন্তু ওরা তো আমার আপন কেউ নয়!'
'না ভাবী ভুল বলেছো তুমি। আপন মানুষের বিপদের কথা ভেবে মানুষ টেনশন করে না। মানুষ টেনশন করে তার নিজের বিপদের কথা ভেবে।ধরো, ভাইয়া পৃথুকে নিয়ে আর ফিরে এলো না। তখন কী হবে তোমার? এই টেনশন কিন্তু ভাইয়ার চেয়ে বেশি তোমাকে নিয়েই!' আমি ভেবে অবাক হলাম। এই যে অতটুকু বয়স হয়েছে আমার আমি তো অত গভীর করে কিছু ভাবতে পারি না। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়ে গুলো অতকিছু ভাবে কী করে!

আমি বললাম, 'নিতু,তোর কী সন্দেহ হচ্ছে ওদের নিয়ে এটা বল। 'তোমার যা সন্দেহ হচ্ছে তাই।' 'আমার সন্দেহ হচ্ছে ওরা আজ ফিরবে না।' 'ভাবী ওরা আসলেই কোনদিনও ফিরবে না!' পৃথুর সব কথাই কিন্তু শেষমেশ সত্যি হচ্ছে।ওর এই কথাটা শুনেও আমার বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো। যদি এমন হয় সত্যিই!যদি ওরা আর ফিরে না আসে!

অন্ধকার গোগ্রাসে গিলে রাত দীর্ঘ হচ্ছে।মা এসেছেন বার কয়েক। তিনি এসে কত কথা যে শুনিয়েছেন আমায়! এবার শুধু ফিরুক। তুমিই লায় দিয়ে ওই মেয়েকে নষ্ট করেছো! এবার দু'বোনকেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিবো। আমার বাড়ির মান সম্মান না থাকলে আমি তো কারোর বাঁচা মরা বুঝবো না।কে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিবে তাও আমার দেখার বিষয় না! ঘরে মার উচ্চ গলা শুনে নিতু এলো। এসে বললো, 'মা, তুমি এমন কেন? কোথায় এসে একটা অসুস্থ মানুষকে তুমি শান্তনা দিবে।সাহস জোগাবে তার মনে। আর তুমি তাকেই বকাঝকা শুরু করেছো। 

আচ্ছা ভাবীর দোষটা কী শুনি? নিজের ছেলের কথা তো একবারও তুললে না।আমি তো মনে করি সবটুকু দোষ তোমার ছেলের।পৃথু তো এমন মেয়ে ছিল না। ও যদি নষ্ট হয়ে থাকে তবে তোমার ছেলের জন্যই হয়েছে! মা নিতুর কথা শুনে ভীষণ রেগে গেলেন।আর ওর কাছে এসে ওর গালে পরপর দুটো চড় বসিয়ে দিয়ে বললেন,'ভাবীর মুরিদ হয়ছস? তোকে যদি আরেকবার এখানে আসতে দেখি,ওর সাথে কোন কথা বলতে দেখি তবে তোর ঘাড় মটকে দিবো!' নিতু‌ কাঁদলো না।সে তার মায়ের দিকে রক্তচক্ষু করে তাকিয়ে রইল। মা এবার তার হাত ধরে টেনে টেনে ওকে মার ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন।

রাত কেবল বাড়ছেই।আর আমি অপেক্ষা করছি।এ অপেক্ষা কিসের?কারোর চিরতরে ফিরে আসার নাকি একেবারেই হারিয়ে যাওয়ার।আমি জানি না, জানি না, জানি না!

* ওরা ফিরেনি। সারাটা রাত আমি জেগে জেগে কাটিয়েছি। টিনের চালের উপর এক ফোটা শিশির কিংবা গাছ থেকে একটা পাতা ঝরে পড়ার শব্দ শুনে বারবার আমি আঁতকে উঠেছি।ভেবেছি এই বুঝি ওরা ফিরলো!সন্তর্পণে কাঁপা কাঁপা হাতে দরজার ছিটকিনিতে হাত দিয়েছি। দরজা খুলে দিয়েছি।ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে দেখেছি। 

না আসেনি ওরা। মন খারাপ নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেছি তখন নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে। আর চোখ থেকে ফেলেছি টপটপ করে অগুনতি জলের ফোঁটা। তারপর দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে আবার ধীরে সুস্থে বিছানায় এসে শুয়েছি। তারপর বিছানায় পড়ে থেকে কেঁদেছি। অনেক বার আমি উচ্চ শব্দে কেঁদেছি। কিন্তু মা আসেননি একবারের জন্যও।  নিতু হয়তোবা আসতে চেয়েছিল। কিন্তু মা তাকে আসতে দেয়নি। মাকে তো এতো দিন আমি স্বর্গীয় মহিলা মনে করতাম। কিন্তু আজ তিনি প্রমাণ করে দিলেন তিনি কতটা জঘন্য মহিলা!

সকাল বেলা একটুখানি ফাঁক পেয়ে নিতু দৌড়ে এলো আমার ঘরে। তখন মা নামাজ পড়ছিলেন।নিতু এসে বললো,'ভাবী,সারা রাত আমার একটুও ঘুম পায়নি। আমার নিজেরই খুব খারাপ লেগেছে।আমি তখন খুব ভেবেছি তোমার যে কতটা খারাপ লাগছে! নিতুর কথা শুনে আমার চোখ ছলছল করে উঠলো জলে। নিতু বললো, 'ভাবী, ওরা কী আর ফিরবে না তবে?

আমার কান্না পেয়ে গেল। খুব কান্না পেয়ে গেল।আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,'নিতু,আমি কিছু জানি না রে বোন।আমি কিছুই জানি না।' নিতু আমার দিকে তার লাল হওয়া  চোখে তাকিয়ে আছে। আমি মনে মনে ভাবছি, এই পৃথিবীতে তো আমার আর কেউ নাই। বাবা নাই, মা নাই ভাই নাই,আজ থেকে বোনটাও নাই।কার কাছে গিয়ে একটুখানি মাথা গুঁজবো আমি! আমার বিপদের দিনে  কে এসে আমার পাশে দাঁড়াবে?কে আমায় সাহায্য করবে!

নিতু চলে গেল। যাওয়ার সময় বললো,'মা হঠাৎ কেন এভাবে বদলে গেলেন কিছুই বুঝতে পারছি না আমি! ভাইয়ার বিষয়ে তিনি চুপ কেন কিছুই বুঝতে পারছি না! বলে সে চলে গেল।নিতু চলে যাওয়ার পর বারবার মিতুলের মোবাইলে ফোন দিলাম। কিন্তু ওর ফোনের সুইচ অফ। সেই একই কন্ঠে একটি মেয়ে বারবার এক কথাই বলে যাচ্ছে। দুঃখিত! এই মুহূর্তে আপনার কাঙ্খিত নম্বরটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না! আমার কষ্ট হচ্ছে। খুব খুব কষ্ট হচ্ছে। কেন মিতুল বুঝতে পারছে না! কেন মোবাইল ফোনের সুইচ টা অন করছে না ও!

এরপর এলেন মা। এসেই তিনি আমায় বকাঝকা শুরু করে দিলেন। আমার মৃত মাকে নিয়েও তিনি নোংরা নোংরা কথা বললেন।আর আমায় বললেন,'আমার মিতুল কই?তোর বোন আমার ছেলেরে নিয়ে কই গেছে? তুই সব জানস। তুই আমার ছেলেরে আজকের ভেতর ফিরত এনে দিবি। 

না আনতে পারলে তোরেই এই ঘর থেকে বের করে দিবো আমি। আমার ছেলে না থাকলে তোরে দিয়ে কী করবো আমি! আমি অসহায়ের মতো তখন বললাম, 'মা কোন স্ত্রী কী পারে তার স্বামীকে অন্যের সাথে পালাতে সাহায্য করতে? কেউ কী নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনতে চায়?মা, আমার পেটে তো আপনার ছেলের সন্তান। সেই সন্তানের কসম করে বলছি এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না!'

মা বললেন, 'জানস জানস, সব জানস।ঘর থেকে বের করে দিলেই সব কথা বের হবে!' ঠিক তখন নিতু এলো এখানে। তার মার কথাগুলো সে শুনেছে। সে এসেই বললো, 'মা, তুমি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছো! ভাবীর কী দোষ হলো এখানে? আর তোমার ছেলে কী দুধের শিশু নাকি যে তাকে কেউ কোলে করে নিয়ে পালিয়ে যাবে? আমার তো মনে হয় সবটা দোষ তোমার ছেলের।আর তোমাকেও আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে!

এই কথা বলতেই মা ভীষণ রেগে গেলেন।আর সঙ্গে সঙ্গে নিতুর চুল ধরে টেনে এ ঘর থেকে বের করে নিতে নিতে তিনি বললেন,'তোকেও নষ্ট হওয়ার পথে নিয়ে গেছে এই মেয়ে! ওকে আমি আর এই ঘরে রাখবো না। আজকের ভেতর যদি আমার ছেলে বাড়িতে না ফিরে আসে তবে আজকে রাতেই ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এ বাড়ি থেকে বের করে দিবো আমি!' নিতুর চুল তখনও মুঠো করে ধরে টেনে নিচ্ছেন মা।

নিতু তখনও চুপ থাকেনি।সে তার মার কথার পাল্টা জবাব দিলো।সে বললো,'ভাবীকে না ঘর থেকে বের করেই দিলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে। কিন্তু ভাবীর পেটে যে তোমার রক্তের সন্তান, তোমার নাতনি?ওকেও কী ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে? মা এ কথার কোন জবাব দিলেন না। তিনি নিতুর চুল ছেড়ে দিলেন।আর চুপচাপ ঘরের ভেতর চলে গেলেন।

সারাটা দিন গেল।আমি কিছু খাইনি।মাও এসে বলেননি খেতে। বিকেল বেলা নিতুই এলো খাবার নিয়ে। এসে বললো, 'হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে নাও। আমি বললাম, 'আমি খেতে পারবো নারে বোন। আমার গলা বেয়ে কিছুতেই খাবার নামবে না নিতু!'

নিতু আমার শিউরের কাছে বসলো। বসে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, 'তোমার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না। তাছাড়া তোমার পেটে বাবু আছে। তোমার জন্য তুমি না খেতে পারো। কিন্তু বাবুর জন্য তো তোমার খেতে হবে! নিতু জোর করেই আমার মুখে খাবার তুলে দিলো। কিন্তু জোর করেও দু'নলা ভাত আমি খেতে পারলাম না। কান্নায় আমার মুখ ভেঙে এলো।

নিতু বললো, 'কেঁদো না ভাবী! ভাইয়া দেইখো একদিন ঠিক ঠিক ফিরে আসবে। সত্যি সত্যি ফিরে আসবে!' আমি কান্নাভেজা গলায় নিতুর দিকে তাকিয়ে বললাম, 'না আসবে না। চলে যাওয়া মানুষ কোনদিন পরিপূর্ণ ভাবে ফিরে আসে না। আসে তার ছায়া হয়ে। সেই ছায়া স্বপ্নের মতো।ভাঙা ভাঙা, আবছা, আধো অন্ধকার!

চলবে

লেখক: অনন্য শফিক

সবার আগে গল্প পেতে আমাদের অ্যাপটি ডাউনলোড করে রাখতে পারেন! ধন্যবাদ

আমাদের অ্যাপ ফ্রি ডাউনলোড

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post