Facebook SDK


গল্প মায়াবতী - ৪র্থ পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প


পরপর তিনদিন কেটে গেল। মিতুলেরা আর ফিরলো না।তার ফোনও খুললো না। আমি শুধু অপেক্ষা করতে লাগলাম।

নিতু আমার পাশে আজকাল আসে।কথা বলে।সেবা যত্ন করে। মা বাঁধা দেন না। তবে মা পাশে এসে আমার সাথে গল্পও করেন না। কেমন মুখ ভার করে রাখেন। যেন তিনি আমার প্রতি খুব ক্ষীপ্ত, বিরক্ত! গতকাল বিকেলে আমার শরীর খারাপ। মাথায় প্রচন্ড রকম ব্যাথা। বিছানা থেকে কিছুতেই উঠতে পারছি না।নিতু দু দু বার গিয়ে মাকে বলেছে। প্রথমবার বলেছে 'মা, ভাবীর কাছে একটু যাও না!দেখো গিয়ে ভাবী মাথা ব্যথায় কাঁদছে! মা তার কথার উত্তর দিলেন না। আসলেনও না। নিতু দ্বিতীয় বার গেলো মার কাছে। গিয়ে সে বললো, 'ও মা তোমায় না একবার বলে গেছি  ভাবীর মাথা ব্যথা করছে। তুমি তো শুনলেও না পর্যন্ত কথাটা!'

মা এবার খুব ক্ষীপ্ত হলেন নিতুর প্রতি। নিতুর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'ও কী মরে যাচ্ছে যে তার কাছে দৌড়ে আমার যেতে হবে?' নিতুরও ভীষণ রাগ পেয়েছে তখন। সে গলা উঁচু করেই বললো, 'তুমি তো ভাবীর মরণটাই চাইছো! ভাবী মরে গেলেই তুমি বাঁচলে!'
মা নিতুকে ডাকলেন।
নিতু মার কাছে যেতেই ওর গাল কসে দু দুটো চড় বসালেন তিনি। তারপর বললেন, 'আরেকবার থেকে বড় মানুষের মতো কথা বলতে আসবি না বলছি। খুব বড় হয়ে গেছে সে!'
মা ব্যাঙ্গ করে কথাটা বললেন।
নিতু রাগে এবং দুঃখে কেঁদেই ফেললো। কাঁদতে কাঁদতে আবার আমার ঘরের দিকে আসতে আসতে বললো, 'মা, তুমি যে অতটা নোংরা মহিলা তা আমি আগে ভাবিওনি পর্যন্ত! মা, আমার লজ্জা হয় তোমার সন্তান বলে ভাবতে নিজেকে!' মা নিতুর কথার জবাবে কিছুই বলেন না।চুপ করে থাকেন।

নিতু আমার কাছে এসে আমার মাথায়, কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। আমি অতি কষ্টে ওর একটা হাত মুঠো করে ধরি। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলি, 'নিতু, মানুষ কেমন জানিস?'
নিতু বললো, 'কেমন?'
আমি বললাম, 'বিচিত্র। কখনো কখনো আপন বোনটাই হয়ে যায় পরম শত্রু আবার কখনো কখনো রক্তের কোন সম্পর্ক নাই অথচ এমন একটা মেয়ের সাথেও গড়ে উঠে আপন বোনের মতো নিবিড় সম্পর্ক।'

নিতু আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়। আমি তখন বলি, 'নিতু, আমি যদি মরে যায় তবে কী আমার জন্য তোর মন খারাপ হবে?' নিতুর চোখ ছল ছল করে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে সে আমার মুখে হাত চেপে ধরে বলে,'কক্ষনো না। এমন অলুক্ষোণে কথা কখনো বলবে না তুমি!' আমি বললাম, 'বেঁচে থেকে লাভ কী বল? কে দেখবে আমায়?কে খাওয়াবে,কে পরাবে?'

নিতু আর কোন উত্তর খুঁজে পায় না আমার কথার। শুধু বা হাতের পিঠ দিয়ে তার দু চোখ মুছে। নিতুর দিকে তাকালেই আমার খুব মায়া হয়। কিন্তু রাগও পায় খুব। হঠাৎ মনে পড়ে যায় পৃথুর কথা।পৃথুটা আমার সাথে এমন কিছু কীভাবে করতে পারলো!

রাতে আমার শরীর আরো খারাপ হলো। খুব দূর্বল লাগছে নিজেকে। নিতু বললো, 'ভাবী আজ আমি তোমার সাথে থাকবো।' আমি বললাম, 'মা তো তোকে থাকতে দিবে না!' নিতু বললো,'একশোবার দিবে। দিতেই হবে।না দিলে আমি জোর করে থাকবো।' নিতু, সামান্য থাকা নিয়ে ঝামেলা করে পরে দেখবি মা তোকে আর আমার কাছেই ঘেঁষতে দিবে না। প্রয়োজন নেই এসবের।আমি একাই থাকতে পারবো।' নিতু আর কোন কথা বললো না। চুপচাপ এখান থেকে চলে গেল। তারপর দেখা গেল রাতে শুওয়ার সময় কাঁথা বালিশ নিয়ে সে ঠিকই হাজির।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললাম, 'মার কাছে বলে এসেছিস?' 'না। বলতে হবে কেন? তিনি কী জানেন না তোমার এখন একা থাকলে সমস্যা হতে পারে!' নিতু তুই এখনও ছোট! তোর ভেতর এতো প্যাঁচগোছ নাই। তাই তুই তোর মতো করে সাধারণ ভাবে ভাবতে পারছিস! কিন্তু মা অতটা সাধারণ ভাবে নিবেন না বিষয়টা। এ নিয়ে মহা ঝামেলা পোহাতে হবে আমার দেখিস!' নিতু তবুও শুনলো না আমার কথা। মার উপর রাগ বজায় রেখেই শুয়ে পড়লো আমার সাথে। এবং খানিক পর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

শেষ রাতের দিকে কারোর ধমকে ঘুম ভাঙলো। তাকিয়ে দেখি মা। তিনি আমার দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে বললেন, 'আস্তে আস্তে আমার মেয়েটাকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে!' মার কথাটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।এটা কোন ধরনের কথা বললেন তিনি! আমায় চুপ করে থাকতে দেখে মা বললেন, 'কোন সাহসে ওকে এনে সাথে রেখেছো? কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিতুকে এখানে এনে রেখেছো?' আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,'নিতু নিজেই তো এসেছে থাকতে।সে এসে বললো,ভাবী, তোমার শরীর খারাপ,আমি তোমার সাথে থাকবো।'

'চুপ করো! একটা বাচ্চা মেয়ে এসে বললো আমি তোমার সাথে থাকবো আর তুমি তাকে সাথে রেখে দিলে! এভাবেই নিজের বোনটাকে লায় দিয়ে দিয়ে বাঁদর বানিয়েছিলে! এখন সে পুরো গোষ্ঠী সহ নাচাচ্ছে!' নিতু ঘুমে ছিল। উচ্চ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সে চমকে উঠলো ঘুম থেকে। তারপর পরিস্থিতি বুঝে বললো,'কী হয়েছে মা?'
'এই তুই খাট থেকে নেমে আয়!'
'কেন নেমে আসবো?'
'মার সাথে তর্ক শুরু করছিস! তোকে কে এইসব করতে শিখিয়েছে? তুই বলবি না কিন্তু আমি সব বুঝি!আয়,খাট থেকে নেমে আয় বলছি!'
নিতু খাট থেকে নেমে এলো না। সে চুপচাপ খাটের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে রইল। মা আরেকবার রক্তিম চোখে তাকালেন তার দিকে। তারপর চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নিঝঝুম রাত। দরজায় ঠকঠক করে আওয়াজ করছে কেউ। আমার মনে হয় এটা ভ্রম। এইসব হয়তোবা আমার মনের অলীক কল্পনা। তবুও আমি বিছানা থেকে ধীরে সুস্থে উঠি। তারপর দরজার কাছে যাই। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা খুলি। তারপর দেখি ওরা।ওরা ফিরে এসেছে।মিতুলের গায়ে নতুন শেরওয়ানী।পৃথুর গায়ে জড়ানো লাল টুকটুকে শাড়ি। আমার বিশ্বাস হতে চায় না এসব।পৃথু আমার দিকে তাকিয়ে বলে,' তুই এইঘর ছেড়ে চলে যা। আর আলমাড়ির চাবিটা দে আমার কাছে।' আমি মিতুলের দিকে তাকাই। মিতুল চুপ করে তাকিয়ে থাকে।

পৃথু এবার মিতুলকে বলে, 'এই, ওকে বলো না এ ঘর ছেড়ে চলে যেতে!' মিতুল এবার আমার দিকে তাকায়। তারপর বলে, 'যাও। চলে যাও।' আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠি। অনুনয় করে বলি, 'এসব কী বলছো মিতুল! এসব কী বলছো তুমি!' চলে যাওয়ার কথা বলছি। আমার জীবনে একটাই মাত্র শূন্যস্থান এবং এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য একটি মাত্র মানুষের প্রয়োজন।আমি তো দুটো মানুষ নিতে পারবো না!' আমি বললাম, 'তাহলে আমাকে রাখো।আমিই তো দীর্ঘদিন ধরে তোমার এই শূন্যস্থান পূরণ করে রেখেছি!' মিতুল আমার হাত ধরলো।আর একটানে ঘর থেকে বের করে অন্ধকারে নামিয়ে দিয়ে বললো, 'না তুমি আমার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারোনি।পারোনি বলেই বিকল্প একজনকে আমি বেঁচে নিয়েছি।'

অন্ধকার পথে আমায় ছেড়ে দিয়ে মিতুল দরজা বন্ধ করে দিলো।আমি হাঁটছি। অন্ধকার পথে।ভাঙা কাঁচের টুকরো, উঁচু নিচু ইঁট-পাথরের টুকরো,চোরা বিষ কাঁটা এসে বিঁধছে আমার পায়ে।রক্তে মেখে যাচ্ছে পায়ের সেন্ডেল। এইসব নিয়েই হাঁটছি আর বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছি।ভাবছি,মিতুল বোধহয় টর্চ নিয়ে দৌড়ে আসবে আমার কাছে। তারপর পেছন থেকে আমার হাত টেনে ধরে তার বুকের সাথে জাপটে নিবে আমায়। কপালে,গালে আদর মাখা চুমু খেয়ে বলবে, এই কালনাগিনীকে ছেড়ে আমি পালিয়ে এসেছি।আসো,আমরা দূরের কোনো দেশে চলে যায়। যেখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না।'

কিন্তু না। মিতুল এগিয়ে আসছে না। জলে জলে চোখ আমার বারবার ভিজে উঠছে। টপটপ করে গালের উপর গড়িয়ে পড়ছে সেই জল। আমি হাঁটছি। এই পথ বড় অজানা এবং অচিন। এই পথের গন্তব্য আমার জানা নেই।পথে যদি কোন বিপদ হয়।যদি কোন শকুন মানব এসে আমার হাত টেনে ধরে। শুইয়ে দেয় ঝাড় ঝোপের ভেতর। হাত মুখ বেঁধে ফেলে। তারপর। তারপর আর কিছু ভাবতে গেলেই কানে আঙুল চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে আমার!

* মায়াবতী ৯ম পর্ব
ঘুম ভাঙলো আমার কাঁদতে কাঁদতে।জল তেষ্টায় বুকটা হাহাকার করে উঠলো।রাত কত হবে বোধহয়? বালিশের কাছে রাখা ফোন অফ হয়ে আছে।চার্জ দেয়া হয়নি রাতে।দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা অনেক দিন যাবৎ সাতটা পঁয়ত্রিশের ঘরে আটকা পড়ে আছে। কিছুতেই আর নড়ছে না।ঘড়িটা ঠিক করা প্রয়োজন মনে হয়নি আগে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ঠিক করা প্রয়োজন।

এই যে এখন মনে হচ্ছে যদি জানলা খুললেই ভোরের আলো ঠেলে আসতো ভেতরে।ভাঙা ভাঙা রোদ এসে পড়তো জানলার শিকে।কী যে ভালো হতো! আমার ভয় করছে। শরীর কাঁপছে ভয়ে!স্বপ্নটা কী বীভৎস আর ভয়ঙ্কর!যদি সত্যি সত্যিই এমন হয়!

'নিতু, নিতু?'
ভয়ে আঁতকে উঠা গলায় নিতুর গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকলাম আমি। নিতু শিউরে উঠে আধঘুমো শরীর টেনে তুলেই বিছানার উপর জড়োসড়ো হয়ে বসলো।আর কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,'কী হয়েছে ভাবী?'
আমি শান্ত এবং স্বাভাবিক গলায় বললাম,'সুইচ টিপে টিউব লাইট টা জ্বালিয়ে দে।' নিতু অন্ধকারেই হাতড়াতে হাতড়াতে সুইচের বোর্ড খুঁজে বের করে সুইচ টিপে লাইট জ্বেলে দিলো। যাহ এখন একটু ভয় কমছে! নিতু খাটের উপর উঠে বসতে বসতে বললো,'কী হয়েছে বল তো ভাবী? শরীর খারাপ করেছে?'
'বলছি। আগে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দে।'

নিতু কল ছেড়ে একগ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দিল আমার হাতে। সেই পানি হাতে নিয়ে ঢকঢক করে গিলে খেয়ে খালি গ্লাসটা খাটের পাশে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে বললাম,'আয়। বিছানায় উঠে আয়। শুয়ে পড়ি।' নিতু বললো, 'লাইট নিভিয়ে আসি!' 'না। আমার ভয় করছে। অন্ধকার আমার ভয় করে!' নিতু লাইট না নিভিয়েই উঠে এলো বিছানায়। তারপর আলতোভাবে আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, 'খারাপ স্বপ্ন দেখেছো?'
'হুম।'
'কী দেখেছো বলো না?'
'নাহ। ভয় করছে বলতে। সকাল বেলা বলবো।'
'সকাল হতে আর কতদূর?কটা বাজে দেখ তো?'
ফোন আবার চার্জ না দিয়ে শুয়ে পড়েছি। নিতু বলার পর আবার মনে পড়লো!
আমি বললাম, 'ফোনে একটুও চার্জ নেই। রাত থেকে অফ হয়ে আছে। সময় টময় কিছুই দেখতে পারছি না। যা ফোনটা চার্জে দিয়ে আয় একটু কষ্ট করে।' নিতু ফোন নিয়ে আবার উঠে গেল চার্জে লাগাতে। 

কিন্তু উঠার সাথে সাথেই ইলেকট্রিসিটা চলে গেল।সে ওখানে দাঁড়িয়েই একটা গাল বকলো ইলেকট্রিসিটিকে। কিন্তু গাল বকে আর লাভ কী? ইলেকট্রিসিটি তো আর এইসব গাল টাল শুনতে পায় না! নিতু অন্ধকারেই চার্জারের সাথে ফোন লাগিয়ে আসে। ইলেকট্রিসিটি এলে চার্জ হবে। তারপর বিছানায় এসে আমার সাথে শুয়ে পড়ে। আমার আবার ভয় করতে শুরু করে। ভীষণ ভয়! এমন হচ্ছে কেন আজ? এমন বীভৎস স্বপ্নের চেয়েও বাস্তবে ওদের দুজনকে যেভাবে দেখেছি তা ছিল আরো ভয়ংকর। তবুও তো এমন হয়নি আমার! কেন? অন্ধকারে আমি কাঁদছি। 

না ইচ্ছে করে নয়। চেষ্টা করছি ঠিক থাকতে কিন্তু মোটেও পারছি না। নিতু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, 'ভাবী, ভয় করছে তোমার?'
আমি কান্নাভেজা গলায় বললাম, 'হুম।'
নিতু বললো, 'কথা বললে ভয় পাবে না আর। আসো আমরা গল্প করি।'
আমি বললাম, 'কী গল্প করবি?'
'রাজা রানীর।'
'শুরু কর তাহলে।'
নিতু বলতে শুরু করে।
'এক রাজ্যের গরীব জেলের দুই মেয়ে। মণি-মুক্তা।মণি বড় আর মুক্তা ছোট। দুজনই অপরুপ সুন্দরী। মানুষ ওদের দেখে ভীষণ অবাক হয়। হিংসা হয় মানুষের।জেলের মেয়ে থাকবে কালো কুচকুচে।নাক মুখ প্যাঁচা গোছা।আর মণি- মুক্তা হয়ে আছে রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী!

একদিন মণি স্নান করতে যায় নদীর ঘাটে।আর তখনই রাজ্যের রাজা মশাই নদী ভ্রমণ করছিলেন।রাজার চোখ আচমকা আটকে যায় মণির সুন্দর রুপের উপর। রাজা সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের সারেংকে বলেন ঘাটের কাছে জাহাজ নোঙর করতে। 

সারেং রাজার কথামতো ঘাটের কাছে জাহাজ নোঙর করে।চারদিক হতে মানুষ তখন দৌড়ে আসে রাজাকে দেখতে।তারা অবাক হয় রাজা মশাই হঠাৎ এই জেলে পাড়ায় জাহাজ নোঙর করলেন কেন? মণি ঘাটেই দাঁড়িয়ে ছিল এতোক্ষণ। এবার তার ভয় করে। বুক কাঁপে।রাজা মশাইয়ের চোখে কী তার কোন ভুল ধরা পড়লো! রাজাদের সামনে গরীব প্রজাদের কী স্নান করতে নিষেধ আছে?মণি জানে না! মানুষ অবাক হয়।রাজা মশাই হেঁটে হেঁটে মণির দিকেই এগিয়ে আসছেন।আর মণি ভয়ে কাঁপছে। তাহলে তার ধারণাই ঠিক হলো। রাজা মশাই তাকে আজ মহা শাস্তি দিয়ে যাবেন। রাজা মশাই কাছাকাছি এসে গেছেন। এবার রাজা মশাই এক পা এগুচ্ছেন আর মণি এক পা পিচুচ্ছে।রাজা মশাই কিছু বলছেন না। চুপচাপ এগুচ্ছেন। মণি ভয়ে ভয়ে পিচুচ্ছে।

পিচুতে পিচুতে মণি এসে গেল তার বাবার কুঁড়ে ঘরের কাছে।তার গরীব জেলে বাবা ছিলেন তখন দরজার সামনে দাঁড়ানো।সে বাবাকে একবার দেখেই বাবার বুকে গিয়ে মুখ লুকালো। রাজা মশাইকে তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে গরীব জেলের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো।সে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,'মহারাজ, কোন ভুল করেছো গো আমার মেয়ে?' রাজা মশাই হাসলেন। হেসে বললেন,'উঁহু। ভুল আমি করেছি। ওকে আমার আরো আগে দেখার প্রয়োজন ছিল। আচ্ছা সে যায় হোক।আমি নিজেই নিজের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। তোমার মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে। পুরোহিত ডাকো।

আমি আজই তোমার মেয়েকে বিয়ে করবো। বিয়ের পর এক সপ্তাহ এখানে থাকবো। তারপর বউ নিয়ে একেবারে রাজপ্রাসাদে চলে যাবো। হ্যা এখানে একটা কথা আছে। তোমার যদি এই প্রস্তাবে মত থাকে তবেই বিয়ে হবে। অন্যতাই আমি ফিরে যাবো। রাজা চন্দ্রকিরণ কখনো জোর খাটিয়ে কিছু করা পছন্দ করে না!' মণির বাবা আনন্দে কেঁদে ফেললেন।আর বললেন,'এ তো আমার পরম সৌভাগ্য মহারাজ!এতো আমার পরম সৌভাগ্য! গরীব জেলের মা হীন এক মেয়ে হবে রাজ্যের রাণী। এ তো আমার মহা সৌভাগ্য!' রাজা মশাই বললেন, তাহলে এক্ষুনি পুরোহিত ডাকো।

গল্প মায়াবতী - ৪র্থ পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প, মায়াবতী গল্প, মায়াবতী ৮ম ৯ম ১০ম ১১তমো গল্প, মুগ্ধতা নিয়ে গল্প, সংসার নিয়ে গল্প, মায়া নিয়ে মায়াবতী গল্পের কথা, স্নিগ্ধতা নিয়ে গল্প, জীবন নিয়ে গল্প ১ম, মায়াবতী নিয়ে গল্পকার ৩য় পর্ব, মায়া নিয়ে স্ট্যাটাস বাংলা, মায়াবতী কষ্টকর, কেনো এতো মায়াবতী, কষ্টের সংসার, লেখা পিকচার কষ্টের, কষ্টের পিকচার মেসেজ, দুঃখ কষ্টের ছবি, শুধু কষ্টের পিকচার, কষ্টের পিকচার ডাউনলোড, কষ্টের কিছু ছবি, কষ্টের পিকচার HD, ভালবাসার কষ্টের পিকচার, কষ্টের পিক ছেলে, ছেলেদের কষ্টের পিক, কষ্টের পিকচার চাই, কষ্টের পিক মেয়ে
দুঃখের স্ট্যাটাস লেখা পিক ছবি বাংলা

পুরোহিত ডাকা হলো সঙ্গে সঙ্গে।জেলে পাড়ায় মহা ধুমধামের সহিত রাজার সাথে জেলের মেয়ে মণির বিয়ে হয়ে গেল। রাজা মশাই গোনে গোনে সাতদিন  জেলের বাড়িতে খাটালেন।আর এই সময় মুক্তার সাথে রাজা মশাইয়ের গভীর প্রেম জমে গেলো। সাতদিন যেদিন শেষ হয়ে যাবে সেদিন শেষ রাতে মণিকে ঘুমে রেখে তার ছোট বোন মুক্তাকে নিয়ে রাজা মশাই প্রাসাদের দিকে নৌ যাত্রা করলেন। বেচারি মণি ঘুম থেকে উঠে সবকিছু শুনে মূর্ছা গেল!'

এতোক্ষণ নিতুর বলা গল্পটা উন্মুখ হয়ে শুনেছি আমি।শুনতে শুনতে মনে হয়েছে এটা আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। তাই এর পরের কাহিনীটাও শুনতে খুব ইচ্ছে হলো আমার।আমি বললাম, 'নিতু, এরপর কী হলো?'
নিতু বললো, 'সকাল হলো।'
'তারপর?'

নিতু এবার জানলা খুলে দিলো। বাইরে ভোরের আলো ফুটেছে। তেজহীন মিষ্টি রোদ এসে হাত পা ছড়িয়ে বসেছে জানলার শিকে। নিতু এবার বললো, 'মণি আরো পনেরো দিন পর জানতে পারলো সে গর্ভবতী। তার পেটে রাজার সন্তান। মণির মনে আশা জন্মালো। এই সন্তান ঠিক তার আর তার মায়ের অধিকার আদায় করবে একদিন রাজার কাছ থেকে। কিন্তু মণির সে আশা আর পূরণ হলো না। সন্তান প্রসবের সময় মা আর সন্তান দুজনই মারা গেলো!'

আমার কান্না আসছে। এই ভোর সকালেই গলা ছেড়ে কাঁদছি আমি। না আমি আমার জীবনে ঘটে দুঃখের জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি অভাগী মণির জন্য। আচ্ছা এটা তো একটা গল্প। গল্প তো সত্য হয় না। তবুও আমি কাঁদছি কেন? এর উত্তর আমার ঠিক জানা নেই। কিন্তু এটা আমি জানি যে কিছু কিছু গল্প জীবন চিনিয়ে দেয়। কিছু কিছু গল্প সত্যের চেয়েও তীর্যক হয়। কিছু কিছু গল্প শব্দ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের হয়ে যায়!

* মায়াবতী ১০ম পর্ব
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে লাগলো আর আমার শরীর খারাপ হতে লাগলো ধীরে ধীরে। পেটে একটা চিনচিনে ব্যথা। এই ব্যথা কিছুতেই তীব্র হচ্ছে না।টানা পানি ভাঙচে।মনে হচ্ছে পানি শূন্যতায় আমি মারা যাবো। আমার ভয় হচ্ছে। ভীষণ ভয়! বাড়িতে একটাও পুরুষ মানুষ নাই। বিপদের সময় মনে পড়ে একজন পুরুষ মানুষের হাত একটা নারীর জন্য কতটা শক্তির! নিতুও বাসায় নেই। স্কুলে গিয়েছিল। ওখান থেকে ফিরেনি এখনও। বিকেল বেলা প্রাইভেট আছে।

মা কাছে এসে সামান্যতমও সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন না।অথচ আজ তার সাহায্যের খুব প্রয়োজন! নিতু স্কুলে যাওয়ার পর পরই আমি টের পাই আমার পেটে ব্যথা হচ্ছে। এর খানিক পরই পানি ভাঙতে থাকে। ভয়ে মাকে ডাকি।বলি সবকিছু খুলে।মা আমার কথা যেন শুনেও না শোনার ভান করে থাকেন! আমি বলি, 'মা আমি কী করবো বলুন? ভয় করছে খুব!' তিনি মুখ ভার করে বলেন, 'আমার কী আর সামর্থ্য আছে কিছু করবার!আল্লাহরে ডাকো!' তারপর তিনি চলে যান বেরিয়ে। আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে।পানি ভাঙা থামে না।ব্যথাও বারে না। মাকে আবার ডাকি। মা শুনেও শুনেন না।

আমার কান্না আসে।তীব্রতম কান্না। কেঁদে কেঁদে আমি ভাবতে থাকি,মা বোধহয় আমার মৃত্যুই চান! তিনি চান প্রসব ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে আমি মরে যাই। কিন্তু এমনটা চাইবেন কেন তিনি?আমি কী ক্ষতি করেছি তার?দোষ করলে তার ছেলে করেছে, আমার ছোট বোন করেছে, এখানে তো আমার কোন হাত নেই! তবুও কেন তিনি আমার সাথে এমন করছেন?

একজন ধাত্রী ডাকা প্রয়োজন। কিন্তু কে ডাকবে?আমি আর নড়তে পারছি না। শরীর কোন কাজ করছে না। বিছানায় ক্লান্ত শ্রান্ত আর বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছি।যেন আমি বড় কোন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি মাত্র! আমার সারা শরীর ক্ষত বিক্ষত।আমি রাজ্যের সব মানুষের শত্রু।আমায় চিকিৎসা দেয়ার মতো একটি ভালো মানুষও নেই আর!

মিতুলের কথা মনে পড়ে। প্রথম প্রথম কী যে ভালো ছিল মিতুল! রোজ দিন অফিস করে ফেরার সময় একটা করে গোলাপ নিয়ে আসতো সাথে। সেই গোলাপ লুকিয়ে চুরিয়ে রাখতো পেছনে। তারপর আমায় ডাকতো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।আমি কাছে যেতেই একটানে বুকের সাথে মিশিয়ে নিতো আমায়। তারপর আমার কানের উপর দিয়ে চুলের ভেতর গুঁজে দিতো টকটকে লাল গোলাপ। কোন কোন দিন গোলাপ না এনে কাঁচের চুড়ি নিয়ে আসতো। একদিন অদ্ভুত এক কান্ড করলো। নিয়ে এলো একজোড়া নুপূর কিনে। এবার আমায় ডেকে কাছে নিয়ে যেই না পায়ে পড়িয়ে দিবে তখন দেখে পকেটে একটা মাত্র নুপূর আছে।অন্যটা কোথায় পড়ে গেছে। সেদিন তার এমন মন খারাপ হলো!

আগে আগে আমার সামান্য ঠান্ডা লাগলেই গলায় মাফলার বেঁধে দিতো সে।নিজেই পানি গরম করে খেতে দিতো।ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতো জলদি। সেই মিতুল এখন কোথায় আছে?আমায় ভুলে থাকছে কী করে? পৃথুর জন্য খারাপ লাগে। ভীষণ খারাপ লাগে। মেয়েটা বোনের আদরটুকু বুঝলো না! একটুও বুঝলো না! কান্না আসছে। প্রচন্ডরকম কান্না। সাথে পেটের ব্যথাটাও বাড়ছে।মনে হচ্ছে এই ব্যথায় আমি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবো! মনে হচ্ছে আজ এক্ষুনি এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।মনে হচ্ছে একটু পর সত্যি সত্যি কেয়ামত হয়ে যাবে!

'মা,মা,মাগো,ওমা--'
মা আসছেন না এগিয়ে।
নিতু এলো।সে ফিরেছে মাত্র। আমার কান্নারত গলা শুনে ব্যাগটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে দৌড়ে এলো আমার কাছে। তারপর ভীত সন্ত্রস্ত গলায় বললো,'ভাবী,ও ভাবী কী হয়েছে তোমার?' আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,'মরে যাবো রে নিতু,আমি আজ মরে যাবো! ' নিতু দেখলো রক্তে ভিজে আছে বিছানার চাদর।সে বুঝতে পারলো আমার রক্ত ভাঙছে।নিতু চিৎকার করে ডাকলো, 'মা, ও মা, তুমি কী মরে টরে গেছো নাকি? কিছু দেখতে শুনতে পাচ্ছো না!'

মা কোন সাড়া দিলেন না।
নিতু এবার রাগে দ্রুত পায়ে মার ঘরে গেলো। তারপর মাকে উচ্চ স্বরে বললো,'কী ব্যাপার বল তো? তুমি কী ভাবীর সত্যি সত্যি মৃত্যু কামনা করো? মৃত্যু কামনা করলে কেন করো?' মা বললেন, 'আমার শরীর খারাপ। এমনিতেই হার্টের সমস্যা বেড়েছে। ওর কাছে গেলে এক্সিডেন্ট হওয়ার ভয় আছে!' 'বাহ্ মা বাহ্! তুমি তো দেখছি ডাইনিদের মতো করে কথা বলা শিখে গেছো!' মা রাগে গজগজ করতে করতে নিতু কে বললেন,'এক চড়ে তোর সব দাঁত ফেলে দিবো হারামজাদি!ডাইনিদের সাথে আমায় তুলনা দিচ্ছিস!'

নিতু হু হু করে কেঁদে ফেললো মার সামনে। কাঁদতে কাঁদতে সে বললো,'ও মা, তোমার কী হয়েছে বল তো? আগে তো তুমি এমন ছিলে না? ভাবীকে তো খুব আদর করতে। ভালো বাসতে।তার সামান্য কিছু হলেই সারাক্ষণ জপতে। নামাজ পড়ে দোয়া করতে। ভাবীর বাচ্চা হবে শুনে আগে ভাগেই তোমার সোনার চেইন দিয়ে দিয়েছিলে তাকে। কিন্তু এখন এমন করছো কেন?তার এই দুর্দিনে যখন তোমার তার পাশে থাকার কথা।তার হাত ধরার কথা। আর তুমি কি না এখন তাকে দেখতেই পারছো না! নামটুকু পর্যন্ত শুনতে পারছো না তার!' নিতু কাঁদছে। খুব করে কাঁদছে। মা চুপ করে আছেন। একেবারেই চুপ করে আছেন।

সন্ধ্যা গলে রাত্রি নামলো। নিতুর কথায় মার মন কোমল হলো। মা দৌড়ে গেলেন ধাত্রী বাড়ি।ধাত্রী নিয়ে আসতে আসতে আমার অবস্থা আরো খারাপ হলো। টানা রক্ত ভাঙছে। ধাত্রী এসে দেখে বললো, 'অবস্থা ভালোর না। কিন্তু আমার কাছে এইসব ব্যাপার না। সোলেমা ধাই আরো বড় বড় কাম করছে অতীতে!' মা বললেন, 'আপনার উপর আমার বিশ্বাস আছে বোন।'

কিন্তু নিতু বিশ্বাস করতে পারলো না পুরোপুরি।সে বললো, 'মা, তুমি একবার ভাবীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখো! ভাবীর মুখ কেমন নীল নীল হয়ে গেছে। এইসব ধাত্রী ফাতরি রেখে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করা যাবে না!' সোলেমা ধাত্রী নিতুকে এক ধমক দিয়ে বললো, 'নাবালেগ মাইয়া তুই কী বুঝস এই বিষয়ে! যা সড়, এইখান থিকা দূরে যা!' মাও বললেন, 'যা মা দূরে যা একটু। কিছু হবে না। আল্লাহর রহমতে সব ঠিক হয়ে যাবে।'

কিন্তু নিতু শুনলো না।সে সোলেমা ধাত্রীকে বললো,'আপনি চুপ করুন আর এখান থেকে চলে যান বলছি। আপনার কিছু করতে হবে না।আমরা ভাবীকে নিয়ে হসপিটালে যাবো!' আমি কথা বলতে পারছি না। শুধু জলজ চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছি ওদের দিকে।মা তখন নিতু কে টেনে নিয়ে গেলেন বাইরে।নিতু চিৎকার করছে। চিৎকার করে বলছে,'ভালো হবে না বলছি। ভাবী কিংবা বাবুর কিছু হলে ভালো হবে না কিন্তু!'

সোলেমা ধাত্রী ভেতর থেকে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর নিজের মতো করে সে চেষ্টা তদবির করতে লাগলো। কিন্তু এসবে কোন কাজই হচ্ছে না। পেটের ব্যথায় নারীভূড়ি ছিঁড়ে যেতে চাইছে।অনবরত রক্ত ভাঙছে। হঠাৎ সোলেমা ধাত্রী মাকে ডাকলো। তখন শেষ রাত।মা কাছে এলে সে বললো,'বুজি, আমারে মাফ দেন! অবস্থা ভালো না।এম্বুলেন্স ডাকেন!' নিতু কথাটা শুনে দৌড়ে এলো। তারপর সোলেমা ধাত্রীর চুল টেনে ধরে বললো, 'হারামজাদি, আমি আগেই বলেছিলাম তুই পারবি না! কিন্তু শুনিস নি। এখন তোকে আমি ছাড়বো না।মেরে ফেলবো তোকে!' মা তখন নিতুকে টেনে ধরলেন। তারপর বললেন,'সব ভাগ্য মা।ধাইকে দোষলে কী হবে?আমিও তো আগে সাড়া দেইনি। ঘরেও তেমন টাকা পয়সা নাই। কীভাবে কী যে হবে এই ভয়ে আগে হসপিটালের নাম নেইনি! নিতু তখন চেৎ করে উঠলো।সে আগুন চোখ করে মার দিকে তাকিয়ে।

* মায়াবতী ১১তমো পর্ব
নিতু আগুন চোখ করে মার দিকে তাকিয়ে বললো, 'মা তুমি পারতে আমার যদি এমন হতো তবে নিজের টাকা বাঁচানোর জন্য এমন কিছু করতে?বলো,পারতে তুমি? মা চুপ করে আছেন।কথা বলতে চাইলেও বলতে পারছেন না। কারণ তিনি তার সন্তানের কথার কাছে এখন একেবারেই ধরাশায়ী।নিতুর প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর জানা নাই তার! নিতু বললো,'চুপ করে থেকো না মা!ওই দেখো ভাবীর শরীরটা কেমন হয়ে গেছে!দেখো তার চোখের নীচে জলের দাগ। সুন্দর লাল টুকটুকে মুখটা নীল হয়ে গেছে।মা, তোমার কী একটুও মায়া হয় না?'

মা আবেগতাড়িত হলেন। তার গলা ভিজলো। সেই ভেজা গলায় তিনি বললেন, 'এই অতরাতে আমরা দুজন মেয়ে মানুষ ওকে নিয়ে কোথায় যাবো? কীভাবে যাবো? এখন তো সব নির্জন।কে আনবে একটা গাড়ি ডেকে?আর ডাকলেই কী কোন গাড়ি পাওয়া যাবে অতরাতে!'
নিতু বললো, 'মা, তুমি সবকিছু ঠিকঠাক করো।আমি যাচ্ছি।'
'তুই কোথায় যাবি!'
'গাড়ি নিয়ে আসবো।'
'তুই কীভাবে গাড়ি নিয়ে আসবি? কোথায় পাবি গাড়ি? তাছাড়া তুই একটা মেয়ে মানুষ! ছোট মানুষ! তুই পারবি না রে মা!'
নিতু মার কথা শুনলো না। সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল  বাইরে। মা ডাকলেন। কাজ হলো না। সে বাইরে থেকে চিৎকার করে বললো,'মা আমি গাড়ি নিয়ে ফিরবো তুমি সবকিছু রেডি করো।'

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আমার। মা এলেন কাছে। তারপর আমার একটা হাত মুঠো করে ধরে বললেন,'কষ্ট হচ্ছে না?' আমি চুপ করে শুধু মার দিকে তাকালাম। চোখে জল নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকানো ছাড়া আমার আর কোন উপায় নাই!কথা বলার একটুও শক্তি নাই।মনে হচ্ছে আমার হাতে সময় খুব কম। বাঁচবো না আমি।ঠিক এই মুহূর্তে আরেকটা কথা মনে হলো আমার।পৃথুর বলা সেই কথাটি। আমার বাবা তার মায়ের খুনি।যা আমি জানি না।পৃথু জানে। শুধুমাত্র এই কথাটি জানার জন্য হলেও আমার বেঁচে থাকা প্রয়োজন।আমি জেনে যেতে চাই এই রহস্যটা আসলে কী!

মা বললেন, 'কথা বলতে পারতেছো না না?পানি দিবো। এক গ্লাস পানি?' আমি চুপ করে শুধু মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা উঠে গেলেন। গ্লাস ভরে পানি নিয়ে এলেন। আমার মুখে এনে সেই গ্লাস ধরলেন।আমি পানি খেতে পারলাম না। ঠোঁট দুটো ফাঁক করতে পারছি না। অতটুকু শক্তি পর্যন্ত অবশিষ্ট নাই আমার শরীরে!

নিতু ফিরছে না।মা ঘরে আর বারান্দায় দৌড়াচ্ছেন একটানা। তাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। তিনি ভাবছেন নিজের মেয়েটার কথা। একবার বললেনও,'কতো করে না করলাম তবুও সে গেলোই! এখন যদি কোন বিপদ হয়!' নিজের মেয়ে বলে কথা! সবাই নিজের সন্তানকে নিয়ে খুব ভাবে।ভালোবাসে। আহা! আমার তো মা নেই। আজ যদি মা থাকতো! চোখ ফেটে ছলছল করে জল নামছে। সেই জল গরম না ঠান্ডা তা অনুভব করতে পারছি না। আচ্ছা আমার কী অনুভব ক্ষমতাও হারিয়ে গেছে?

শুনেছি মৃত্যুর আগে এমন অনেক কিছুই হয়। মৃত মার মুখ মনে পড়ে। বাবার মুখ মনে পড়ে। আমারও পড়ছে। খুব মনে পড়ছে। মা বিঁষ খেয়ে মারা গিয়েছিলেন। তখন পৃথু তিনদিনের মানুষ। কেন তিনি বিষ খেয়েছিলেন তা জানি না।বাবা বলেননি। কিছুতেই বলেননি ‌। আমাদের ঘরে এক কাজের মহিলা ছিল। সেই মহিলা পৃথুকে পাঁচ বছর লালন পালন করে। সেই মহিলা আমাকে অতটা আদর সোহাগ করতো না। কেন জানি দেখতেই পারতো না। তবে পৃথুকে বেশ আদর করতো। সেই মহিলার নাম ছিল রেজিয়া। রেজিয়া বুয়া একদিন আমায় বলেছিল, 'তোমার মা কেন বিষ খাইছে জানো তুমি?'
আমি বললাম, 'না। আপনি জানেন?'
সে বললো,'জানি।'

আমি বললাম, 'প্লিজ বলুন কেন বিষ খেয়েছিলো মা!' সেদিন বাবা এসে দেখে ফেললেন রেজিয়া বুয়ার সাথে আমি কথা বলছি। বাবা সঙ্গে সঙ্গে রেজিয়া বুয়াকে বললেন, 'তুই আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যা।' রেজিয়া বুয়া বললো, 'কই যাবো?' জাহান্নামে।' রেজিয়া বুয়া চলে গেল বাড়ি থেকে বের হয়ে। তারপর আর কোনদিন তার ছায়াও দেখিনি। মায়ের বিষ পানের কারণ, বাবার রেগে গিয়ে রেজিয়া বুয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার কারণ আর পৃথুর মায়ের খুনি কেন বাবা এই তিনটি বিষয় আমার জানা খুব প্রয়োজন। কিন্তু জানতে পারবো কী?

মাথার উপর টিউবলাইট।দপদপ করছে কুপি বাতির মতো। টিউবলাইট কখনো এমন করে? জানি না! মায়ের একটা হাত আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। তবে সেই হাতে মমতার আঁচ নাই কোন! তিনি কী আমার প্রতি খুব ক্রোদ্ধ? নিতু ফিরছে না। ফিরবে বলে মনে হচ্ছে না। অত দেরি হচ্ছে কেন তাহলে!নাকি বিপদে পড়েছে! ওকে কে উদ্ধার করবে বিপদ থেকে! এই এলাকাটা খারাপ। কদিন আগে এক মধ্য বয়স্ক মহিলা রেপড হয়েছে।রেপড করেছে বারো তেরো বছর বয়সী এক পাল ছেলে পেলে।অথচ মহিলার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।বড় অদ্ভুত এই পৃথিবী! নিতুর যদি এমন কিছু হয়! আমার ভয় হচ্ছে। আমার নিজের চেয়েও বেশি ভয় হচ্ছে নিতুর জন্য!

মা ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছেন এবার।আমায় কিছুই বলে যাননি। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি নিতুর খুঁজেই তিনি গিয়েছেন। দেয়ালে ঝুলে আছে দেয়াল ঘড়িটা।একটা কাঁটা লাল। একটা হলুদ।আরেকটা সবুজ। কোন কাঁটাই নড়ছে না। এই ঘড়িটা ঠিক আমার মতো। আমিও যেমন নড়তে পারছি না সেও পারছে না। কী অদ্ভুত কান্ড!

ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে।সব অন্ধকার। পেটের ব্যাথা ইচ্ছে মতো বেড়েছে।আর থাকা যাচ্ছে না। এবার পেটটা ছিঁড়ে যাবে ঠিক।সত্যি সত্যি ছিঁড়ে যাবে। আচ্ছা এমন কী কখনও কারোর হয়েছে? সন্তান প্রসব হতে গিয়ে পেট ছিঁড়ে গেছে?জানি না!

রাত বোধহয় শেষ হয়ে এলো।পাখি ডাকছে। দুটো পাখি। দুটো ভিন্ন জাতের পাখি। কেমন অদ্ভুত গলা দুটোরই। আচ্ছা এখন যদি মিতুল ফিরে আসে।পৃথু ফিরে আসে। আমার মৃত মা ফিরে আসে। বাবা ফিরে আসে! মৃত্যুর আগে মানুষ অদ্ভুত কিছু ভাবে। কেন এমন ভাবে?আমি জানি না!

মা ফিরছে না।আমি নিশ্চিত তিনি নিতু কে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেন না। এখন তিনি বড় রাস্তার পাশে বসে কাঁদছেন। অন্ধকারের ভেতর তার কান্না কে শুনবে?

এবারের ব্যাথাটা পাজড় ভাঙার। তারপর শরীর ঘামলো। সমস্ত শরীর। তারপর। হ্যা ঠিক তারপর নবজাতকের কান্না। মেয়েটা ভূমিষ্ঠ হয়েছে।নাকি ছেলে?ওরা তো মেয়ের কথাই বলেছিল! সমস্ত ঘর অন্ধকার। সন্তানের কান্না নাকি মার সহ্য হয় না। সন্তানের বিপদে মা মৃত্যুসয্যা থেকেও ফিরে আসেন। আমিও এলাম।জিহ্বায় কামড় দিয়ে বিছানায় হাতড়িয়ে মোবাইল খুঁজে বের করলাম। তারপর লাইট জ্বালতেই দেখি আমার পায়ের নিচে পড়ে আছে শিশু। আমার সন্তান।কত কষ্টে যে এবার নিজেকে নিয়ে গেলাম সন্তানের কাছে। তারপর কোলে তুলে নিলাম। মেয়ে হয়েছে। 

নাক মুখ ঠিক আমার মায়ের। মোবাইলের আলোতে অত কিছু বোঝা যায় না স্পষ্ট। কিন্তু আমি ঠিক ধরতে পারছি মেয়েটা আমার মায়ের মতো। আমার মায়ের নাম ছিল মায়া। নানাভাই মাকে ছোট বেলা থেকেই মায়া বলে ডাকতেন। এরপর থেকে মার নামই হয়ে গেল মায়া। মায়ার নাতনীর নাম হবে মায়াবতী। আমি ডাকলাম মায়াবতীকে। মায়াবতী চোখ পিটপিট করে তাকালো। বড় আশ্চর্য বিষয়! এই মাত্র জন্ম নেওয়া শিশু আমার ডাকের সাড়া দিলো কীভাবে? অন্যসব শিশু কাঁদে। কিন্তু মায়াবতী কাঁদছে না। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে হাসছে। আমি বললাম, 'এই মায়াবতী অত হাসছিস কেন রে?হাসির কী হলো?' মায়াবতী আবার চোখ পিটপিট করে তাকালো আমার দিকে। তারপর হাত পা গুলো টান টান করলো। যেন তার খুব রাগ পেয়েছে মার এই কথা শুনে!

আমি এবার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম,'রাগ পেয়েছে মা তোমার?থাক আর এসব বলবো না। মা তুমি এখন হাসো।' মায়াবতী আর হাসলো না। একেবারে নিরব হয়ে গেল।জন্মের কয়েক মিনিট পরই আমার একমাত্র কন্যা সন্তান মায়াবতী মৃত্যু বরণ করলো।

আমি কাঁদছি না। কাঁদবো কেন? একটু পর তো আমিও মৃত্যু বরণ করবো। মা মেয়ে তখন একসাথে থাকবো। তার আগে একটু জেনে নেই নিতুর কথা। নিতু আমার সবচেয়ে আপন মানুষ ছিল একটু আগেও। এই নিতুর যদি আমার জন্য কিছু হয়ে যায় তবে যে আমি মরেও শান্তি পাবো না!

চলবে

লেখক: অনন্য শফিক

সবার আগে গল্প পেতে আমাদের অ্যাপটি ডাউনলোড করে রাখতে পারেন! ধন্যবাদ

আমাদের অ্যাপ ফ্রি ডাউনলোড

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post