গল্প মায়াবতী - ৬ষ্ঠ শেষ পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প
গল্প মায়াবতী - ৬ষ্ঠ শেষ পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প

মা ফিরে এসেছেন। মিতুলকে দেখে তিনি তার সাথেও কোন কথা বললেন না। মিতুল কথা বলতে চাইলো। মার হাত ধরতে চাইলো। কিন্তু মা সেই সুযোগ দিলেন না। তিনি এসে জানালেন মহসিনের অবস্থা ভালো না। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সে। তার বাবা মা এসেছে। বন্ধু বান্ধব এসেছে। সবার চোখে মুখে শঙ্কা। কিন্তু মহসিন কারোর কাছে বলেনি কার উপকার করতে গিয়ে সে এতো বড়ো বিপদে পড়েছে। সে এই কারণে বলেনি যে তার বাবা মা কিংবা কাছের বন্ধুরা যদি পরে আমাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেয়! যদি আমাদের দায়ী করে তার এই নির্মম পরিণতির জন্য!

মা বললেন, 'নিজের পেটে যে সন্তান ধারণ করলাম তার কিন্তু নিজের বোনের সম্মান হানির জন্য কষ্ট লাগলো না। নিজের সন্তানের মৃত্যুর জন্য কষ্ট লাগলো না। কিন্তু যে ছেলে আমাদের চিনতো না। আমাদের সাথে তার কোন সম্পর্ক নাই,অথচ আমাদের মঙ্গল করতে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে সে কুন্ঠাবোধ করলো না পর্যন্ত!' মিতুলের চোখে এবার রাগ দেখা গেল। সে চোখের জল মুছে ফেললো। তারপর বললো, 'রোহানকে আমি ছাড়বো না। জন্মের শিক্ষা দিয়ে আসবো ওরে আমি!' বলেই সে ঝট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমরা কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করলাম না! 

মিতুল চলে যাওয়ার পর আমি কাউকে কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম পৃথুর সাথে দেখা করতে পৃথুর ঠিক করা একটা স্থানে। মাকে কিছু বলে আসিনি। মাও কিছু জিজ্ঞেস করেননি আমায়। এ বাড়ির সবকিছু কেমন উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মা অবশ্য আমার কাছেই ছিলেন । কিন্তু আমি তাকে কিছু না বলেই চুপচাপ চলে এলাম পৃথুর সাথে দেখা করতে।মনে অবশ্য সামান্য ভয় ছিল।না জানি পৃথু কোন প্রতারনা করে কি না আমার সাথে। কিন্তু না ও এমন কিছু করলো না।আমি যাওয়ার পরই সে আমায় জাপটে ধরলো আর কাঁদতে লাগলো। আমি বললাম, 'কাঁদিস না। এখন শান্ত হয়ে বল আমায় কী বলতে ডেকেছিস।'

পৃথু কান্নাভেজা গলায় বললো,'বুবু, আমাদের ঘরের যে বুয়া ছিল।ওই যে রেজিয়া বুয়া।সে হলো রোহানের মা।আমি জানতাম না।ওই মহিলা তো আমাকে ছোট বেলা থেকেই আদর সোহাগ করতো। তখন থেকেই সে আমার কাছে একটা কথা বলবে বলবে বলে আর বলতে পারছিলো না। শুধু বলছিলো, এই কথা তুমি মেনে নিতে পারবে না। তারপর হঠাৎ একদিন বাসা ছেড়ে চলে গেলো সে। আর কোন দেখা নেই তার। এরপর তোমার বিয়ে হলো। বিয়ের পর হঠাৎ একদিন তার সাথে আমার দেখা হয়ে গেল।আর তখনই সে বললো 'আমার মা আর তোমার মা এক না। তোমার মা ছিলেন বাবার স্বীকৃত স্ত্রী। কিন্তু আমার মা স্বীকৃত কোন স্ত্রী ছিলেন না। তিনি আমাদের বাসায়ই বুয়ার কাজ করতেন। তখন তার সাথে বাবার অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে।আর এরপর আমার জন্ম হয়। আর মানুষ যেন এসব না জানে এই জন্য আমার মাকে খুন করে ফেলেন বাবা।তার লাশও গুম করে ফেলেন। তারপর তোমার মাকে বলেন আমায় লালন পালন করতে। কিন্তু তোমার মা তা মেনে নিতে পারেননি।বিঁষ খেয়ে মারা যান তিনি।'

আমি অবাক হয়ে বললাম,'কী বলছিস এসব? আমাদের ঘরে আবার আরেকজন বুয়া কবে ছিল?জন্মের পর থেকে তো এই একজনকেই দেখে এসেছি!আর মা মারা গিয়েছিলেন বিষ খেয়ে ঠিক। কিন্তু তার তো কোন দুঃখ ছিল না যার কারণে তিনি সোইসাইড করবেন।বাবা সব সময় বলতেন মায়ের মৃত্যুটা রহস্য। কেউ ঠিক মাকে পানি কিংবা শরবতের সাথে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে।' পৃথু বললো, 'হ্যা বাবার ধারণাই ঠিক ছিল। আমাদের শত্রু এই একজনই ছিল।রোহানের মা।যে আমায় মিথ্যে বলেছিলো।সব বানিয়ে বানিয়ে বলে আমায় তোমার প্রতিপক্ষ বানিয়েছিলো। আর আমি কোন কিছু না বুঝেই তোমার সাথে শত্রুতা শুরু করি বুবু! বুবু, আমি সব জেনে গেছি। এই মহিলাই বিষ খাইয়ে মাকে মেরেছে। সে ভেবেছিল মায়ের মৃত্যুর পর সে মার স্থান দখল করবে!'

পৃথু আবার কেঁদে উঠে। তারপর আবার বলতে শুরু করে।সে বলে,'আমি সবকিছু জেনে গেছি বুবু। এই মহিলা বাবাকে পছন্দ করতো। পছন্দ করতো বলতে বাবাকে নিজের বশে এনে সব সম্পত্তি হাত করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকে শুরু হয় তার অন্য রকম ষড়যন্ত্র। রোহানের এক দূরসম্পর্কের চাচাকে দিয়ে তিনি তোমার আর মিতুলের বিয়ের ঘটকালি করান। আর বিয়ের পর আমার সাথে দেখা হলেই তো তিনি সবকিছু খুলে বলেন। আর আমি তোমার সাথে শত্রুতা শুরু করি। পৃথুর মুখ থেকে কথাগুলো শুনে আমার শরীর কাঁপতে থাকে। আমার স্পষ্ট মনে হয় রেজিয়া বুয়ার কথা। এই বুয়ার চরিত্র ভালো ছিল না। ভালো ছিল না বলেই আমার সাথে একদিন তাকে কথা বলতে দেখেই বাবা তাকে বের করে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে আর আমায় তিনি ধমকে ছিলেন।আমায় কাবু করার সুযোগ না পেয়ে পৃথুকে ঠিক কাবু করে ফেলেছে সে।ও তো ছোট মানুষ।অত কিছু বুঝেনি।

পৃথু আবার বলতে শুরু করলো।সে বললো,'আমি সবকিছু না বুঝেই করেছি। কিন্তু বুঝে শুনে যে ভুলটা আমি করেছি তা হলো রোহানের সাথে সম্পর্ক।ওর সাথে প্রেমের সম্পর্ক করেছিলাম ওর মাধ্যমে তোমাদের সকলকে শিক্ষা দিতে। কিন্তু আজ উল্টো আমি নিজেই ফেঁসে গেছি বুবু। কীভাবে যে আমি ওদের প্রতারণার জালে আটকে গেছি তা নিজেও বুঝতে পারিনি। রোহান আমায় মেরে ফেলবে। এর আগেও অনেক মেয়ের সাথে সে এসব করে মেয়েদের খুন করে লাশ গুম করে ফেলেছে।আমি সব জেনে ফেলেছি। আমার ভাগ্য ভালো আমি পালাতে পেরেছি।'

আমি আর কোন কথা বলতে পারছি না।পৃথুর দোষ গুণ বিচার করার শক্তি নাই আমার। চোখে কেমন আঁধার দেখছি। আমি শুধু ওকে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, 'কোথায় যাবি এখন তুই?' পৃথু বললো, 'অন্ধকারে।' আমি বললাম,'আয় আমার সাথে আয়। আমি সব বুঝবো।' পৃথু বললো, 'এই অপরাধ নিয়ে আলোর কাছে গেলে সে আমায় সহ্য করবে না। পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে। এরচেয়ে অন্ধকারই ভালো ‌। আমার মতো পাপীর জন্য ওই অন্ধকারই উপযুক্ত।' এই কথা বলেই সে কাঁদতে কাঁদতে পেছনের একটা গলি ধরে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল। আমি ওর চলে যাওয়া পথের দিকে কান্না সজল চোখে তাকিয়ে রইলাম।

টলতে টলতে বাসায় ফিরলাম আমি। সবকিছু তো এমনিতেই এলোমেলো হয়ে গেছে আমার।আর বাসায় ফিরেই চমকে উঠলাম আমি। গা শিরশির করে উঠলো ভয়ে। কেউ নাই বাসায়। বাসার দরজা জানালা সব খোলা।বুকটা আমার কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। পা থেকে যেন সব মাটি সড়ে গেল দূরে।মনে হলো আমার চোখের সামনের সবটুকু পৃথিবী থরথর করে কাঁপছে এখন!ওরা কোথায় গেল? তবে কী...

* খবরটা পেলাম বাড়ি পৌঁছার খানিক পর।নিতু মার মোবাইল ফোন দিয়ে আমায় ফোন করেছে। ফোন করে নিতু কেঁদে কেঁদে বলছে, 'ভাবী, তুমি জলদি সদর হসপিটালে আসো। ভাবলাম মহসিনের অবস্থা বোধহয় খুব একটা ভালো না।তাই ভয়ে ভয়ে বললাম, 'মহসিনের কন্ডিশন খারাপ না?' নিতু কান্নাভেজা গলায়ই বললো, 'না। মহসিন ভাইয়ার কোন সমস্যা না। সমস্যা ভাইয়ার। মিতুল ভাইয়া হসপিটালে ভর্তি।রোহানের ছেলেরা ভাইয়াকে মেরেছে। পেটে চাকু মেরেছে। হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছে পিটিয়ে। নিতু বললো, 'তাড়াতাড়ি আসো ভাবী। ডাক্তারেরা বলছে ময়মনসিংহ মেডিকেলে নিয়ে যেতে হবে ভাইয়াকে। অবস্থা সুবিধা না। নিতুর পাশে মাও কাঁদছে। কী হবে এখন? কী থেকে কী হয়ে গেল এটা? আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো জলে।

রাস্তায় আসার পর গাড়ি মিলছে না। এমনিতে গাড়ি- ঘোড়ার অভাব হয় না। কিন্তু বিপদে পড়লেই বোঝা যায় ! তখন এক মিনিটের পথ যেতে এক ঘন্টা চলে যায়। কী করবো না করবো বুঝতে পারছি না।এখান থেকে সদর হসপিটালে হেঁটে যেতে এক ঘন্টা সময় লাগবে। ততোক্ষণে তো! কান্না আসছে আমার। প্রচন্ড রকম কান্না আসছে। চোখ মুছে হাঁটতে লাগলাম।আর ভাবতে লাগলাম একটা অমানুষের আহত হওয়ার কথা ভেবে আমার কান্না আসবে কেন? প্রচন্ড মন খারাপ হবে কেন? দৌড়ে তার কাছে ছুটে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছে হবে কেন? আচ্ছা এটা কী কোন ধরনের ভালোবাসা নাকি মোহ-মায়া।এই যে মোহ-মায়া এই জিনিসটা কিন্তু মুহূর্তে কেটে যায়। যেমন পৃথুর প্রতি মিতুলের মায়া কেটে গেল। কিংবা পৃথুর রোহানের প্রতি। কিন্তু ভালোবাসা বেঁচে থাকে। একজন ঘৃণা করার পরেও অন্যজন আঁকড়ে ধরে রাখে ভালোবাসা। তারপর একদিন ঘৃণাকারী মানুষটাও বুঝতে পারে তার আসল মানুষ কে! তখন সে লজ্জিত হয়। 

আর ফিরে যায় ঠিক তার ভালোবাসার কাছে! হঠাৎ এসব ভাবছি কেন? কী হয়েছে আমার! ঘড়ি দেখছি বারবার। আর নিতুকে ফোন করছি।কল হচ্ছে। ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করছে না। তাহলে কী মিতুলের! না না এসব ভাবতেই পারছি না।কষ্ট হয় ভাবতে। বুকের ভেতর যে হৃৎপিণ্ড আছে ওখানে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ হয়। মনে হয় মিতুলের কিছু হয়ে গেলে আমিও বাঁচবো না।মরে যাবো। হসপিটাল থেকে আর ফিরবো না।ওই যে হসপিটালের বহুতল ভবন।এর একেবারে উপরের যে চিলেকোঠার ছাদ আছে।এর একপাশে গিয়ে লাফ দিয়ে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরে যাবো!

একটা রিক্সা পাওয়া গেছে। সেই রিক্সায় আরেকজন যাত্রী আছে।মধ্য বয়স্ক একজন পুরুষ। গায়ে ঘিয়ে রঙা ফতুয়া। কাঁচা পাকা দাড়ি। সেই দাড়ি সুন্দর করে ছাঁটা।আমি রিক্সা দেখেই বললাম,'দয়া করে আমায় একটু সাহায্য করুন। আমি হসপিটাল পর্যন্ত যাবো শুধু। খুব প্রয়োজন! রিক্সা ওয়ালা চলে যাচ্ছিলো আমার কথা না শুনেই। কিন্তু মধ্য বয়স্ক লোকটা বললো থামতে। তারপর সেই লোক তার পাশে জায়গা করে দিয়ে বললো,'আমিও ওইদিক দিয়েই যাবো। আপনাকে হসপিটালের গেইটে নামিয়ে দিয়ে যাবো।'

আমি ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে রিক্সায় চড়ে বসলাম। কিন্তু একটু পরেই টের পেলাম যিনি আমাকে তার পাশে বসার আশ্রয় দিয়েছেন তিনি আসলে কোন ভদ্র লোক না। ভদ্রলোকেরা পর নারীর পিঠে আঙুল দিয়ে সুরসুরি দিবে না। আমি এই লোকটা থেকে একটু সাবধানে বসলাম।গলা খাঁকারি দিলাম। কিন্তু তার এতেও কোন বোধোদয় হচ্ছে না। এবার সে আরো ভয়ংকর কান্ড শুরু করলো।আবছা আবছা আলোয় রাস্তায় কিছুই স্পষ্ট না।এটাই হয়তোবা তার মোক্ষম সুযোগ।সে এবার আমার জামার ভেতর দিয়ে বুকের কাছে হাত দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু আমি সেই সুযোগ দিলাম না।রিক্সা ওয়ালাকে বললাম, 'মামা রিক্সা থামান।'

রিক্সা ওয়ালা রিক্সা থামাতে চাইতেই আমার পাশে বসা দুশ্চরিত্র লোকটা বললো, 'সোজা হসপিটালে গেইটে গিয়া থামাইবা।এর আগে না।' রিক্সা ওয়ালা আবার রিক্সা চালাতে শুরু করলো।আর বদ লোকটি আমার বুকের ভেতর হাত ঢুকাবার জান প্রাণ চেষ্টা করে যেতে লাগলো। আমি এদিক ওদিক তাকালাম। দেখলাম কাউকে পাওয়া যায় কি না। কিন্তু কেউ নাই। নির্জন পুরো রাস্তা। অথচ অন্যদিন এমন সময় এই রাস্তায় মানুষের ভীড় থাকে। কিন্তু আজ নাই। আসলে বিপদের সময় এমনই হয়। সাহায্যের একটা হাত খুঁজে পাওয়া যায় না পর্যন্ত। এবার আমার কান্না পাচ্ছে। প্রচন্ড রকম কান্না। এই লোকটা তার হাত নিয়ে গেলো আমার বুকে। আমি ওর হাতে কামড়ে দিয়েছি। সে শুধু উহ্ করলো। আর সঙ্গে সঙ্গে এক হাত দিয়ে আমায় শক্ত করে চেপে ধরে ফেললো। এবার আর আমি নড়তে পারছি না। একবার চিৎকার করেছি। কিন্তু সেই চিৎকার কেউ বোধহয় শুনেনি।রিক্সাওয়ালাও থামছে না। সে বোধহয় বেশ আনন্দ পাচ্ছে।

পৃথিবীর মানুষ গুলো এমন কেন? এই লোকটা তো আমার বাবার বয়সী। উনারও তো মনে হয় আমার মতো বয়সী ঘরে কোন মেয়ে আছে। তিনি কী এটা কখনো সহ্য করতে পারতেন যদি তার মেয়ের সাথে কেউ এমন করতো। আমি কাঁদছি। শব্দ করে কাঁদছি। এতে খারাপ লোকটার মনে একটুও দয়া হলো না। সে এবার আমায় আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। আর রিক্সাওয়ালাকে সামনের একটা ঝোপঝাড় দেখিয়ে বললো, 'ওইদিক নিয়া যাও রিক্সা। তোমারে পোষাই দিবো সমস্যা নাই। 

রিক্সাওয়ালা তার রিক্সা ঘুরিয়ে নিলো অন্ধকার ঝোপ-ঝাড়ের দিকে। কী সর্বনাশ! এখন কী উপায় হবে? আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলাম। কিন্তু এই চিৎকার কে শুনবে এখন? এই বনে তো কোন মানুষ থাকে না!

গল্প মায়াবতী - ৬ষ্ঠ শেষ পর্ব - জীবনের কষ্টের গল্প মায়াবতী - সেরা ধারাবাহিক বাংলা জীবনের গল্প, মায়াবতী গল্প, মায়াবতী পর্ব ১২ তমো মায়াবতী পর্ব ১৩ তমো মায়াবতী পর্ব ১৪তমো ১৫তমো পর্ব ১৬ তমো মায়াবতী পর্ব ১১তমো গল্প, মুগ্ধতা নিয়ে গল্প, সংসার নিয়ে গল্প, মায়া নিয়ে মায়াবতী গল্পের কথা, স্নিগ্ধতা নিয়ে গল্প, জীবন নিয়ে গল্প , মায়াবতী নিয়ে গল্পকার ৩য় পর্ব, মায়া নিয়ে স্ট্যাটাস বাংলা, মায়াবতী কষ্টকর গল্প, কেনো এতো মায়াবতী, কষ্টের সংসার, লেখা পিকচার কষ্টের, কষ্টের পিকচার মেসেজ, দুঃখ কষ্টের ছবি, শুধু কষ্টের পিকচার, কষ্টের পিকচার ডাউনলোড, কষ্টের কিছু ছবি, কষ্টের পিকচার HD, ভালবাসার কষ্টের পিকচার, কষ্টের পিক ছেলে, ছেলেদের কষ্টের পিক, কষ্টের পিকচার চাই, কষ্টের পিক মেয়ে
অহংকার নিয়ে বাংলা স্ট্যাটাস ছবি

* আমি শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম কীভাবে বাঁচতে পারবো। এখনও বড় রাস্তা থেকে নামেনি রিক্সা। আরেকটু পথ বাকী। এরপর একটা মোড়। মোড়ের মাথায় ঝোপ-ঝাড়ের শুরু। লোকটা আমায় এখনও চেপে ধরে আছে। আমার সাথে ইচ্ছে মতো অসভ্যতামি করে চলছে। আমি এবার মনে মনে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম। এমনিতেও তো বিপদে পড়েই গেছি। তবে শেষ চেষ্টা করে দেখলে মন্দ কী! আরেকবার কুটুস করে কামড় বসিয়ে দিলাম বদ লোকটির বাহুতে। সে এবার আমায় ছেড়ে যখন হাতটা চেপে ধরলো নিজের ঠিক তখন আমি ধীরে ধীরে চলতে থাকা রিক্সা থেকে লাফিয়ে নামলাম রাস্তায়। তারপর এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা শহরের দিকে দৌড়াতে লাগলাম। দৌড়াচ্ছি আর দৌড়াচ্ছি। পিছনে একবারও তাকাচ্ছি না। আমার ভয় হচ্ছে।কেন জানি মনে হচ্ছে পেছনে তাকালে আর দৌড়াতে পারবো না। ওই শয়তানটাকে দেখবো যে সে একেবারে আমার কাছাকাছি দৌড়ে এসে গেছে। এখন আমায় ঠিক ধরে ফেলবে।

আমার শরীরটা এখনও ভালো ভাবে সেরে উঠেনি। এমন শরীর নিয়ে দৌড়ানো যায় না। পেট ছিঁড়ে যাবে বলে মনে হয়। মনে হয় রাস্তার কালো ধারালো পিছে পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গে ফেলবো। তবুও দম আটকে রেখে দৌড়াতে থাকি আমি। জান প্রান দিয়ে দৌড়াই। আমাকে যে  করেই হোক নিজের স ম্ভ্রম রক্ষা করতে হবে। ফিরতে হবে হসপিটালে। ফিরতেই হবে স্বাভাবিক হয়ে।

এবার আলোর কাছে এসে গেছি আমি। শহরের লাল নীল বাতি জ্বলছে। আর ভয় নেই। পেছনে তাকালাম। গাড়ি আর গাড়ি। ওই শয়তানটা কেটে পড়েছে। আমি বেঁচে গেছি। আল্লাহ আমায় রক্ষা করেছেন! রাস্তার ল্যামপোস্টের পাশে দাঁড়াই আমি। আর মাত্র খানিক সময়। এখানে অটোরিকশা পাওয়া যাবে। এখান থেকে পাঁচ টাকা ভাড়া হলেই চলে যেতে পারবো হসপিটাল গেট।

অটোতে উঠার আগে একটা ফোন দেয়া প্রয়োজন। অনেকটা দেরি করে ফেলেছি আমি। না জানি ওর অবস্থা এখন কেমন! ফোন খুঁজতে গিয়ে দেখি ব্যাগখানাই ফেলে রেখে এসেছি কোথায়!ব্যাগের ভেতর টাকা, মোবাইল ফোন। কী সর্বনাশ! আমার চোখ ভিজে উঠে আবার জলে। কান্নায় দম বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। আচ্ছা মিতুলের তো খারাপ কিছু হয়ে যায়নি! মনে মনে আমি আল্লাহর নাম নেয়। বলি, আল্লাহ, অনেক তো মসিবত দিয়েছো আমায়। অনেক বিপদে ফেলেছো। দিনের পর দিন কাঁদিয়েছো! আর যে আমি নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে খুব। প্লিজ তুমি ওর ক্ষতি করো না। ওকে সুস্থ করে দাও। ভালো করে দাও! বা হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নেয় আমি। তারপর একটা অটোতে চেপে বসি। অটো ছুটছে।

খুব দূরের পথ নয়। মাত্র কয়েক মিনিট লাগবে। কিন্তু এই পথ জেনো কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এই পথ আর ফুরাবে না। এই পথ অনন্ত অসীমের মত। এই পথ না ফুরাবার পথ।

মনের ভেতর কত কী যে আসতে থাকে। দুশ্চিন্তায় ডুবে যায় হঠাৎ। চোখের সামনে দেখি মিতুলের চিৎকার। কান্না। একটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা লাশ। উঠোনের এক পাশে খাটিয়ার উপর রাখা। সেই লাশ কাঁদছে। ভীষণ রকম কাঁদছে! আমার হঠাৎ চেতন আসে। হসপিটালের সামনে এসে গেছে ড্রাইভার। সে আমায় ডাকছে। এই আফা, নামেন, আসছি তো হসপিটাল গেইট!' আমি চমকে উঠি। তাকিয়ে দেখি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে অটো। আমার কাছে টাকা নাই।ব্যাগেই টাকা ছিল। লজ্জা হয় কেমন। তবুও ড্রাইভারকে বলি, 'ভাই, আমার ব্যাগটা চুরি হয়ে গেছে। মোবাইলটাও। আমার হাতে একটা টাকাও নাই! অটোর ড্রাইভার কিছু বলে না। মুখ ভার করে অটো ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়। যেন নিত্যদিন এসব দেখতে দেখতে সে অভ্যস্ত!

ওরা কোথায় আছে জানি না। কতো নং ওয়ার্ড। এসবের কিছুই জানতে পারিনি। মোবাইলটাও নাই। কোথায় গিয়ে খুঁজবো! মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই। বলি, ওদের যদি সামনে পেয়ে যেতাম। নিতুকে কিংবা মাকে!

* গেট পেরিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেল নিতু দৌড়াচ্ছে। দৌড়িয়ে এদিকেই আসছে। ওকে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখে ভয়ে আমার ভেতরটা ধুকপুক করে উঠলো। তবে কী! নিতু কাছাকাছি আসতেই আরও ভয় পেয়ে গেলাম। ও কাঁদছে। ভীষণ রকম কাদছে। আমার কাছে এসে নিতু আমায় জাপটে ধরে ফেললো। তারপর বললো,'ভাবী, ভাইয়া বেঁচে গেছে।ওর কিছু হয়নি। আল্লাহ রক্ষা করেছেন। ডাক্তার বলেছেন আর ভয় নেই এখন!'
'তো কাঁদছিস কেন তুই? মহসিনের কিছু হয়েছে?'
'না। সেও সুস্থ এখন।'
'তবে?'
'খুশিতে কাঁদছি। ডাক্তার ঘন্টা খানেক আগেও বলেছিল ভাইয়া বাঁচবে না। এখন বলছে কোন সমস্যা নাই। এই জন্য কাঁদছি। আনন্দে কাঁদছি। কিন্তু ভাবী--'
'কিন্তু কী?'
নিতু আবার হাউমাউ করে উঠলো। আমায় শক্ত করে তার বুকের সাথে চেপে ধরলো। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললো, 'ভাইয়া আর কোনদিন চোখে দেখবে না!'

ওর মুখ থেকে কথাটা শুনে আমার মনে হলো আমার বুকের পাঁজর ছিঁড়ে আত্মাটা বেরিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে গেছে আকাশের দিকে। আর আমি বুকের পাঁজর ভাঙ্গার ব্যাথায় দিক বিদিক  হাহাকার ভরা চিৎকারে আলোড়িত করে তুলেছি! নিতু বললো, 'ভাবী, ভাইয়া কাঁদছে। আর বারবার তোমার নাম করছে। তুমি আসতে দেরি করছো। ফোনে রিং হলেও ধরছো না। আমি আরও ভেবেছি তুমি আসবে না!' আমি ওই বিষয়টা লুকিয়ে গেলাম।আর বললাম,'মা কোথায়?' কাঁদছে। ভাইয়ার শিউরে বসে কাঁদছে।'

আমি নিতুর একটা হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বললাম,'আমার অত বড়ো ক্ষতিটা হয়ে গেল নিতু! মিতুল আর কখনো আমায় দেখতে পাবে না!' নিতু চুপচাপ কাঁদছে। আর আমার সাথে হাঁটছে। আমরা যাচ্ছি মিতুলের কাছে।

নিতু এর মধ্যে বললো, 'ভাবী, আরেকটা খবর আছে।জানাতেই ভুলে গেছি।' আমি বললাম, 'ওটাও কী দুঃখের খবর?'
'না সুখের।'
'কী বল তো!'
'রোহান, ওর মা, আর ওর সাঙ্গ পাঙ্গরা এরেস্ট হয়েছে। শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলাম আমি। কিন্তু আবার সেই শোক এসে কাঠ ঠুকরে পাখির মতো এসে তার ঠোঁট দিয়ে কুঁড়তে লাগলো আমার বুক।

মিতুলের কাছে পৌঁছাতেই মা আমায় দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তারপর আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন, 'মাগো, আমার ছেলের দেখো কী সর্বনাশ হয়ে গেছে।ও আর নয়ন দিয়ে দেখবে না গো মা আর দেখবে না! মিতুল চুপচাপ শুয়ে আছে।তার নষ্ট হয়ে যাওয়া দুটো চোখ কেমন ঘোলাটে হয়ে আছে।ওই ঘোলাটে চোখ থেকেই টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে বালিশের উপর।কী যে মায়া লাগছে ওকে দেখে।আমি দৌড়ে গেলাম মিতুলের কাছে। এবার ওর একটা হাত মুঠো করে ধরলাম। তারপর কান্নাভেজা গলায় বললাম, 'এই কাঁদছো কেন তুমি?' মিতুল কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, 'আনন্দে।'
'কিসের আনন্দ?'
'পাপের প্রায়শ্চিত্তের আনন্দ।'
'মানে?'
আমি বড় পাপ করেছিলাম। আল্লাহ আমায় সেই পাপের উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছেন। আমার পাপী চোখ দুটো নষ্ট করে দিয়েছেন। হয়তোবা তোমার পবিত্র চেহারা যেন আর কোনদিন দেখতে না পাই এই জন্যই এমন হয়েছে।'

আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম। আর কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,'প্লিজ! এমন করে বলবে না প্লিজ! তুমি চোখে দেখবে। আবার দেখবে।' মিতুল বড়ো অবাক হয়ে বললো, 'কীভাবে? আমার চোখ তো নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে আর কোনদিন আমি দেখতে পাবো না!'
'কেউ যদি চোখ দেয় তবে?'
'কে চোখ দিবে আমায়!'
'যদি আমি দেই?'
মিতুল হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আর সে আমার হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বললো, তোমায় দেখলে আমার বাহ্যিক চোখ লাগবে না।মনের চোখ দিয়ে দেখে নিবো। আমি মিতুলের দিকে তাকালাম। মিতুল আমার দিকে। খুব গভীর ভাবে। আচ্ছা এখন ও কী আমায় মনের চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছে?

এক সপ্তাহ পর--
মিতুল এখন দেখতে পায়। সত্যি সত্যি দেখতে পায়। ওর এখন একটি চোখ আছে। আর আমার একটি। দুজনের মিলিয়ে দুটি। দুজন মানুষের চোখ থাকে চারটে। কিন্তু আমাদের দুটো। আমরা এখন দুজন মিলে একাকার হয়ে গেছি। কী ভীষণ অদ্ভুত ব্যাপার।

আজ নিতুর বিয়ে। খুব একটা হৈচৈ করে এই বিয়ে হচ্ছে না। মহসিন এইসব হৈ -হুল্লোড় অত পছন্দ করে না। বিয়ে হচ্ছে খুব স্বাভাবিক ভাবে। বাসায় একজন কাজী এসেছেন আর মসজিদের ইমাম।একটু পর ওদের বিয়ে। বিয়ের আগে কনেকে জিজ্ঞেস করতে হয় সে এই বিয়েতে রাজি কি না! আমি নিতুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'নিতু, তুই কী এই বিয়েতে রাজি? নিতু হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আচ্ছা এই কান্নাটাও কী আনন্দের?
পাঠক বলবেন প্লিজ!

আর চলবে না। অনেক চলেছে।চলতে চলতে মিতুল, বৃষ্টি, নিতু, পৃথুরা খুব ক্লান্ত। এবার রোহান আর তার মায়ের একটা বড়ো শাস্তি হোক।আমরা আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনাই করি।
                     --সমাপ্ত--

(প্রিয় পাঠক, গল্প এখানেই সমাপ্ত। কাইন্ডলি যারা সবগুলো পর্ব পড়েননি তারা শুরু থেকে সব পর্ব পড়ে নিন। নয়তো কিছুই বুঝবেন না।
 

লেখা: অনন্য শফিক

সবার আগে গল্প পড়তে আমাদের অ্যাপটি ডাউনলোড করে রাখতে পারেন! ধন্যবাদ

আমাদের অ্যাপ ফ্রি ডাউনলোড

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post