গল্প মুখোশ ধারী - ২য় শেষ পর্ব - মুখোশের আড়ালে থাকে অন্যরকম মানুষ - বাংলা গল্প


রাতে আসাদ বাসায় ফেরার আগেই চুপিচুপি বিজয় আমার ঘরে এলো। মা তখন এশার নামাজ পড়ছেন তার ঘরে। বিজয় এসেই আমার ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলো। তখন ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।মনে মনে ভাবলাম আল্লাহ জানে বিজয় আবার কোন ফন্দি আঁটছে! ও তো আবার আমায় কোন বিপদে ফেলবে না? বিজয় ধীর পায়ে হেঁটে আমার কাছে এলো। তারপর আমার কানের কাছে মুখ এনে চুপিচুপি বললো, 'ভাবী, ভয় পেয়েছো?

আমি মাথা কাঁত করে বললাম, 'খুব! বিজয় মৃদু হাসলো। কিন্তু তার হাসির কোন শব্দ হলো না। সে এবার বললো,'ভাবী, লুকোচুরি খেলাটা কখনো খেলেছো ছোট বেলায়? তুমি তো নেত্রকোনায় শৈশব কাটিয়েছো! তোমাদের ওখানে এটাকে বলে পলাবান্ধি খেলা।' আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, 'খেলেছি।' বিজয় বললো, 'আজ রাতে আবার এই খেলাটা খেলবে তুমি। খেলতেই হবে তোমার। আমি বড় অবাক হয়ে বললাম, 'এটা কী বলছিস তুই বিজয়?

বিজয় আবার মৃদু হাসলো। হেসে বললো,'এটা আমার ফাইনাল কথা। আমার কথা না শুনলে তুমি তোমার জন্য বিপদ ডেকে আনবে।মান সম্মান হারাবে। নিজের জন্মদাতা পিতাকে অসম্মানিত করবে। কোন অপরাধ না করেও অপরাধী সাজবে। ডিভোর্সী হয়ে সারা জীবন কেঁদে কেটে কাঁদাবে! ওর কথার কোন কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। এখন আমি কী করবো? আসলে আমার কী করা উচিৎ? বিজয়ের সব কথা মেনে নেয়া? কিছুই বুঝতে পারছি না! বিজয় বললো, 'হাতে সময় কম। ভাইয়া আজ দেরি করে বাসায় ফিরবে এটা নিশ্চিত।যা করার মার নামাজ শেষ হওয়ার আগেই করতে হবে।'
'কী করতে হবে আমার?'
'লুকোতে হবে।'
'কতোক্ষণ লুকিয়ে থাকতে হবে?'
'যতোক্ষণ চোরটাকে ধরতে না পারো ততোক্ষণ।আজ চোর ধরা পড়বে নিশ্চিত!' আমি এবারও অবাক হয়ে বললাম, 'চোরটা কে বল তো?

বিজয় হেসে বললো, 'তুমি জগতের এক নম্বর গাধা! চোরটা কে তা জানার জন্যই তো লুকোবে। এখন জিজ্ঞেস করো আমায় কোথায় লুকোতে হবে। আমি বললাম,'বিজয়, কোথায় লুকিয়ে থাকবো আমি? বিজয় বললো, 'চিলেকোঠার চৌকির নীচে। ওখানে চুপচাপ বসে থাকতে হবে। একদম নড়াচড়া করা যাবে না। ওখানে মশা কামড়াবে। তবুও নড়াচড়া করা যাবে না।

বিজয় কী সব অদ্ভুত কথাবার্তা বলছে।নাকি ও নিজেই কোন ফায়দা লুটতে চায় আমার কাছ থেকে?আমায় মিথ্যে বলে ওখানে পাঠিয়ে তারপর আমার সাথে অসভ্যতামি করবে না তো আবার! বিজয় আমার দিকে তাকালো। তারপর বললো, 'মার নামাজ প্রায় শেষ! এখন কী করবে বলো? বিপদের আশঙ্কা জেনেও আরেক বিপদ থেকে উদ্ধারের আশায় আমি বললাম,'আমি যাচ্ছি। এক্ষুনি যাচ্ছি। বিজয় আবার হাসলো। শব্দহীন হাসি। এই হাসিটাও রহস্যময়। ভীষণ রহস্যময়!

চুপচাপ সিঁড়ি ভেঙে আমি গিয়ে উঠলাম ছাদে। তারপর চিলেকোঠায় রাখা চৌকিটার নীচে গিয়ে বসলাম। ওখানে আঁধার। ঘুটঘুটে আঁধার।আর মশা। মশাদের ভীষণ অত্যাচার। তবুও বসে রইলাম ওখানে। অপেক্ষা করছি চোর ধরার জন্য। কিন্তু আমার মন কেমন করছে।আসল চোরটা কে আমি ঠাহর করতে পারছি না কিছুতেই! আসাদকে আমি সন্দেহ করতে পারি না একদম।কারণ ওকে আমি ভালোবাসি। তবে বিজয়কে আমার খুব ভালো ঠেকছে না!ওর প্রতি আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন না তো যে উপকারের নাম নিয়ে অপকারের সুযোগ লাভ করলো সে! কী জানি!

বাসায় চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে।মার গলা উপর থেকেও শোনা যাচ্ছে। মা বলছেন, 'ছোকরিটা কোথায় গেল? পালিয়ে গেছে নাকি?'

বিজয় বললো, 'যেতেও পারে। আমি কী জানি! মা আবার বললেন, 'পালিয়ে গিয়ে প্রমাণ করে দিলো ছোকরিটা আসলেই নষ্টা! ছিঃ ছিঃ ছিঃ!' বিজয় তার মার সাথে গলা মিলিয়ে বললো, 'ছিঃ ছিঃ ছিঃ ভাবী তো আসলেই নষ্টা। ছিঃ!' মা বললেন, 'পালিয়ে গেলেই কী সে বেঁচে যাবে?এটা তার ভুল ধারণা। আমি ওকে উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো। ওর বাপের বাড়ি গিয়ে সাড়া পাড়ার মানুষ ডেকে এনে সবার সামনে ওর বাপ আর ওকে অসম্মান করে আসবো। লজ্জায় ওরা কোনদিন মুখ দেখাতে পারবে না এরপর!'
বিজয় বললো, 'এই ভালো। এই ভালো!

গল্প মুখোশ ধারী - ২য় শেষ পর্ব - মুখোশের আড়ালে থাকে অন্যরকম মানুষ - বাংলা গল্প মুখোশ পড়া মানুষ, ভালো মানুষের মুখোশ, মুখোশধারী মানুষ, মুখোশ দারি মানুষ, মুখোশধারী মানুষ নিয়ে উক্তি, মুখোশধারী মেয়ে, মুখোশের আড়ালে কবিতা, মুখোশের আড়ালে ভালো মানুষ, মুখোশধারী খারাপ মানুষদের, ১ম পর্ব মুখোশের আড়ালে মানুষ, মুখোশ নিয়ে গল্প, মুখোশ গল্প, মুখোশ নিয়ে কথা, মুখোশ নিয়ে বাংলা স্ট্যাটাস, মুখোশের আড়ালে থাকে আরেক মানুষ, golpo mukhosh dhari bangla
লেখা ছবি বাংলা

* আসাদ ফিরেছে। সে এসেই যখন শুনেছে আমি চলে গেছি তখন অত চিৎকার চেঁচামেচি করলো না। মাকে বললো ভাত দিতে। খাওয়া দাওয়া করে সে বললো,'আল্লাহ যা করেন ভালোই করেন।ভালোই ভালোই আপদ বিদেই হয়েছে। এখন একটা ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিলেই হবে।


সে খুব উৎফুল্ল। যেন বিরাট সাওয়াবের কাজ করে ফেলেছে সে। বিজয় বলেই ফেললো,'ভাইয়া,তুই তো আজ খুব ফুরফুরে মেজাজে আছিস রে!  আসাদ খানিকটা ভরকে গিয়ে বললো,'ফান করবি না আমার সাথে!সিরিয়াস হতে শিখ।' বিজয় সিরিয়াস হতে পারলো না। বড় ভাইয়ের সামনে খিলখিল করে হেসে উঠলো। আসাদ ধমক দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে দপদপ থপথপ করে উঠে এলো ছাদের উপর। তারপর এসে দাঁড়ালো চিলেকোঠার দেয়ালে ঠেস দিয়ে। এখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালো। তারপর ফোন বের করে কোথায় যেন ফোন করলো।

আসাদ বললো, 'মোহিনী ঘর এখন খালি। তোমার সতীনকে আউট করে দিয়েছি!' কথাটা বলেই হা হা হা করে হেসে উঠলো আসাদ। আর সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকটা ধ্বক করে কেঁপে উঠলো। কপালটা ঘামতে লাগলো।চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। তবে কী এতোদিন একটা প্রতারকের সাথে ঘর সংসার করে এসেছি আমি!ভাবতেই ঘেন্না হচ্ছে নিজের প্রতি! কাকে ভালোবাসলাম তবে এতো দিন? ও পাশ থেকে মোহিনী কী বললো কী জানি। কিন্তু আসাদ আবার বললো,'মোহিনী,কী নাটকটাই না করেছি। 

বেচারীকে দুধের সাথে ঘুমের অষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে ছবিটবি তুলে নিজেই আবার বলেছি, এই হারামজাদী, কোন নাগরের সাথে এসব করেছিস তুই! আসাদ হাসছে। হা হা হা করে হাসছে। ওর এই হাসিটা এসে কাঁটার মতো আমার গায়ে বিঁধছে। আমার খুব ইচ্ছে করছে ওকে জন্মের শিক্ষা দিয়ে দিতে। ইচ্ছে করছে এক ধাক্কা দিয়ে ওকে ছাদ থেকে নীচে ফেলে দিতে। কিন্তু যেখানে আমি বসে আছি ওখান থেকে এক চুলও নড়তে পারছি না।যেন মাটির সাথে আমার পা মিশে গেছে।যেন পায়ের তলা থেকে শেকড় বেরিয়ে গিয়ে মিশে গেছে মাটির সাথে।যেন আমি কোন বৃক্ষ হয়ে গেছি। আর কোনদিন ঠাঁয় থেকে নড়তেই পারবো না!

আমার এখন উঠা প্রয়োজন। তারপর চোরটাকে হাতে নাতে ধরা। চিৎকার করে মাকে ছাদে আনা। কিন্তু চিৎকার করার সুযোগ কী আমি পাবো?এর আগেই যদি লাথি মেড়ে নীচে ফেলে দেয় আমায় আসাদ! ভয় করছে। ভীষণ রকম ভয় করছে!

আসাদ এখনও কথা বলছে।ও বলছে, 'মোহিনী,আমরা বিয়ে করবো আরো ছ' মাস পর। মাকে বুঝতে দেয়া যাবে না কিছুতেই ব্যাপারটা। সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার মা পরহেযগার মহিলা। তিনি এসব মেনে নিতে পারবেন না।উল্টো আমায় তেজ্য করে দিবেন বুঝলে! তারপর আবার হেসে উঠলো আসাদ।যেন ওর হাসির রোগ হয়ে গেছে।যেন কথায় কথায় সে হাসবে আর হাসতেই থাকবে!

আসাদ মোবাইলেই মেয়েটাকে চুমু খেয়েছে।আর আমি এসে চুপিচুপি দাঁড়িয়েছি চিলেকোঠার দরজার কাছে।ভাবছি ধীর পায়ে গিয়ে আসাদের কলার চেপে ধরবো। তারপর চিৎকার করে মাকে ডাকবো। বিজয়কে ডাকবো। কিন্তু আমার আর ডাকতে হলো না। তখন উদ্ভট এক ঘটনা ঘটে গেছে। সিঁড়ির কাছ থেকে দৌড়ে এসে মা আসাদের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলেন। 

তারপর ফ্লোরে আছাড় দিয়ে সেই ফোন টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এবার আসাদের গালে এলোপাথাড়ি চড় বসিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন, 'হারামজাদা ইবলিশ, আমার ভাবতেও অবাক লাগছে আমার পেটে তোকে ধরেছিলাম।আগে যদি জানতাম তুই এমন অমানুষ হবি তবে তোকে কোনদিন জন্ম দিতাম না রে হারামজাদা। তোকে কোনদিন জন্ম দিতাম না!' বিজয় মার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে। আর হাসছে। মৃদু করে হাসছে। সেই হাসিও ভীষণ রহস্যময়। আচ্ছা এখনও কী  আসাদ তার ভাইকে বলবে, আমার সাথে ফান করবি না একদম। সিরিয়াস হতে শিখ। সব সময় হাসা এটা কেমন ধরনের স্বভাব?


না আসাদ কিছুই বললো না। বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো ঠাঁই। তার মাথা মাটির দিকে। এবার আমি ওর কাছে গেলাম।ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইচ্ছে করছিলো ওর মুখে থুথু ছিটিয়ে দিতে। কিন্তু ওর মুখে নিজের থুতু ফেলতেও ঘেন্না লাগছিলো।আমি আসাদকে আর কিছুই বললাম না। ওর সামনে দিয়ে হেঁটে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বললাম, 'আচ্ছা এখন তো প্রমাণ হলো সত্যিকার ছোট লোকটা কে?' তারপর আর পেছনে না তাকিয়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে একেবারে নীচে নেমে এলাম। আসার সময় পেছন থেকে বিজয়ের হা হা শব্দের হাসি শুনলাম। এই প্রথম সে শব্দ করে হেসেছে। 

--সমাপ্ত--

লেখক: অনন্য শফিক



আমাদের অ্যাপ ফ্রি ডাউনলোড

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post