বিয়ের ছোট গল্প - আজ ফাহিমের বিয়ে!


মাথা নিচু করে খাটের এক কোণে বসে আছে ফাহিম। মাথায় হাত দিয়ে চুল গুলো টানছে আর প্রতি নিশ্বাসে নিশ্বাসে আক্ষেপের হায় ফেলছে। প্রতিবারের মতো আজও ইস্ত্রি করা শার্ট প্যান্ট ভাঁজ করে রাখা আছে তার বালিশের উপর। কিন্তু তার মোটেও ইচ্ছে করছে না এসব পরিধান করে জুলুমের ন্যায় মেয়ে পক্ষের ঘরে গিয়ে হামলা করতে। কেমন যেন ছেঁদো লাগে ব্যাপারটা তার। কেননা পুরো চৌদ্দগুষ্টি সকলে তার জন্য পাত্রী দেখতে যায়।


দুলাভাই: কি ফাহিম মিয়া! এখনো তৈরি হয়নি? মেয়ে দেখতে যাব যে।


ফাহিম: (বিরক্তির সাথে) প্রতিবারই এসব বাড়াবাড়ি লাগে। তোমরা কি মানুষ ! নাকি মানুষ রুপি বোধগম্যহীন জালিম!

দুলাভাই: এভাবে বলছো কেন ছোট ছোট ভাই! এগুলোই তো নিয়ম, আর তাছাড়া আমরা ছেলেপক্ষ বলে কথা। সবারই গিয়ে দেখা উচিত নয় কি? মেয়ে কেমন! কেমন পরিবার!

ফাহিম: (চোখ বড় বড় করে) আচ্ছা বিয়েটা কার! পাত্রী কার জন্য খোঁজা হচ্ছে?


দুলাভাই: কেন তোমার জন্য! আর এভাবে কথা বলছ কেন? এখনো বিয়ে করোনি না জানি বিয়ের পর কেমন আচরণ করো!

ফাহিম: কেন বিয়ের পর কি হয়! (কিছুটা রাগের সাথে)

দুলাভাই: তোমার এই প্রতিদিনকার চেঁচামেচি আর ভালো লাগেনা। মাকে বলেছি চারটার মধ্যে রেডি হতে, তিনি রেডি আর তুমি আছ এখানে যুক্তি খন্ডন করতে।

ফাহিম: আমি যাব না।


দুলাভাই: মাথা আছেন নাকি গেছে তোমার! ওদের বলে ফেলেছে আমরা আসছি ১০-১৫ জন ছেলেসহ।

আহা আমি বুঝছি, তুমি কেন এমন করছো! মেয়ে দ্বীনদার আছে টেনশন নিও না! প্লিজ ভাই আর বাড়াবাড়ি করো না তোমার মা চেঁচামেচি শুরু করে দিবে।


ফাহিম: আচ্ছা ঠিক আছে, আমি যাব কিন্তু এক শর্তে!


দুলাভাই: উফফ...... আবার কি শর্ত!


ফাহিম: পাত্রী দেখতে যাব শুধু "আমি , মা এবং বোন।"


দুলাভাই: (কিছুটা চেপে গিয়ে) মানে কি!!!


ফাহিম: যেটা শুনলে সেটাই ।আমরা তিনজন যাব ।এর চেয়ে একজন বেশি গেল ও আমি যাব না।

দোলাভাই রাগ করে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে গেল। সাথে জোরে চেঁচিয়ে ডাকতে থাকে- সায়রা! এই সায়রা!

সায়রা: কি ব্যাপার এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেন?

হাসিব: তোমার ভাইয়ের বিয়ে তোমরা বুঝ আমি গেলাম!

মা দৌড়ে এসে-


মা: কি হলো বাবা! রাগ করেছ কেন? ফাহিম কি আবার কিছু বলেছে?

হাসিব: মা আমি যে এই ঘরের জামাই তার কোনো সম্মান নেই। আপনার ছোট ছেলে বায়না ধরেছে সে নাকি শুধু আপনি আর সায়রা কে নিয়ে পাত্রী দেখতে যাবে। এর চেয়ে একজন ও বেশি গেলে নাকি সে পাত্রী দেখতে যাবে না।

মা: এ কেমন কথা!

ফাহিম ! এই ফাহিম! ঔ এইদিকে আয়।

ফাহিম: কি হয়েছে মা ! এভাবে চেঁচামেচি করছ কেন?

মা: তুই কি আমার মান সম্মান সব ডুবাতে চাস? কি সব আবোল তাবোল শর্ত দিচ্ছিস! তোর জন্য পাত্রী দেখতে যাব এই নিয়ে এত শর্ত দেওয়ার কি আছে?


ফাহিম: ঠিকই তো বললাম মা। এত মানুষ কেনো যাবে! নন মাহরাম গেলে মেয়ের পর্দার বিনষ্ট হবে। আর তাছাড়া এতগুলো মানুষ পুরো ব্যাপারটাই ছেঁদো।


মা: এই তুই আর ঠিক হলি না। রগচটাই রয়ে গেলি।

সায়রা: হ্যাঁ ভাই ঠিকই বলেছিস! আমরা তিনজনেই যাব!


মা: না! আমি আমার মেয়ে জামাইকে ছাড়া বৌ দেখতে যাব না!

সায়রা: আহ! মা বুঝার চেষ্টা করো। আগে আমরা দেখে আসি। এরপর বিয়েতে না হয় সব দেখা যাবে।


হাসিব: (কর্কশ কন্ঠে) হ্যাঁ মা হ্যাঁ। যান যান আপনারাই যান।

মা: না বাবা তুমি.......


সায়রা: মা! বিয়েটা ভাইয়ের, ওকে সিদ্ধান্ত নিতে দাও দয়া করে!

মা আর কিছু না বলে চুপ হয়ে রইলেন। এবং বলেন - "যাও তোমার আলালের ঘরের দুলাল ভাইকে রেডি হতে বল। তার এই প্রতিদিনকার বয়ানে আমি বিরক্ত।'


সায়রা: মা তুমি কেন বুঝতে চাইছো না?

মা: এই তুই এত সাফাই গাইবি না ভাইয়ের হয়ে, সব ছেলেমেয়ে আমার হয়েছে এমন। (কান্না কান্না সুরে)


সায়রা: তুমি জানো না আম্মু ভাই কত সৎ! তুমি জাননা ও এগুলো পছন্দ করেনা। সত্যি তো কত সব মানুষ যাবে এতে মেয়ের পর্দা লঙ্ঘন হবে। আর তাছাড়া কত সব আয়োজন।

মা: পাত্রী দেখতে গেলে তো এত সব মানুষ যাবেই।

সায়রা: আম্মু কেন তুমি বুঝতে চাইছো না ইসলামের সৌন্দর্য!

মা: আচ্ছা হয়েছে হয়েছে ঠিক আছে। আমরা তিনজনেই যাব। কিন্তু মেয়ে দেখে কথাবার্তায় আমি আগাবো।

সায়রা: মানে আমি বুঝিনি আগে তো মেয়ে দ্বীনদারিতা দেখতে হবে।

মা: আরে ওসব দ্বীনদারিতা গুলো পড়ে। আগে বাবা কি করে! ভাই কি করে! আমাদের ছেলেকে কি কি দিতে পারবে ? এই হল কথা!

সায়রা: আস্তাগফিরুল্লাহ। আম্মু এইসব তুমি কী বলছো? তুমি কি যৌতুকের ব্যাপার চিন্তা করছো?

মা: আরে এসব যৌতুক হবে কেন ?এগুলো তো এমনি খুশি হয়ে মেয়ের পক্ষ হতে দেয়। আর আমরা তো ভালোই দেনমোহর দিব।

সায়রা: আম্মু খুশি হয়ে দেওয়া এক জিনিস আর খুশিমনে গলায় ছুরি বসিয়ে জিনিস হাসিল করে নেওয়া আরেক জিনিস।


মা: কেন আমি কি তোমার বিয়েতে খুশি মনে অনেক কিছু দেয়নি?

সায়রা: সত্যি করে বলোতো আম্মু! তোমার আর আব্বুর অনেক কষ্ট হয় নি? তুমি কি মনে করেছ আমি সব ভুলে গিয়েছি! তোমার কি মনে পরেনা, বিয়ে দেওয়ার জন্য বাবা চাপা মনে কত টাকা খরচ করেছিলেন। যা তার জন্য জুলুম হয়ে গিয়েছিল।

(মা আনতা আনতা করে আর কিছু বলতে পারলো না!) সাথে সায়েরা আরো বলতে লাগলো:

তোমরা আমাকে যাহ জিনিস দিয়েছো, তা সবই তোমাদের সাধ্যের বাইরে ছিল। কিন্তু এই সমাজ তোমাদের বাধ্য করেছিল। তোমরা তার প্রতিবাদ না জানিয়ে ইসলামী শরীয়ত সীমালংঘন করে আমাকে যৌতুক এর সাথে বিয়ে দিয়েছো। আরো বুক ফুলিয়ে বল আমার মেয়ের জামাই আমার মেয়েকে 20 লক্ষ টাকা দেনমোহর দিয়েছে। কিন্তু আসলে আম্মু এটাও তার(হাসিবের) প্রতি একটা জুলুম ছিল! তার তো এত দেওয়ার সামর্থ্য নেই! আমরা যে মুসলিম তা কি তুমি ভুলে গেলে আম্মু?




মা: (একটু ভীত হয়ে) হুম আসলেই।


সায়রা: জানো আম্মু, কেন ভাই এত মানুষ নিয়ে যেতে নিষেধ করছে! কারণ

পাত্রীকে শুধু পাত্র দেখতে পারবে,পাত্র ছাড়া পাত্রের ভাই, পিতা, চাচা বা কোন মুরব্বী (পুরুষ) কিংবা অন্য কোন পুরুষ পাত্রীকে দেখতে পারবে না।


তা কিছুতেই জায়িয নয়।

{সূত্রঃ সুনানে ইবনে মাজাহ,২য় খন্ড, ৭২৮ পৃষ্ঠা; হাদীস নং ১৮৬৬/

মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, ৬ষ্ঠ খন্ড, ১৬৩ পৃষ্ঠা; হাদীস নং ১০৩৩৫}

মা কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলেন। সায়রা সাথে আরও বলল-


আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে বলেন: ‘আর তোমরা নারীদিগকে তাদের মহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে; সন্তুষ্ট চিত্তে তারা মহরের কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে উপভোগ করবে।’

(সুরা: ৪ নিসা, আয়াত: ৪)।


দেখ আম্মু কোরআনে, দেনমোহরের কথা বলা হয়েছে যৌতুকের কথা নয়।কোরআন করিমে আরো বলা হয়েছে:

‘আর যদি তোমরা তাদের কোনো একজনকে অগাধ সম্পদ বা অঢেল অর্থও দিয়ে থাকো, তবু তা হতে কিছুই প্রতিগ্রহণ কোরো না।’


(সুরা: ৪ নিসা, আয়াত: ২০)।

তাই বলে মহরের পরিমাণ এত কম হওয়া উচিত নয়, যাতে মেয়ের সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং এত বেশি হওয়াও বাঞ্ছিত নয়, যা ছেলের ওপর জুলুম হয়।


তাহলে আম্মু কেন আমাদের সে, অপ সমাজের ঘৃণীয় রীতি গুলো নিজেদের মধ্যে আয়ত্ত করতে হবে? যা আদৌ ইসলামে নেই!

রাসূলুল্লাহ (সা.) বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মিক ও ঈমানের সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন।


তিনি বলেন, ‘নারীদের চারটি গুণ দেখে বিয়ে করো : তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। তবে তুমি দ্বীনদারীকে প্রাধান্য দেবে। নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’


(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৯০)

সুতরাং এখনও কি আমরা সেই সমাজকে প্রাধান্য দিব আম্মু?


মা আর কিছু না বলে সোজা ফাহিমের ঘরেচলে গেলেন। গিয়ে দেখে ফাহিম, মনমরা হয়ে বসে আছে।

মা ফাহিমের মাথায় হাত রেখে বলে- বাপরে আমি অনেক ভুল করে ফেলেছি তোদের প্রতি, আমাকে কি ক্ষমা করে দেওয়া যায় না?

ফাহিম: এসব কি বলছ তুমি আম্মু! মায়েরা কখনো এভাবে ক্ষমা চায় না!

এই বলে ফাহিম সায়রা মাকে জড়িয়ে ধরল। এবং সুন্নাহ মোতাবেক ফাহিমের পাত্রী দেখতে গেল। এবং শরীয়া মোতাবেক তাদের বিয়ে হলো।

গল্প: আজ ফাহিমের বিয়ে।

লেখিকা: মাহাবুবা সুলতানা মীম।

মিম্বার (Minbar)



Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post