আমাকে বিয়ে করবেন? - অপেক্ষা?



আমাকে বিয়ে করবেন?

আমার প্রশ্নটা বোধহয় অনেক মজার ছিল নয়তো ফোনকলের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিটা লুটোপুটি খেয়ে হাসছে কেন! 

-আ'ম সিরিয়াস,সীমান্ত। আপনি কি আমায় বিয়ে করবেন? 

এবারের কথাটা বুঝি ওর গায়ে লেগেছে, চুপ হয়ে গেলো। শান্ত ও আদর মাখা কন্ঠে আমাকে সীমান্ত  বলে, 

-তুমি আমাকে স্বচোক্ষে দেখেছো, ময়না?আমি কিন্তু খুব কালো। যেমন ধরো পাতিলের তলায় যেমন রঙ থাকে ঠিক তেমন কালো। 

-আপনি কবে থেকে গায়ের রঙের কথা বলতে শুরু করেছেন?আমি আপনার কন্ঠের প্রেমে পড়েছি, আপনার সাথে কথা বলতে গিয়ে আমি আমার মনের আয়নায় আপনার চেহারার প্রতিবিম্ভ দেখেছি। 

-আমি যদি বাস্তবিক তোমার মনের আয়নার দেখা সেই সীমান্তের মতো না হই, তবে কী করবে তুমি ময়না? 

-আমি আপনার মতো অত সাহিত্যেক মানবী নই। আমি বাস্তব মেনে চলি, আমার পাশে দাঁড়ানো মানুষটা যে কোনো বর্নের হোক, লম্বা হোক বা বেঁটে আমার তাতে কিছু যায় আসে না আমি শুধু জানি সে শুধু আমায় সকালের শিশিরের টুপটাপ ফোঁটায় যতটুকু পানি ঘাসে জমে থাকে ঠিক ততটুকুই আমায় ভালোবাসুক। 

-বাহ্ ময়না! তুমিও দেখছি কথার মালা গাঁথথে শিখে গেছো। 

-সীমান্ত,বাবা আমার বিয়ে আমার বিয়ে ঠিক করেছো। আমি চাই না বাবার বিরুদ্ধে যেতে এবং এটাও চাই না সীমান্ত ছাড়া কেউ আমার হৃদয় বা শরীরে স্পর্শ করুক। নিজের প্রতি নিজের শরীরের প্রতি বড্ড ঘৃনা জন্মাবে যদি ভালোবাসার মানুষ আমায় স্পর্শ না করে অচেনা কেউ স্পর্শ করবে। 
হ্যালো, হ্যালো সীমান্ত আপনি শুনতে পারছেন? হ্যালো? 

কল কেটে গেছে ময়না তার বাটন মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে টেবিলের উপর রেখে জানালা সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। 

জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ময়না দেখতে পেলো,মেঘে ঢাকা আকাশকে।যেকোনো মূহুর্তে আকাশ থেকে বর্ষিত পবিত্র পানি।ধুয়ে মুছে দিয়ে যাবে পৃথিবীর সকল আবর্জনা। 

আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে ভাবতে থাকলো, কিভাবে তার যোগাযোগ হলো সীমান্ত নামক মানবটার সঙ্গে? 

কোনো এক বর্ষার দিনে, ছাতা মাথায় দিয়ে ময়না যায় ফেক্সিলোডের দোকানে৷ ওর বাবা গিয়েছে চাকরিসূত্রে ঝিনাইদহ।মা নেই ময়নার। বাবার কাছে সকল আবদার ময়নার। 

বাড়িতে ময়না একা, তবে ওর সাথে ওদের বাড়ির ভাড়াটিয়ার মেয়ে থাকবে বলে জানিয়েছে।এত মুষলধারে বৃষ্টিতে না আছে ইলেক্ট্রিসিটি না আছে ময়নার মোবাইলে টাকা। তাই উপায় না পেয়ে ওরই দোকানে আসতে হলো।

দোকানদার বললো ওর মোবাইলে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, ময়না চেক করে দেখলো টাকা আসেনি। দোকানদারকে বলতেই, তিনি খেয়াল করে দেখলেন ভুল নাম্বারে টাকা চলে গিয়েছে। ময়নাকে এই কথাটি বলতেই ময়না রেগে যায় কিন্তু প্রকাশ না করে দোকানদারকে বলে, 

-চাচা,আপনি ওই নাম্বারে কল দিয়ে বলুন, ভুল করে টাকা চলে গিয়েছে, যেন খুব দ্রুত আমার নাম্বারে টাকাটা পাঠিয়ে দেয়। 

দোকানদার মাথা নাড়িয়ে কল দিলো সেই নাম্বারটিতে। বার দুয়েক রিং পড়তেই কল রিসিভ করতেই, দোকানদার সবকিছু খুলে বলতেই, সেই ব্যক্তি রাজি হয় না টাকা ফেরত দিতে। 

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ময়না কথা শুনে বুঝতে পারে, সেই ব্যক্তি টাকা দিতে রাজি হচ্ছে না। ময়না দোকানদারকে ইশারা করে ওর কাছে মোবাইল দিতে ও কথা বলবে। 

ময়না মোবাইল নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপর পাশের ব্যক্তি চুপ হয়ে গেলো। আবারও হ্যালো বলতেই,বলে উঠে 

-জি, শুনতে পাচ্ছি। 

-দেখুন,আমাদের এখানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। আমি একা এসেছি দোকানে।বুঝতেই পারছেন একা একটা মেয়ে দোকানে দাঁড়িয়ে আছি বৃষ্টির মধ্যে। অনুরোধ করছি টাকাটা প্লিজ আবার রিটার্ন করুন। 

-কোন নাম্বারে দিতে হবে? 

-আপনার নাম্বারের সাথে হুবহু মিল শুধু লাস্ট ডিজিট বাদে আমার ৫ আপনার ৯। 

-আচ্ছা, আপনি বাড়িতে চলে যান। আমি দিয়ে দিচ্ছি। 

সেদিন অচেনা লোকটার কথা বিশ্বাস করে আমি বাড়িতে চলে যাই। ছাতা বন্ধ করার আগে মোবাইলে মেসেজ টোন বেজে উঠলো। হাত থেকে ছাতাটা ঝু্ড়িতে রেখে, চেক করতেই দেখি সত্যি সত্যি টাকাটা উনি রিটার্ন করেছে।আরও একটি মেসেজ এলো, সেখানে লেখা 

"আমি অনেক ঘাড়ত্যাড়া লোক। সোজা কিছু করতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু, আজ এক রমনীর সুমধুর কন্ঠে স্যারান্ডার হলো আমার হিয়া। তাই তো নিজের স্বভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনুরোধ রাখলাম সেই রমনীর। এত কিছু করলাম, তার বিনিময়ে আমার কিছু চাই বেশি কিছু না শুধু প্রত্যেক সকালে একটি হ্যালো শুনলেই চলবে। যদি আমার প্রস্তাব মানেন তবে আগামীকাল সকালে কল করে হ্যালো জানাবেন। আমি অপেক্ষায় থাকবো।"

তার কথায় কি যেন ছিল!আমি মানা করতে পারিনি। ঠিক পরদিন আমি কল করেছিলাম আর সেই ব্যক্তির কন্ঠের প্রেমে আমি খুব ভালো করে পরে গেলাম। যেখান থেকে কারো হাত ধরে ওঠা অসম্ভব। 

কথায় কথায় জেনেছিলাম সে নাকি বই লেখে,শব্দের খেলায় নাকি কবিতার মেলা বসায়। 

আজ পাঁচটি বছর ধরে তাকে না দেখে, না স্পর্শ করে ভালোবেসে যাচ্ছি,অপেক্ষা করে যাচ্ছি । আমি জানি না ঠিক কবে আমার এই ভালোবাসার অপেক্ষা শেষ হবে।

বাবা একা মানুষ তাই চাইছেন আমার বিয়ে দিতে৷ একটা বিবাহ উপযুক্ত মেয়েকে ঠিক কতদিন ঘরে রাখা যায়!

-ময়না, এই ময়না 

বাবার ডাকে কল্পনার রাজ্য থেকে বের হয়ে এলাম। ঘর থেকে বের হয়ে বাবার ঘরে যেতেই দেখি অচেনা এক যুবক বসে আছে। বেশ সুদর্শন,শুভ্র বর্নের পাঞ্জাবি পড়নে। আমাদের উপরতলার ভাড়াটিয়ার ছেলে। 

বাবা আমাকে দেখে বললেন, 

-ও হচ্ছে আমার মেয়ে ময়না। আর ময়না ওকে চিনিস তুই? 

-জি বাবা, উনি মিষ্টির বড়ো ভাই জাওয়াদ। 

-আঙ্কেল, আমি চলি। মা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। 

জাওয়াদ কথাটি বলে উঠে দাঁড়ালো। খেয়ার বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এমনসময় ময়নার বাবা ময়নাকে বলে,

-ছেলেটাকে পছন্দ হয়েছে তোর? 

-হঠাৎ, এই প্রশ্ন কেন বাবা? 

-কারণ, জাওয়াদের সাথে তোর বিয়ে ঠিক করেছি আমি,ছেলে ভালো।দরজাটা লাগিয়ে আয়,বাকি কথা এসে শুনিস। 

ময়না যেন কিছু বলার শক্তি হারিয়ে ফেললো।কিন্তু, ওর বাবাকে বুঝতে না দিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে যায় দরজা আটকাতে। 

দরজার সামনে যেতেই ময়নার মোবাইলে কল এলো, সীমানা কল করেছে। ময়না কান্নারত অবস্থায় কল রিসিভ করে বলে, 

-আপনি কি সত্যি আমায় বিয়ে করবেন না? 

-করবো তো। 

-কবে? 

-তুমি বললে আজই। 

-কিন্তু, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। 

-করুক। তুমি আমাকে চাও, ময়না? 

-নিজের থেকেও বেশি। 

-তবে, দরজা খুলে বের হয়ে এসো। 

-আপনি এসেছেন? 

কল কেটে দিয়েছে সীমান্ত, ময়না হতদন্ত হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে দেখে, জাওয়াদ  দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে, হাতে বেলিফুলের মালা। 

-আপনাকে ভালোবাসি ময়না,আমার হৃদয়ের সীমান্ত জুড়ে শুধু ময়নার কলরবে মুখরিত হোক। 

ময়না কান্না-হাসি মিশ্রিত চাহনিতে তাকিয়ে রইলো তার ভালোবাসার মানুষ সীমান্তের দিকে। তারমানে, এতদিন তার সাথে একি বাড়ির  ছাদের তলায় থেকে ভালোবাসার কষ্টে ডুবিয়ে মেরেছে। 

-কি হলো ময়না, কাছে আসবে না আমার? 

-আপনি আমার সীমান্ত হতেই পারেন না। কারণ, সে অনেক কালো আর আপনি ব্রিটিশ। 

-আমি মিথ্যে বলেছিলাম। দেখো, তুমি কিন্তু আমায় বলছিলে তোমার সাথে আমার দেখা হলে কি বলে প্রেম নিবেদন করতে হবে। আমি কিন্তু করেছি। অতএব আমি তোমার সীমান্ত ওরফে জাওয়াদ। 

ময়না দরজা লাগিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে মোবাইল বের করে সীমান্তকে কল দিয়ে বলে, 

-প্রেম নিবেদন মঞ্জুর হলো। একেবারে বরযাত্রী নিয়ে আসুন তখন না হয় হাজার চাঁদনী রাতে ছাদে বসে প্রেমের শব্দের মালা গাঁথবো। 

অপরপ্রান্তে সীমান্তের খিলখিল হাসি শোনা গেলো।

সমাপ্ত 

অপেক্ষা 
লেখা: Tahmina Akther

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post