ভালোবাসার গল্প - প্রাপ্তির পরিশেষে Bengali valobashar golpo
ভালোবাসার গল্প - প্রাপ্তির পরিশেষে Bengali valobashar golpo


আমার বাবা আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিল দীশাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম বলে। হাজারো বার মানুষের মুখে আমাকে শুনতে হয়েছে দীশা টাকার লোভে আমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। আর দীশাকে শুনতে হয়েছে, ধনীর ছেলেরা শুধু প্রেম করে চলে যায়। বিয়ে করে না। কিন্তু আমরা জানতাম আমরা দুজন দুজনকে কতটা ভালোবাসি।
বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে বাবা বলেছিল,
" আমার টাকা ছাড়া তুমি এক পা ও চলতে পারবে না। বাইরের জীবন এত সহজ না। তুমি আজ ঐ ফকিন্নি মেয়ের জন্য আমার কথার অবাধ্য হচ্ছো। তাই আমি তোমার ফেরত আসার সব রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছি। আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার পা যেন এই বাড়িতে না পড়ে। " 
কথাটা শোনার পর এক মিনিটও আমি সেখানে দাঁড়াই নি। সম্পূর্ণ শূন্য হাতে বেরিয়ে এসেছিলাম।

 সত্যিই বাইরের জীবন টা আমার জন্য সহজ ছিল না। বাবা মায়ের ভাষ্যমতে সোনার চামচ মুখে জন্মগ্রহন করেছিলাম আমি। ঘুম থেকে উঠে বেডসাইড টেবিলে চা কফি রেডি থাকতো। বাড়ি ভর্তি চাকর। মুখ দিয়ে হা করতেই সবকিছু চোখের সামনে হাজির। প্রাইভেট কারে ভার্সিটি যেতাম। ইচ্ছামতো দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াতাম। বাবার ব্যাংক ভর্তি টাকা ইচ্ছামতো উড়াতাম। কিন্তু জীবনটা হঠাৎ পাল্টে গেল কারো প্রেমে পড়ে। 

দীশাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ডিপার্টমেন্টের অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে। আমার দুই বছরের জুনিয়র সে। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিল। বেশ চুপচাপ একটা মেয়ে। পোশাকাশাক খুব সিম্পল। আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্টাইলিশ না। হাসিটা খুব মিষ্টি। আমি ওর স্বাভাবিক জীবনের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। প্রথম কয়েকমাস আমি ওকে কিছুই জানাতে পারি নি। পরে একদিন সাহস করে বলেই ফেললাম। কিন্তু সে আমার সাথে সম্পর্কে জড়াতে চায় নি। বলেছিল তার আর আমার দুইজনের জীবনযাত্রা আলাদা। কেন হয় না জানতে চাইলে সে তার পারিবারিক দুর্বিষহ জীবন সম্পর্কে সবটা জানিয়েছিল।

                   ছোটবেলায় দীশার বাবা মারা যায়। অনেক দারিদ্রে জীবন কাটে ওদের। ওর মা অনেক কষ্ট করে মানুষের থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে ওকে পড়াশোনা করিয়েছে। সে পর্যাপ্ত টিউশন পেত না। যা পড়তো সবকিছু ক্লাসে আর বাকিটা নিজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরে তার এখানে পড়তে আসা অনিশ্চিত ছিল। পরে ওর মা ওদের বাড়ির ভিটা বন্দক রেখে ওকে পড়তে পাঠিয়েছে। এখানে এসে দীশা টিউশন করে নিজের হাতখরচ চালাতো। 
সবটা শুনে আমি আরো বেশি মায়ায় পড়ে যাই। হাল ছাড়ার বান্দা আমি নই। সবসময় ওর পিছে লেগে থাকতাম। লম্বা অপেক্ষার পরে সে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল। কিন্তু কোনদিন আমার কোন গিফট, টাকা পয়সা সে গ্রহন করে নি। ওর আত্মসম্মান টা অনেক বেশি ছিল। পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছিলাম আমি এই মেয়েটাকে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি সর্বপ্রথম দিশার মুখোমুখি হলাম। ওকে বলেছিলাম,
-- আমি এখন সম্পূর্ণ শূন্য। আমি শুধু এই
   মানুষটা আছি। আমার টাকা পয়সা, ব্যাংক
   ব্যালেন্স, গাড়ি বাড়ি কিচ্ছু নেই। ভবিষ্যতেও
   বাবার কোনকিছুর অংশীদার আমি হবো না।
   সবকিছু জেনে কি তুমি আমাকে বিয়ে করবে? 
-- আমার শুধু তোমাকে প্রয়োজন নৈরিত। তুমি
   জীবনে কি পাবে না পাবে জানি না। তুমি
   আমাকে পাশে পাবে আমার শেষ নিঃশ্বাস
   পর্যন্ত। 
খুব মন খারাপের মধ্যেও সেদিন ফিল হচ্ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটা আমি করেছি। চিৎকার করে সমাজকে বলতে ইচ্ছা করছিল,  'দিশা আমাকে টাকার জন্য ভালোবাসে নি। সে নৈরিত নামক অগোছালো মানুষটাকে ভালোবেসেছে'। সেদিনই আমরা বিয়ে করে ফেলি।

          ধনী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও আমি উগ্র স্বভাবের ছিলাম না। বরাবরই আমার ওপর বাবার রাগ ছিল কারণ আমি তার নির্দেশিত পথে চলতে পারতাম না। বাবার কাছে টাকাই সব। ছোট থেকেই ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। ভালো রেজাল্ট করে যখন হাসিমুখে বাবার সামনে এসে রেজাল্ট জানাতাম বাবা মুখ তুলেও আমার দিকে তাকাতেন না। শুধু বলতেন যত টাকা লাগবে নিয়ে বন্ধুদের সাথে মজা করো। ফ্যামিলি ওয়াইজ কখনো খাবার খেতে বসতে পারতাম না। একসাথে কখনো ঘুরতে যাওয়া হতো না। আমার কোন প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির গল্প শোনার সময় হতো না বাবার। বাবার কাছে যেটাই চেয়েছি শুধু টাকা ধরিয়ে দিয়েছে।

বিয়ের পরেও দীশা ছাত্রী হোস্টেলেই থাকতো কারণ আমাদের অন্য কোথাও ভাড়া থাকার মতো টাকা ছিল না। বেশ কিছু ভালো ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার চাইলাম। সবাই অলরেডি জেনে গেছে আমি এখন ফকির প্রায়। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে কেউ টাকা দিতে রাজি হলো না।
         সন্ধ্যার পরপর ডিপার্টমেন্টের সামনে মাঠে চুপচাপ বসে আছি। পাশ দিয়ে সুমন নামের আমার একজন ক্লাসমেট টিউশন শেষে হোস্টেলে ফিরে যাচ্ছিল। তার সাথে আমার তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। আমাকে জরাজীর্ণ অবস্থায় বসে থাকতে দেখে সুমন জিজ্ঞেস করলো,
-- কিছু হয়েছে তোমার, একা বসে যে?
-- টিউশন থেকে আসছো?
-- হ্যা। 
-- আমাকে একটা টিউশন খুঁজে দিতে পারবে?
সুমন বেশ অবাক হয়েছিল। আমার মতো ধনীর আদুরে ছেলে টিউশন করাবে কেন। সে আমার পাশে এসে বসলো,
-- তুমি টিউশন করাবে কেন?
-- আমি দিশাকে বিয়ে করেছি। পরিবারের সাথে
   সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে এসেছি। আমার
   টাকার প্রয়োজন।
-- টিউশন অনেক কষ্টের। একটা টিউশন করে 
   তুমি অনেক কম টাকা পাবে। বেশি টাকার
   জন্য তোমাকে অনেকগুলো টিউশন করাতে
   হবে। তোমার কষ্ট হবে।
-- কেন তুমি কিভাবে করো?
-- আমার কষ্ট করে অভ্যাস আছে।
-- অভ্যাস হয়ে যাবে আমারও। প্লিজ পারলে
   খুঁজে দাও।
-- তুমি ফার্স্ট ইয়ারে আমাকে বইগুলো কিনে
   দিয়ে আর ফর্মফিলাপের ফি দিয়ে যে উপকার
   করেছো। আমি অবশ্যই চেষ্টা করবো
   তোমাকে হেল্প করার।
-- আমি উপকার করেছিলাম বলে নয়, তুমি বন্ধু
   হিসেবে আমার উপকার করো।
-- তুমি কোথায় থাকবে রাতে?
-- আপাতত এই মাঠে।
-- আমার সাথে হোস্টেলে চলো। 
-- আচ্ছা আমি কি হোস্টেলে একটা সিট পাবো?
-- ফাইনাল ইয়ারে পাওয়া টাফ। বাট কয়েকদিন
   আমার সাথে থাকো। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

হোস্টেলে ফিরে সুমন ওর ভাগের খাবারটা আমাকে খেতে দিল। হোস্টেলের খাবার ভাত, স্যাঁতসেঁতে পাতলা ডাল আর এক টুকরা মাছ। খাবার মুখে দিয়ে গলা গিয়ে নামাতে পারছিলাম না। এই খাবার মানুষ কিভাবে খায়? তবুও কষ্ট করে খেয়ে নিলাম আর অর্ধেকটা সুমনকে দিয়ে দিলাম। রাত হোস্টেলের সরু বেডে আমাকে জায়গা করে দিয়ে সুমন মেঝেতে শুয়ে পড়ল। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছে। আমি ওকে বললাম, ' আমরা দুইজনই মেঝেতে ঘুমাই একসাথে, গল্প করা যাবে'। সারারাত মশার কামড়ে ঘুমাতে পারলাম না।

 মাঝেমাঝে ক্যাফেটেরিয়া বা রাস্তার পাশে ভাতের হোটেলে খাওয়া শুরু করি যেগুলোর মুখ আমি কোনদিন দেখিনি। দশ টাকা প্লেট ভাত, ডিম ভাজি,মাছ বা ঝোল ডাল খাই। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল প্রথম দিকে। আরামের শরীর বলে কথা। বাড়ি থেকে যে টি-শার্ট টা পরে বের হয়েছিলাম সেটা পরেই চার-পাঁচদিন আছি। ঘামের দুর্গন্ধে নিজেরই বমি পাচ্ছে। অথচ বাড়িতে আমার ওয়ারড্রব ভর্তি শার্ট টি-শার্ট। সুমন আমাকে কমদামী একটা টি-শার্ট কিনে দিল। দুটো টি-শার্ট উল্টা পাল্টা করে পরা শুরু করলাম। কাপড় কাঁচতে জানি না। টি-শার্ট নোংরা হলে দীশা পরিষ্কার করে শুকিয়ে দিয়ে যেত। নতুন নতুন অভ্যাস হয়েছে তখন। সুমনের সাথে ভোরে উঠে নামাজে যাই অথচ আগে দশটার আগে ঘুম ভাঙা মুশকিল হতো। দীশার সাথে ভার্সিটির রাস্তায় হাটি সকালে। প্রিয় মানুষটাকে প্রতিদিন দেখি। হাসি আনন্দ ছিল জীবনে। কিন্তু বাবা-মা, ভাইয়া-ভাবীকে মিস করতাম।

কয়েকদিনের মাঝেই সুমনের পাশের বেডের এক সিনিয়র ভাই হোস্টেল থেকে চলে গেল। উনার সিট টা আমি পেলাম। পুরোনো বন্ধুরা আমার সঙ্গ ত্যাগ করেছে অনেক আগেই কারণ এখন আর তাদের পেছনে টাকা উড়াতে পারি না। সুমনের সাথে আমার একটা ভালো বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। বাড়ি গেলে সে তার মায়ের হাতের রান্না আমার জন্য নিয়ে আসে। এক ছুটিতে ওর গ্রামের বাড়ি ঘুরতে গিয়েছিলাম। মাটির মানুষ ওরা। গ্রাম একটা অনন্য সুন্দর জায়গা। জীবনের কিছু ভালো মুহুর্ত ওর সাথে কাটিয়ে এলাম। সুমনের কাছে আমার এ জীবনে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পরে প্রথম মাসে দীশা ওর টিউশনের টাকা টা আমাকে দিয়েছিল। লজ্জাই চোখে পানি চলে আসে। ওর জোরাজোরিতে টাকাটা নিয়েছিলাম। আমার কাছে কানাকড়িও ছিল না। সুমন আমাকে টিউশন খুঁজে দিল। তীব্র রোদে হেটে টিউশনে যাই হেটেই ফিরে আসি। জীবনে কম সময় আমি রিকশাই ঘুরেছি। আমাকে হেটে যেতে দেখে পরিচিত দু-চার জন রিকশাওয়ালা রিকশাই আসতে বলে। এদিকে আমি টাকা জমাচ্ছি তাই হেটে যাতায়াত করছি। আমার কষ্ট দেখে দিশা একদিন বলল, " তুমি আমাকে ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাও নৈরিত। তোমাকে এই অবস্থায় আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এই কষ্টের জীবন তোমার জন্য নয়। "
আমি জবাব দিয়েছিলাম, " কেন আমার জন্য নয়? আমার বাবা ভুল করেছে ছোট থেকে আমাকে স্ট্রাগেল করতে না শিখিয়ে। আর আমার মোটেও কষ্ট হচ্ছে না। কত মানুষই তো কাজ করে খায়। আমিও তাদের মতোই সাধারন মানুষ। আর কথা দিয়েছো সারাজীবন থাকবে। যদি এসব উল্টাপাল্টা কথা বলো তাহলে কোনদিন আমাকে আর দুনিয়াতে দেখতে পাবে না। "
দীশা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করলো খুব। 

প্রথম মাসের টিউশনের টাকা থেকে দীশাকে একটা লালপেড়ে সুতি শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। বিয়ের পর ওকে কিছুই দিতে পারিনি। খুশিতে ওর চোখে পানি চলে এসেছিলো। শাড়িটা পরে সুন্দর করে সেজে আসতে বলেছিলাম ওকে। সেদিন বিকেলে ভার্সিটিতে অনেক ঘুরেছি ওকে নিয়ে। আমার খেতে কষ্ট হয় বলে মাঝেমধ্যে দীশা আমার জন্য রান্না করে আনে। ওর হাতের রান্নার অসাধারণ স্বাদ। কখনো টিউশনিতে গিয়ে যা নাস্তা পাই তা খেয়েই থেকে যাই। হোস্টেলের খালার জঘন্য রান্নাও এখন তৃপ্তি সহকারে খাই কারণ সত্যিকারের ক্ষুধার্ত পেটে সব খাবার অমৃত। 

মা লুকিয়ে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে। বড় ভাইয়া যোগাযোগ করে অনেকবার টাকা দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নেই নি। বাবার কোনকিছুই আমার দরকার নেই। কয়েক মাস বেশ কষ্ট করে ফাইনাল ইয়ার শেষ করলাম। টিউশনিটা কন্টিনিউ করে যাচ্ছি। আমার ততদিনে অভ্যাস হয়ে গেছে দিনে চারটা টিউশনি করানোর।

 গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে চাকরি খুঁজছি। বাবার পরিচয় দিলে এতদিনে ডজনখানেক চাকরি আমি পেয়ে যেতাম। বড় মানের শিল্পপতির ছেলে বলে কথা। কিন্তু নিজে কিছু করে দেখিয়ে দিতে চাই। সিজিপিএ ভালো থাকায় তাড়াতাড়ি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেলাম। যদিও আমার চাকরির ব্যাপারে বরাবরই উচ্চমাত্রার স্বপ্ন ছিল। 
তখন দীশা তৃতীয় বর্ষে। দুইমাস চাকরির পরে ছোট্ট দুইরুম, বাথরুম, আর কিচেনের বাড়ি ভাড়া নিলাম। সেখানে আমরা নতুন সংসার শুরু করলাম। সারাদিন অফিস করে ফেরার পরে আমার চাকরির প্রিপারেশন নেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু লক্ষ্য ছিল ভালো কিছু করার তাই শত কষ্টেও রাত জেগে পড়তে হতো। মাঝে একদিন মা বড় ভাইয়াকে সঙ্গে করে আমাদের বাড়িতে এলো। এই ছোট্ট রুমে আমি কিভাবে বাস করছি ভেবে মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বারবার বলতে থাকলেন আমি অনেক শুকিয়ে গেছি। মাকে সান্তনা দিয়ে বললাম আমরা কোন অসুবিধাই নেই। তারা যেন শুধু দোয়া করে আমাদের জন্য।
সত্যিই বেশ সুখী আমরা। অফিসে সারাদিন খাটুনির পরে যখন বাড়ি ফিরে দীশার মুখটা দেখি চোখ দুটো আনন্দে ভরে যায়। অফিস থেকে ফিরলে নিয়ম করে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু দেয়। মাঝেমাঝে সারারাত জেগে গল্প করি। ইচ্ছা করেই ওকে বিরক্ত করি। হাসি কান্নার একটা সঙ্গী পেয়েছি আমি। 

প্রথমবার বিসিএস দিলাম। টিকলাম না। মনটা বেশ খারাপ হলো। পরেরবার দীশাও আমার সাথে প্রিপারেশন নিতে শুরু করলো। আমরা দুজন দুজনকে পড়াশোনাই হেল্প করি। রাত জেগে পড়ি। গল্প করি। মাস্টার্স টা কমপ্লিটের পরে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়াই আমার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক পদে যোগদান করলাম। হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম আমি বাবা হতে চলেছি। সেই খুশি আর ধরে কে।

পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে এসেছে। যেহেতু আমার চাকরিটা হয়ে গেছে আমি পরীক্ষাটা দিলাম না। দীশা প্রথম চান্সেই শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পেল। কয়েকমাস পরেই আলহামদুলিল্লাহ আমাদের একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান জন্ম নিল। ততদিনেও বাবা আমার সাথে যোগাযোগ করেন নি। আমিও চেষ্টা করিনি।

পাঁচ বছর চলে গেছে। বাড়ি থেকে ফোন দিয়ে ভাইয়া জানালো বাবা অসুস্থ। বুকের ভেতর টা কেঁপে উঠলো। বাবার ওপর প্রচন্ড রেগে ছিলাম কিন্তু হাজার হোক বাবা তো। কিন্তু বাবা তো আমাকে বাড়িতে যেতে নিষেধ করেছে। বেশ মন খারাপ করে বসে আছি। দীশা বলল,
-- তুমি একটাবার বাবার সাথে দেখা করে এসো।
-- এতবছর পরে আমি বাবাকে কিভাবে ফেস
   করবো? আর বাবা আমাকে তার মৃত্যুর আগে
   না যাওয়ার কসম দিয়েছে।
-- উনি রাগের মাথায় কথাগুলো বলেছিলেন। 

সিদ্ধান্ত নিলাম বাবাকে দেখতে যাবো। দীশা আর আমাদের দুই বছরের মেয়ে নিধিকে নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হলাম। আমার একটা ছোট্ট ভাতিজা হয়েছে যাকে বাস্তবে কোনদিন দেখিনি।ওকে কোলে নিয়ে আদর করলাম। দীশা বেশ ভয়ে ভয়ে আছে। বাবা আমাদের দেখে অভিমানের সুরে বলল,
-- তুমি কেন এসেছো?
-- দীশা আমাকে আসার জন্য অনুরোধ করেছে।
-- এত বছর পরে তোমার মনে পড়লো তোমার
   বাবা বেঁচে আছে?
-- তুমিই আমাকে আসতে নিষেধ করেছিলে।
বাবা কেঁদে ফেলল। বলল,
-- আমি অন্যায় করেছি তোমার সাথে। সবার
   সাথে। আমি শুধু টাকার নেশাই ছুটেছি।
   আমার পরিবারকে কখনো সময় দেই নি।
   ভেবেছিলাম এই টাকা আমি পরিবারের জন্যই
   জমাচ্ছি। কিন্তু আমার পরিবারে ভালোবাসা
   প্রয়োজন ছিল সেটা আমি বুঝিনি।
-- তুমি অন্যায় টা করে ভালোই করেছো বাবা।
   আমি নিজে পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত হতে
   পেরেছি। সম্পর্কের মর্যাদা দিতে শিখেছি। তা
   না হলে আমিও হয়তো শুধু টাকার পিছনেই 
   ছুটতাম তোমার মতো।

আমাকে থামিয়ে দীশা বলল,
-- নৈরিত প্লিজ, এটা সঠিক সময় নয় এসব কথা
   বলার।
-- ওকে বলতে দাও বউমা। আমি তোমাকেও
   অনেক ছোট করেছি। তোমাদের কাছে ক্ষমা
   চাওয়ার ভাষা আমার নেই।
-- প্লিজ বাবা এভাবে বলবেন না। আমার বাবা
   নেই। আপনিই আমার বাবা। আপনি গুরুজন
   মানুষ যা ইচ্ছা বলতে পারেন। নিজের ছেলের
   ভালো কোথাও বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকাটা
   স্বাভাবিক ছিল। (দীশা)
-- ভালো কোথাও না। ছেলে যার সাথে ভালো
   থাকবে তার সাথেই বিয়ে দেওয়া উচিত। আমি
   অহংকারে বয়ে গেছি। জীবনের আসল মানে
   আমি পরিবার ভাঙনের পরে বুঝেছি। প্লিজ
   তোমরা ফিরে এসো বাড়িতে। আমাকে 
   বাকিটা সময় ছেলে, বউমা, নাতি নাতনির
   সাথে পরিপূর্ণ সময় কাটাতে দাও।
আমি বললাম,
-- তা আর হয় না বাবা।
মা আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বলল,
-- ছোট থেকে হাজারো ভুল তোমরা দুই ভাইও
   করেছো। আমরা ক্ষমা করেছি। আজ তোমার
   বাবা একটা ভুল করে কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য
   না?
ভাবী আমাদের বলল,
-- প্লিজ তোমরা ফিরে এসো। আমরা আমাদের
   বাচ্চাদের অন্তত পরিবারের সঠিক মানে
   বুঝাতে চাই। বাড়িতে সুখ-শান্তি খুশি চাই।
ভাইয়াও সঙ্গে যোগ করলো,
-- থাকবে না মানে। ওর ঘাড় থাকবে। খুব বড়
   মানুষ হয়েছিস না। বাড়ি থেকে বের হলে তোর
   ঠ্যাং ভেঙে দিবো একদম। 
   
আমার আর কিছুই বলার থাকলো না। সব রাগ অভিমান ত্যাগ করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। ফিরে এলাম সেই পুরোনো আবাসে। সংসার জীবন শুরু করলাম নতুন উদ্যমে। নিজ পরিবারের সাথে। আগামীকাল আমরা স্বপরিবারে দীশাদের গ্রামের বাড়ি ছুটি কাটাতে যাচ্ছি।

(সমাপ্তি)

গল্প: প্রাপ্তির পরিশেষে 
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post