আলো আঁধারের প্রেম - ভাগ্যিস বিয়ের তারিখটা ৬মাস পিছিয়েছিল - প্রেম ছোট গল্প
আলো আঁধারের প্রেম - ভাগ্যিস বিয়ের তারিখটা ৬মাস পিছিয়েছিল - প্রেম ছোট গল্প



আলো আঁধারের প্রেম - ভাগ্যিস বিয়ের তারিখটা ৬মাস পিছিয়েছিল

"ভাগ্যিস বিয়ের তারিখটা ৬মাস পিছিয়েছিল, নাহলে কী সর্বনাশটাই না হতো! বড় বাঁচা বেঁচে গেছে আমাদের শম্মী। ক্যান্সার রোগীকে বিয়ে করা মানে ওর সাথে সহমরণ মেনে নেওয়া।"

প্রায় আনন্দে গদগদ হয়ে বড় মামী কথাটা বললেন। উত্তেজনায় তার বুক উঠানামা করছে। যদিও এটা একটা ভয়াবহ দুঃসংবাদ এই বাড়ির লোকজনের কাছে। বাড়ির হবু জামাতা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে কারোই মুখে হাসি থাকার কথা না। বেশ বিরক্ত হয়েই শম্মী উঠে চলে গেল বেডরুমে। শম্মীর মা-বাবাও তার কথার সঙ্গে কোন তাল দিলেন না। বড় মামীর মুখে কিছুটা ক্রোধ দেখা দিল। তিনি ব্যক্তিগত গাড়ি করে এখানে এসেছেন , বড় বাড়ির মেয়ে, এই বাড়ির সবাই তাকে তোয়াজ করে চলে। 

তাই এখন তার কথাগুলোর মূল্যায়ন বা কোনো প্রতি উত্তর না করে তারা তাকে অপমান করেছেন। মুখ ভার করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বললেন, 'অন্যের ছেলের রোগের কথা জেনে কী আমি আনন্দ পেয়েছি! শুধু আমাদের শম্মী যে কী বিপদ থেকে মুক্ত পেল তাই বলছি!' তবুও কেউ কোনো উত্তর দিল না। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, 'বাড়িতে কাজ ফেলে এসেছি, আরেকদিন আসবো। আমি চললাম।' এই বলে হনহন করে চলে গেলেন তিনি তার মোটা শরীর ধোলাতে ধোলাতে। শম্মীর বাবা-মা কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না। কিছু মানুষ যে মানুষকে দুঃসংবাদ দিয়ে কী আনন্দ পায় কে জানে! সৌরভের ক্যান্সারের খবর লোক মারফত গত রাতেই জানতে পেরেছেন তারা। এরমধ্যে সব আত্মীয়রাই কল করে নিশ্চিত হয়েছে এটা সত্যি কিনা। কিন্তু যে মহিলা এই বাড়ির লোকদের ভয়াবহ খারাপ সময়ে একবার খোঁজও নেয় না তার এই বিষয়ে অতি উৎসাহ সহানুভূতি নাকি বিদ্রুপ বোঝা দায়। 

শম্মী বেডরুমে এসে চুপচাপ বসে আছে। খবরটা জানার পর থেকেই মনটা কেমন করছে অথচ এরমধ্যে একবারও সৌরভকে কল দিয়ে খোঁজ নেয়নি সে। এক আত্মীয় এর মাধ্যমে পারিবারিক ভাবে দেখাশোনা ও বিয়ে ঠিক করা হয় তাদের। সৌরভ দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত, ভালো বংশের। শম্মিও শিক্ষিত, রূপবতী মেয়ে। কারো তেমন কোনো আপত্তি ছিল না। তাদের বিয়ের তারিখ যখন প্রায় ঠিক হয়ে আসছিল তখন সৌরভ হঠাৎ জানায় বিয়ের তারিখ ৬ মাস পেছাতে হবে। 

তার এক মামা বিদেশ থাকেন। তাকে ছাড়া বিয়ের আয়োজন হতে পারে না। এতেও দেখা গেল দুই পরিবারের কোনো আপত্তি নেই। এরপর প্রায় ২মাস কেটে গেল। শম্মীর সাথে সৌরভের ফোনে কথা, ফেসবুকে চ্যাট, সামনাসামনি দেখা হওয়া চলছিল নিয়মিতই। শম্মী সৌরভ সম্পর্কে যত জানছিল তত কেমন যেন হতাশ হয়ে যাচ্ছিল। কেমন একটা বিতৃষ্ণা জাগছিল মনে ওকে নিয়ে। 

পুরুষের যে গুণটা শম্মীকে বেশি আকর্ষিত করে তা হলো ব্যক্তিত্ববোধ। সৌরভের ব্যক্তিত্ব খুবই সাদা-মাটা। সব সময় অন্যের উপর নির্ভর করে, যে কেউ তাকে যে কোনো কিছু করতে প্রভাবিত করতে পারে, যথেষ্ট সন্দেহ প্রবণ। নিজেকে বুদ্ধিমান প্রমান করতে অতিরিক্ত কথা বলে, যার অধিকাংশই ঘটনা কালবেঁধে অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক।  শম্মী মনে মনে সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়েই ফেলেছিল এই লোকটার সঙ্গে বাকিটা জীবন কাটানো অসম্ভব।

 বাবার সাথে কথা বলে বিয়েটা ভেঙে দেবে। পুরোপুরি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সে তখনও বিয়ে ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি। কারণ এটি অনেক জটিল। কিন্তু যেই মুহূর্তে গতকাল রাতে তার হবু ননদের ফোন থেকে জানতে পারে সৌরভের ক্যান্সারের কথা এক মুহূর্তের জন্য সব উল্টে-পাল্টে গেল। শম্মী এখন নিশ্চিত জানে এই বিয়ে ভেঙে দেয়া তার পক্ষে এখন অসম্ভব। যদিও এখনই এটা সবচেয়ে সহজ ছিল। কিন্তু ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত একজন মানুষকে সে কিছুতেই ছেড়ে চলে আসতে পারে না। দুনিয়ার কাছে যতটা ছোট হবে তারচেয়ে বেশি ছোট হবে সে নিজের কাছে। বিয়ে ভেঙে দেয়া যাবে না।

প্রথম বাইরে দেখা হওয়ার দিন সৌরভ তাকে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিল। শম্মীর ইচ্ছা ছিল বিয়ের পর ওটা পড়বে আর যদি বিয়ে ভেঙে দেয় সে কোনোদিনই ওটা ছুঁয়ে দেখবে না। ওই শাড়িটাই আলমারি থেকে বের করে পরলো, বেশ হালকা করে একটু সেজে নিল নিজের মতো। এরপর মাকে বলল, 'আমি একটু সৌরভের বাড়িতে চাচ্ছি।' তাকে এভাবে সেজে বের হতে দেখে তার বাবা-মা দুজনেই অবাক হলেন। কিন্তু কেউই কোনো অতিরিক্ত প্রশ্ন করলেন না।

শুধু সৌরভ না তার বাড়ির সবাই শম্মীকে হঠাৎ এভাবে আসতে দেখে অবাক হলেন। যে মেয়ে ক্যান্সারের খবর পেয়েও একবার কল দিয়ে সৌরভের খোঁজ নেয়নি সে মেয়ে হঠাৎ চলে আসবে এভাবে তা অভাবনীয়। সবাই হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানালো। সৌরভকে দেখে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। তার স্বভাবজাত লাজুক ভঙ্গিতে তাকে ড্রইং রুমে নিয়ে এল। অনেকক্ষণ সোফার দু'পাশে দুজন চুপচাপ বসে রইলো। কেউ কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছে না যেন। সৌরভই প্রথম কথা বলল, 'আমি কল দিব ভেবেছিলাম কিন্তু কেন যেন পেরে উঠলাম না।' 'বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই শরীর কিছুটা অস্বাভাবিক লাগছিল। এরমধ্যেই বাবার পরামর্শে চেকআপ করালাম। গতকাল বিকেলে রিপোর্ট পাই। ব্লাড ক্যান্সার। বেশ কিছু অপারেশন করতে হবে। দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। পুরোপুরি সুস্থ আর কখনই হতে পারবো না। মৃত্যুর ঝুঁকিও রয়েছে।' 

শম্মী মাথা নিচু করে নির্বাক হয়ে বসে আছে। সৌরভ একটা ফাইল এনে তার হাতে দিল। রিপোর্টের বিস্তারিত কথা-বার্তা নিজেই বিশ্লেষণ করে বলতে লাগলো। শম্মী শুধু হাত দিয়েই ফাইলটা ধরে আছে খুলে দেখার চেষ্টা করছে না, সৌরভের বকবকও কী তার কান দিয়ে যাচ্ছে! সেই একভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে। নিঃশব্দেও যে মানুষ কাঁদতে পারে, শম্মী এতক্ষণ বসে তাই করছিল তা অনেকটা সময় পর বুঝতে পারলো লোকটা। গলাটা কেঁপে উঠল। এগিয়ে একদম শম্মীর পাশে চলে এলো সে। আলতো করে মুখটা ধরে উঁচু করলো। 'একি তুমি কাঁদছ?' এতটা আবেগিত হতে শম্মীকে আগে দেখেনি সে। 

শম্মী নিজেকে সংযত করলো। বলল, 'আমার খুব খারাপ লাগছে।'

'আহা! নিয়তি কী কেউ বদলাতে পারে! তবে তোমাকে আমি এরমধ্যে জড়াবো এত নিষ্ঠুর আমি না। তুমি না আসলেও আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতাম। আমাদের মধ্যে যা ছিল তার ইতি টানার সময় এসেছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের খুব কাছে যারা থাকে তাদের অর্ধেক জীবন শুষে নেয় তারা। তোমার পুরো একটা সুন্দর জীবন পরে আছে। ভালো থেক। '

'তুমি শেষ বললেই সব শেষ হয়ে যাবে না। আমি কোথাও যাচ্ছি না। ঠিক করা দিনেই আমাদের বিয়ে হবে। তোমার সঙ্গে আমি যেভাবে জড়িয়েছি আমি নিজে চাইলেও তা থেকে মুক্তি পাব না। তোমার অসুখ , আমারও অসুখ।'

'তুমি বুঝতে পারছো না শম্মী, সামনে কী দুঃসময় আসতে চলেছে আমার জীবনে। পারলে আমি আমার পরিবারের মানুষদেরই দূরে সরিয়ে দিতাম। তোমার নতুন করে এই নরকে যোগ দেওয়ার কী মানে আছে! আমি দেখেছি ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে নারীদের কী দুর্বিষহ জীবন!'

কোনো তর্ক যুক্তিই শম্মীকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়াতে পারলো না। সে এই বিয়ে কিছুতেই ভাঙতে দেবে না। যে মেয়ে এমন দুঃসময়েও ছেড়ে যায় না তার চেয়ে ভরসাযোগ্য আর কে হতে পারে। সৌরভের পুরো পরিবারও এই মেয়েটার এই টান দেখে মুগ্ধ হলো। 

 দুই পরিবার এবং  ওদের দুইজনের সম্পর্ক একেবারে স্বাভাবিক হয়ে এল আগের মতো। শম্মীর সৌরভকে নিয়ে থাকা বিভ্রান্তি অনেক আগেই দূর হয়ে গেছে, সে এখন শুধু জানে আমৃত্যু সে তাকে ছাড়তে পারবে না। তার অনেক আত্মীয় পরিজন অবাক হয় তার এমন সিদ্ধান্তে। নানান সদুপদেশ তারা দিন রাত শম্মী ও তার বাবা-মাকে দিতে থাকে। কত সুন্দর নতুন জীবন সে আলাদা হলে পেতে পারে! তবে শম্মীর বাবা-মায়ের মনে হয়েছিল শম্মী ঠিক জায়গাতেই আছে। তারা তাকে আটকায় না।

এরপর প্রায় একমাস কেটে গেল। শহরের একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে সৌরভ আর শম্মী। অনেকক্ষণ টুকটাক কথা বলার পর সৌরভ কেমন আমতা আমতা করতে লাগলো। শম্মী বিরক্ত হয়ে বলল, 'সমস্যা কী তোমার?'

'ইয়ে মানে, এমনি একটা কথা বলার ছিল। তুমি ভয়ানক রাগ করবে কিনা বুঝতে পারছি না। রাগ করে চলে যাবে না বল?'

'ঢং রাখো।'

'বিয়ের তারিখটা আগাতে হবে। সামনের মাসের ১৪ তারিখে বিয়ে হবে আমাদের।'

'বাবা! এই সৎবুদ্ধি হঠাৎ! মামা বুঝি আগেই ছুটি পেয়ে গেল!'

'আসলে আমার কোনো মামা নেই।'

'মানে?'

'তুমি নিশ্চই খেয়াল করছো এখন পর্যন্ত কোনো মেডিকেল চেকআপে তোমাকে আমি নিয়ে যাইনি। আর গত এক মাসে আমার চেহারারও তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।' 

শম্মী কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল। এতক্ষণ হালকা ভাবে নিলেও সৌরভের কথা কোন দিকে যাচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। "তোমার কথার অর্থ অপরিস্কার।"

"প্লিজ রাগ করো না। আমি আসলে খুবই সুস্থ একজন মানুষ। আমার কোনো ব্লাড ক্যান্সার নেই। আমার এক বন্ধুর পরামর্শে এমনটা করেছিলাম। সে বলেছিল , আজকালকার মেয়েরা সামান্য একটু বিপদ দেখলেই নাকি সংসার থেকে পালিয়ে যায়। তার সাথে এক প্রকার বাজি ধরেই এই মিথ্যা কথাটা আমাকে বলতে হয়। পরিবারের সবাইকেও রাজি করিয়েছিলাম অভিনয় করতে। আমি নিজেই এইসবের জন্য অনুশোচনায় ভুগছি। শুধু শুধু তোমার আবেগ নিয়ে........"

আর একটা কথাও কান দিয়ে প্রবেশ করলো না শম্মীর। মেঘের কালছায়া তার মুখকে ঢেকে ফেলল যেন। মাথায় বজ্রপাত হলো বুঝি। মাথা ভনভন করতে লাগলো। একমুহূর্তের জন্য নিজেকে একটা খেলনার পুতুল মনে হতে লাগলো তার। মিথ্যা! ছলনা! বিশ্বাসের পরীক্ষা! একজন ব্যক্তিত্ব বিকাশহীন শিশুর খেলনার বাক্সে আটকে থাকা পুতুল যেন সে। মরণাপন্ন ক্যান্সারে আক্রান্ত জেনেও সে একজন মানুষকে ছেড়ে যায়নি, তার এই অহংকারটা এক মুহূর্তে যেন ধুলায় পরিণত করে দিল কেউ। একবার ভাল করে তাকালো সৌরভের দিকে। বুঝল মজা করে কিছু বলেনি ও। এতদিন রোগের সবটা অভিনয় ছিল। চারপাশে তাকালো একবার। মনে হলো, সবাই ওর দিকে তাকিয়ে উপহাস করছে। রাগে মুখটা শক্ত হয়ে এলো তার। কাটা কাটা কণ্ঠে একবার বলল, 'আমি পাস করেছিতো, না?'

মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে সৌরভের, এমন আঘাত মেয়েটা পেতে পারে বুঝতে পারেনি সে। মুখ জমে গিয়ে কোনো শব্দই বাহির হতে দিচ্ছে না। শম্মীর চোখ দুটো ঠাণ্ডা হলো,বলল, 'গরম লাগছে। আমি বাড়িতে যাব।' এসি চলছে, সৌরভ বলল, 'আমি পৌঁছে দিচ্ছি।' 'না, আমি যাচ্ছি।' বলেই সৌরভকে স্তম্ভিত ভাবে বসিয়ে রেখে চলে গেল সে। সৌরভ কিছুতেই কিছু ভেবে পায় না, অন্যায় সে করেছে ঠিক। কিন্তু তার যে ক্যান্সার হয়নি এতে কী মেয়েটার খুশি হওয়ার কথা ছিল না?  মেয়েটা কী শুধু দায়িত্ববোধ থেকে এতদিন তার সাথে ছিল , তাকে কী ভালোবাসেনি! হয়তো অভিমান করে চলে গেল, অভিমান কেটে যাবে। 

শম্মীর অভিমান কাটেনি। প্রায় ৬ মাস কেটে গেল। এরমধ্যে সৌরভের, তার পরিবারের অনেক অনুরোধের পরেও একবারও যোগাযোগ করেনি সে সৌরভের সাথে।  সবাই অবাক হলো। কেউ এই মেয়েটাকে বুঝতে পারলো না। যে মেয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত জেনে একজন মানুষকে ছাড়তে চায়নি সে মেয়ে ছেলেটার শুধু মিথ্যা ছল, পরীক্ষার জন্যই ক্ষেপে উঠতে পারে। তাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে পারে! ব্যক্তিত্ববোধে আঘাত, একজন মানুষকে কী এতটাই শক্ত করে ফেলে! সৌরভের কাছে আর কখনো ফেরেনি শম্মী। শুধু শেষ একবার ফোনে কথা বলে সম্পর্কটার ইতি টেনে ছিল। তার শেষ কথাগুলো অনেকটা এমন ছিল, 'আপনাকে (!) পুনর্বার মেয়ে দেখার আগে নিজের রোগের কথা বলে কোনো মেয়ে আপনার বিপদের দিনে থাকবে কিনা পরীক্ষা করতে হবে না। আপনি অন্ধ বিশ্বাসে তাদের যে কাউকে বিয়ে করতে পারেন, আমি কথা দিতে পারি আপনার অসুখের কথা শুনে তারা কেউই পালিয়ে যাবে না। একটু হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবেন শত, হাজার অসুস্থ, জড় পুরুষেরা সেখানে পড়ে আছে, তারা কেউই একাকী নেই, দিন রাত তাদের নিয়ে যুদ্ধ করে বেড়ায় আমার মতো কেউ না কেউ, তাদের কাউকেই কিন্তু পরীক্ষা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করতে হয়নি। আমি হয়তো চাইলে আপনার এই কাজটাকে ছোট করে দেখে ক্ষমা করতে পারতাম। কিন্তু কেন যে সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আপনার জন্য মনে এতটা বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়েছিল কেন যে এতদিনেও তা কাটিয়ে উঠতে পারিনি তা আমার বোধের বাইরে। আপনি ভালো থাকুন। সুখী হন।" তাদের গল্প এখানেই শেষ। এরপর আর কোনোদিন যোগাযোগ হয়নি তাদের।

অনেক বছর পর। 

অপারেশন থিয়েটারের বেডে শুয়ে আছে শম্মী। লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত সে। বিয়ের ৬ মাস পরেই ধরা পড়ে রোগটা। পারিবারিক পছন্দেই আফসারের সাথে বিয়ে হয় তার। আফসারের পরিবারের সবাই মুষড়ে পড়ে। আত্মীয়-স্বজনরা বোঝানোর চেষ্টা করে পুরো জীবন পরে আছে সামনে। মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে। নতুন করে বিয়ে করে আবার জীবন শুরু করতে। আফসারের ভালো চেয়ে অনুরোধটা শম্মীও তাকে করে। কিন্তু না সে কারো কথা শোনার পক্ষেই না। এরপরের দীর্ঘ ছয় বছর যুদ্ধ করেছে শম্মীর সঙ্গে মিলে। এক মুহূর্তের জন্যও মনোবল হারাতে দেয়নি। সব অপারেশন, অসুস্থতার দিনগুলোতে ছায়ার মতো পাশে ছিল সে।

 শম্মী, আফসার আর অপারেশনের সার্জন সবাই জানে শম্মী জীবনের শেষ কয়েক মুহূর্ত বাচছে এখন। তবুও শম্মীর চোখে  কত আশা, যে তার অর্ধেক আয়ু তাকে দিয়ে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে সেই মানুষটার সাথে কী আর কিছু দিন বেশি বাঁচা যায় না , শম্মীর কথা বলার শক্তি নেই ওর কথাগুলো আফসার নিজেই বলে দিচ্ছ, সে সুস্থ হয়ে এখান থেকে বের হলে এর পরের জীবনটুকু কী সুন্দর করেই না কাটাবে তারা এই আশ্বাস-গল্প করে যাচ্ছে সে। সার্জন অবাক হয়ে দুজন নর-নারীর চোখে ভাসা স্বপ আর ঝরে পড়া অশ্রুর দিকে তাকিয়ে আছেন। জগৎতো টিকেই আছে আশ্চর্য্যের উপর। আরেকটা আশ্চর্য্যের ঘটনা কী এখানে ঘটতে পারে না! হয়তো ঘটবে হয়তো না! কী শক্তি এদের এই অনুভূতিকে এভাবে একত্রে বেঁধে রাখে! (সমাপ্ত)

আলো আঁধারের প্রেম

লেখা: Masud Rana

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post