জীবনের গল্প: বউয়ের শপিং Shopping jibonir golpo
জীবনের গল্প: বউয়ের শপিং Shopping jibonir golpo


বিয়ে করেছি কয়েকমাস আগে। বেশ ভালোই তালগোলে সংসারের খেলা চলছে। রমজান মাস কাটাচ্ছি একসাথে আল্লাহর রহমতে। অনেকগুলো রোজাও পার হয়ে গেছে। কিন্তু এবার শুরু হবে বউয়ের আসল খেলা যে ভয়ে আমি এতদিন ছিলাম। কারণ এবার তার ঈদের শপিং করার পালা। এখন পর্যন্ত বউ শপিং নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেনি কানের কাছে। তবে আমার নিজের মা খুব উঠে পড়ে লেগেছে আমাকে ফকির করার জন্য। বারবার বলছে বউমাকে নিয়ে শপিং এ যা। আমিও এই সেই বাহানা দিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছি। 

না, আমার টাকাপয়সার অভাব নাই। কিন্তু আমার পূর্বপুরুষ আর বন্ধুমহলে তাদের বউয়ের শপিং এর ইতিহাস নিয়ে যা গল্প শুনেছি তাতে আমার বউ শপিং এর জন্য যে আমাকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলাবে না তার কোনো ভরসা নাই। 
আমিও একটু কিপটা মানুষ আছি। ঠিকই পারতাম সারাজীবন একা থাকতে কিন্তু বাড়ির লোক ধরে বেঁধে বিয়েটা দিয়েই দিল। বিয়ের দিনে একবার ভাবলাম পালিয়ে যাবো নাকি। কিন্তু আমার খাটাশ বন্ধুগুলো আমাকে পালাতে দিল না। তারা বলল, " আমরা যে অশান্তি সহ্য করে চলছি তোকেও চলতে হবে। "
অতঃপর বিয়েটা করেই ফেললাম। 

রাতে শুয়ে শুয়ে টিভিতে খবর দেখছিলাম।  বউকে জিজ্ঞেস করলাম,
-- কবে শপিং করতে যাবা?
-- আপনি যেদিন ফ্রি থাকবেন।
ঠোঁটে মুচকি হাসি লাগিয়ে রেখে মনে মনে ভাবলাম, "এখন তো ভালোমানুষ সাজবাই। মুখের কত সুন্দর মিষ্টি বুলি। আহা ! এসব আমার টাকা ফুরানোর ধান্দা। আমি কি কিছু বুঝিনা। "
তারপরে বললাম,
-- চলো, কাল অফিস ছুটি আছে। কাল যাবো। 
-- আচ্ছা ঠিক আছে।
টাকা তো এমনিও ফুরাবেই। যা হবার আগেই হোক। 

পরের দিন সন্ধ্যায় ইফতার করে ভয়ে ভয়ে শপিংয়ের উদ্দেশ্যে বের হলাম। বউয়ের দেখছি তেমন কোন বায়নাই নাই। সে আমার মায়ের জন্য একটা সুন্দর শাড়ি কিনলো। মন মানসিকতা বেশ ভালোই আছে দেখছি। শাশুড়ির জন্যও সেম একটা অন্য রঙের শাড়ি কিনে দিলাম। তারপরে সে আমাকে এখানকার বেশ জনপ্রিয় শপ ফড়িং এ নিয়ে গেল। সেখানকার জিনিসপত্রের দামেও ফড়িং এর মতো পাখা। কত টাকা যে ফুরাবে এবার আল্লাহ্ই ভালো জানে। মনে মনে দোয়া করছি, " আল্লাহ্ বাঁচাও। "
আমাকে অবাক করে সে আমার বোনের জন্য একটা থ্রিপিস নিলো। নিজের জন্য কিছুই নিলো না। 
এবার ওয়ে টু নিউমার্কেট। নিউমার্কেটে জিনিসপত্রের যা চওড়া দাম। রিচম্যানের শোরুমের সামনে নামলাম। আমি বারবার এসে রিচম্যানের দরজা দিয়ে ঘুরে যাই টাকা বেশি ফুরাবো না বলে। কষ্ট হয় মনে। হোক। আমি রাস্তা পার হয়ে ব্যাক করার সময় ইজি থেকে শপিং করা লোক। কারণ সেখানে প্রাইস রিজনেবল। বউয়ের আমাকে আজ রিচম্যানে আনার উদ্দেশ্য বুঝলাম না। জিজ্ঞেস করলাম,
-- এখানে কেন আমরা?
সে কোন উত্তর দিচ্ছে না। ঘুরে ঘুরে একটা পাঞ্জাবী এনে আমার গায়ে ধরে বলল,
-- এটা আপনাকে দারুণ মানাচ্ছে। 
আসলেই বউয়ের চয়েস ভালো। পাঞ্জাবীটা সুন্দর। পাঞ্জবীটা হাতে নিয়ে প্রাইস ট্যাগ দেখে আমার হার্ট অ্যাটাক করার উপক্রম হলো। ভাববেন না ইফতারে বেশি খেয়ে ফেলেছি বলে হার্ট অ্যাটাক হতে যাচ্ছে। পাঞ্জাবীর দাম চার হাজার দুইশত নিরানব্বই টাকা। আমি তো আমার বিয়ের পাঞ্জাবীও কম দামে কিনতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার দুলাভাই জোর করে ভালো পাঞ্জবী কিনাইছিল। মুখটা কাচুমাচু করে বউকে বললাম,
-- এই পাঞ্জবীটা একটু কেমন যেন না? আমাকে
   কি মানাবে?
-- এটা আপনার জন্য গিফট। 

ওহ, বলতে ভুলে গেছি। আমার শ্বশুরমশাই আমাকে ঈদের শপিং এর জন্য দশ হাজার টাকা উপহার দিয়ে গেছে। যদিও নিতে চাই নি। এসব লোভ আমার নাই। তারপরেও বিয়ের পরে প্রথম ঈদ বলে জোরপূর্বক দিয়ে গেছে। সেই টাকা থেকেই তাদের মেয়ে এখন আমাকে পাঞ্জাবীটা কিনে দিচ্ছে। দিক, আমার কি ! আমার টাকা তো না। খুশিতে বললাম,
-- আচ্ছা নাও। এটাই সুন্দর। 
বউ আবারো মুচকি হাসলো। হাসির রহস্য সামনে আসিতেছে বৎস। আমার পছন্দে একটা শার্ট কিনলাম ইজি থেকে। বাড়ির সবার কেনাকাটা শেষ। বউ এখনো নিজের জন্য কিছুই কিনে নি। কিনতে শুরু করলে অনেক সময় চলে যাবে। তাই ফর্মালিটি করে বললাম,
-- তোমার জিনিসপত্র কখন কিনবা?
-- আমার তেমন কিছুই লাগবে না। 
মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। তারপরেও কিছু কিনে দিতে হবে নাহলে বাড়ি গেলে আমাকে জন্মদানকারী বাবা মাও আমার শত্রু হয়ে যাবে। তাই বললাম,
-- চলো তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দিই।
   আমার খুব ইচ্ছা তোমাকে একটা নীল শাড়ি
   কিনে দেওয়ার। 
-- আচ্ছা চলেন। 
সে শাড়ির দোকানে গিয়ে বলল,
-- আপনার যেটা ইচ্ছা হয় সেটা কিনে দেন।
বাহ্! এত ভালো বউ আমার। আমি দেখি খুবই লাকি। শেষে কিনা আমার বন্ধুর বউগুলোই জল্লাদ হলো। মরুক শালারা !
পছন্দ করে একটা নীল শাড়ি কিনে দিলাম। প্রাইসটা গোপনই থাক। আর অ্যাপেক্স থেকে একজোড়া জুতা। শাড়ি পরে তো বউয়ের খালি পায়ে হাটা মানাবে না। যদিও পায়ে আলতা পরে নূপুর পরলে নাকি মেয়েদের দারুণ লাগে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকেরা বলে গেছেন। 

শপিং শেষ করে বাড়ি এসে শান্তির ঘুম দিয়েছি। অনেক টাকা সেভ করেছে আমার বউ। এভাবে চলতে থাকলে সুইস ব্যাংকে আমার একটা অ্যাকাউন্ট থাকবে ভবিষ্যতে। যদিও বাড়ি এসে আমার মা আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছিলেন। আমি না দেখার ভান করেছি। 

বেশ সুখে দিন কাটছে। একের পর এক রোজা চলে গেল। আজ ত্রিশ তম রোজা সম্পন্ন হলো অর্থাৎ চাঁদরাত। ইফতারে একগাদা খাবার খেয়ে পেটটাকে ঢোল বানিয়ে ফেলেছি। পাঁচ মিনিটের জন্য ছাঁদে গেলাম হাটতে। এসে দেখি আমার বউ সেজেগুজে রেডি হয়ে বসে আছে। আমাকে আসতে দেখে হাতে একটা টি-শার্ট ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-- ধরুন, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নেন।
-- এই ভর সন্ধ্যায় আমরা কোথায় যাচ্ছি?
-- চলেন একটু বাইরে বাতাস খেয়ে আসি। 
-- ছাদে তো অনেক বাতাস।
-- আপনি কি যাবেন?
-- আচ্ছা চলো নদীর পাড়ে যাই।
বউ সচরাচর কোনো আবদার করে না। আর এত লক্ষি বউ পেয়েছি তাই আজ না করতে পারলাম না। রেডি হচ্ছিলাম দেখলাম সে আলমারী খুলে কি যেন বের করলো। গুরুত্ব দিলাম না। ওর কোন সাজগোজের জিনিস হতে পারে। 

বাড়ি থেকে বের হয়ে রিকশা নিলাম পদ্মার পাড়ে যাবো বলে। জিরো পয়েন্টে এসে বউ রিকশাওয়ালাকে বলল,
-- মামা কুমারপাড়া চলেন।
-- মানে কি? আমরা না নদীর পাড়ে যাচ্ছিলাম?
-- হ্যা ঐদিক দিয়েও ঘুরে যাওয়া যায়।
রিকশাওয়ালা বলল,
-- মামা ঠিকঠাক বলেন কোনদিক যাবেন?
রাস্তায় তর্কাতর্কিতে না জড়িয়ে মামাকে বললাম, 
-- চলেন কুমারপাড়া হয়ে।

বউ রিকশা সাইডে দাঁড়াতে বলল। আমি শুধু ওর কান্ড দেখছি। সামান্য দূরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। রাতে তো টিসিবির পন্য দেয় না। এত মানুষ এখানে কি করছে বুঝি না। একটু সামনে যেতেই মনে হলো আমার কাছে আজরাইল চলে এসেছে। হায় আল্লাহ্, আমি তো ভুলেই গেছিলাম কয়েকদিন আগে আড়ং এর শোরুম দিয়েছে রাজশাহীতে। এতো বড় ভুল আমি কিভাবে করতে পারলাম। ছিঃ! বউ আমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে বলল,
-- আপনি বাতাস খান। আমি দশ পনেরো
   মিনিটে আসছি। 

দুই ঘন্টা হলো আমি বাতাস খাচ্ছি আর টাকা জলাঞ্জলির টেনশনে আমার শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। বারবার উকি দিচ্ছি। এখানে আমি না আমার মতো অসংখ্য নিরীহ প্রাণী বাতাস খাচ্ছে। কেউ একা বাতাস খাচ্ছে, কেউ বাচ্চা কোলে নিয়ে বাতাস খাচ্ছে, কেউ বা শপিং ব্যাগ হাতে আরো ব্যাগ আসার অপেক্ষায় বাতাস খাচ্ছে। বসে থাকতে থাকতে আমার বন্ধু রাফির সাথে দেখা। রাফি উৎফুল্ল হাসিতে বলল,
-- কিরে মাম্মা কখন আসছিস? 
-- এইতো কিছুক্ষণ। তুই এখানে?
-- আর কইস না। দুই ঘন্টা আগে আসছি।
   আমার বউয়ের রাত বারোটাও বাজতে পারে
   সেই ভেবে নদীর ধারে একটু বাতাস খেয়ে
   আসলাম। এখনো দেখি ডাইনি মহিলার শপিং
   শেষ হয় নি। কাল সকালে ঈদের জামাত মিস
   করাবে নাকি আল্লাহই জানে। থাম একটু
   ভেতরে চেক করে আসি।
এই ফাঁকে আমার বউ বাইরে এসে বলল,
-- একটু ভেতরে আসবেন?
বুঝলাম সে আমাকে ব্যাগ ধরার জন্য ডাকতেছে। গুনে গুনে বারোটা ব্যাগ। দুইহাতে শক্তিমানের মতো ব্যাগগুলো তুলে রিকশা নিলাম। রিকশাতে খানিকটা রাস্তা এসে বউ বলল,
-- নদীর পাড়ে যাবেন?
অসম্মতিসূচক এঙ্গেলে মাথা নাড়িয়ে জানালাম,
-- না।
বিড়বিড় করে বললাম, "অনেক নদী দেখাইলা আজ, এ জন্মে তো আর না।"

বাড়ি ফিরে সে ওয়াশরুমে গেছে। আমি দ্রুত আলমারীটা খুলে চেক করলাম। গতকাল বেতন তুলেছি সেগুলো অক্ষত আছে কি না। আলহামদুলিল্লাহ বেতন জায়গামতোই আছে। তাহলে এই মেয়ে এত টাকা পেল কোথায়? 
সহসা মাথায় অন্য কিছু খেলে গেল। ড্রয়ার চেক করে দেখলাম আমার ক্রেডিট কার্ড নাই। তারপরে পুরোনো একটা ইতিহাস মনে পড়ে গেল। বিয়ের প্রথমদিকে খুব আনন্দঘন মুহুূর্তে একদিন বউকে বলেছিলাম, "তোমার কোনকিছু দরকার হলে কার্ড ইউজ করো। "
নিজের কবর নিজেই খুুঁড়েছিলাম সে জাস্ট আজ মাটি চাপা দিয়েছে, আর কিছু না। 

ফ্রেশ হয়ে এসে বউ তার পার্স থেকে কার্ড বের করে আমাকে দিল। হাতে নিয়ে কার্ড জানালা দিয়ে ফেলে দিবো নাকি তাই ভাবলাম। কারণ ভেতর তো ফাঁকা। লাইট অফ করে একটু শুয়েছি। বউ লাইট অন করে বলল,
-- একটু উঠেন তো। 
উঠলাম। সে তার মহামূল্যবান শপিং ব্যাগগুলো তুলে খাটের ওপর রাখলো। একটা একটা করে জিনিস বের করছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। আমি পাশ থেকে আড়চোখে দাম দেখার চেষ্টা করছি। আল্লাহ মাবুদ, ছোট ছোট জিনিস এত্ত দাম দিয়ে কিনছে পাগলি মেয়েটা। সরি, শেয়ানা মেয়ে। 
একে তো খুব টায়ার্ড হয়ে আছি তারপরে ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে মহারানীর জিনিসপত্র গুছাতে রাত পার হয়ে যাবে। না ঘুমালে কাল সত্যিই ঈদ জামাত মিস। সোফায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করেছি জাস্ট, বউ কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
-- আপনার মতো কিপটা লোককে সোজা করার
   কৌশল আমার ভালোই জানা আছে। আপনি
   নাচবেন তো ঠিকই কিন্তু শুধু আমার ইশারায়। 

আপসোস, আমার আর সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট হলো না। 

(সমাপ্তি) 

গল্প: বউয়ের শপিং
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post