জীবনের গল্প - হাসপাতালের অভিজ্ঞতা. Hospital hd free pic, Hospital golpo in Bengali obohelajibon jpg
জীবনের গল্প - হাসপাতালের অভিজ্ঞতা


হাসপাতালের বেডে সিট পায়নি দেখে এক কলেরা আক্রান্ত বাচ্চাকে নিয়ে বারান্দায় বসে আছে এক মা। প্রায় সবসময়ই হাসপাতালের এই ইউনিট রোগীতে ভর্তি থাকে। আর তার বেশিরভাগই শিশু। মহিলার পোশাকাশাক দেখে বেশ দরিদ্র পরিবারের মনে হচ্ছে। উনি বেশ ঘাবড়ে আছেন। উনার বাচ্চাটা হতে পারে দেড় কি দুই বছর বয়সী। 

এই ইউনিটের নাইট ডিউটিতে আছে ইন্টার্ন ডাক্তার শিরিন শারমীন। তিনি জানালা দিয়ে বারবার মহিলার অবস্থা লক্ষ্য করছেন। ট্রলি দিয়ে রোগী পারাপারের জন্য আগাম সতর্কতা স্বরূপ গার্ড আর আয়া ধমকে মহিলাটিকে রাস্তা থেকে উঠে যেতে বললেন। মহিলার সাথে আর কেউ নেই। আর সেই সময় বাচ্চাটার শরীরে স্যালাইন চলছে। স্যালাইনটা বাইরের গ্রিলের সাথে ঝোলানো। আয়া আবার ধমকে বললেন,
-- আপনাকে বলছি না উঠে যেতে।
মহিলাটি তখন ভয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন,
-- আপা বাচ্চার স্যালাইন চলে আর কোথাও
   তো জায়গা খালি নাই। কই যামু?
-- তা আমি কি জানি। রাস্তায় চলাচলের
   অসুবিধা হচ্ছে উঠে যান। 
পাশেই একটা নার্সকে যেতে দেখে মহিলাটা বলল,
-- আপা স্যালাইনডা একটু খুইলা দেন তো।
   আমারে উঠতে হইবো অন্য জায়গায়। 
 -- আমার সময় নাই এখন স্যালাইন খোলার। 
বলে নার্স ওয়ার্ডের ভেতরে চলে গেল। অথচ নার্সটি রুমে ঢুকে দিব্যি অন্য নার্সদের সাথে বসে আড্ডায় যোগদান করলো। 

গত রাতে মহিলাটার পাশে আরেকজন রোগী এসেছে। মোটামুটি ধনী পরিবারের লোক। কিন্তু তাদের বাচ্চার কন্ডিশন সিরিয়াস হওয়ায় ক্লিনিক থেকে তাদের সরকারি হাসপাতালে রেফার করেছে। তারাও সিট পায় নি। তাদের সাথে একজন বিশ বাইশ বয়সী মেয়ে এসেছে। তার নাম রিতু। কাল থেকে এসে চার-পাঁচবার বারান্দা থেকে উঠতে হয়েছে তাদেরও। তার ওপরে আজ রাতে পাশের মহিলার সাথে আয়ার বাজে ব্যবহার দেখে রিতুর মেজাজ চটে গেল। সে চেঁচিয়ে বলল,
-- আচ্ছা, আমরা কোথায় যাবো? একবার
  বলছেন ডান পাশে যান, আবার বলছেন বাম
  পাশে যান। আমরা কি এখানে শখে এসেছি
  নাকি রোগী নিয়ে এসেছি। দেখছেন তো
  বাচ্চাদের অবস্থা খারাপ।
এ নিয়ে আয়ার সাথে রিতুর একপ্রকার তর্ক বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। 

হাসপাতালটা যেন নার্স, আয়াদের রাজত্বে। ডাক্তারদের দেখলে মনে হয় ওরাই সাধারণ কর্মী আর আয়া, নার্স, গার্ডদের আচরণ দেখলে মনে হয় তারাই ডাক্তার, তারাই হাসপাতালের মালিক। মুখে একসময় ভালো ব্যবহার বলতে নেই। ভেতর থেকে সবটা ফলো করছেন ডা. শিরিন। এবার তিনি বাইরে এসে আয়াকে জিজ্ঞেস করলেন,
-- কি সমস্যা এখানে?
-- দেখুন ম্যাডাম কখন থেকে উঠতে বলছি
   উঠছে না। (আয়া)
ডাক্তারকে বেরিয়ে আসতে দেখে মহিলাটি আরো ঘাবড়ে গেল। ডা. শিরিন আয়াকে বললেন,
-- আচ্ছা আমি অনেকক্ষণ থেকে আপনার
   আচরণ লক্ষ্য করছি আপনি এই মহিলাকে
   ধমকাচ্ছেন। 
-- ম্যাডাম...
আয়াকে থামিয়ে ডা. শিরিন ঘড়ি দেখে বলল,
-- এখন বাজে রাত দেড়টা। এখন কি ট্রলি
   পারাপারের কোন ইমারজেন্সি আছে?
আয়া আমতা আমতা করে বলল,
-- না ম্যাডাম। (আয়া)
-- তাহলে আপনি যে উনাকে উঠতে বলছেন
   উনি উঠে যাবেটা কোথায়? আশেপাশে কি
   কোথাও খালি জায়গা আপনার চোখে পড়ে?
   জবাব দিন।
-- মানে ম্যাডাম...
ডাক্তার শিরিন ওয়ার্ডের সব নার্স আয়াদের অ্যাটেনশন চেয়ে একত্রে হাজির করলেন। তারপর বললেন,
-- এইযে আপনারা কখন কিভাবে ডিউটি করে
   আসছেন আমার জানা নেই। আমি জানতেও
   চাই না। কিন্তু আমি যতদিন এখানে ডিউটিতে
   আছি ততদিন আপনাদের কাউকে যেন কোন
   রোগীর সাথে দূর্ব্যবহার না করতে দেখি।
   আদারওয়াইজ আমি কমপ্লেইন করবো
   বিভাগীয় প্রধানের কাছে। সরকার আপনাদের
   টাকা দিয়ে এখানে মুখ দেখতে বা আড্ডা
   দিতে রাখে নি। রোগীর কখন কি দরকার
   সেটা যদি না দেখেন তাহলে ব্যবস্থা আমাদের
   জানা আছে। মাথায় রাখবেন। যে যার কাজে
   অ্যালার্ট হোন। আমার আন্ডারে কোন
   ডিসিপ্লিন ব্রেক আমি টলারেট করবো না। 
ডাক্তারের কড়া নির্দেশ শুনে নার্স আয়ারা যে যার মতো কাজে লেগে পড়লো।

তারপরে ডাক্তার শিরিন ঐ মহিলার কাছে এসে বললেন,
-- আপনি ঠিক আছেন?
-- হ ম্যাডাম।
-- কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন। 
বলে ডা. শিরিন ওয়ার্ডের ভেতরে চলে গেল।

হাসপাতালের পরপর দুই নির্ঘুম রাত কাটছে রিতুর। সে এসেছে তার ভাই ভাবীর সাথে ভাতিজার অসুস্থতার জন্য। হাসপাতালে বসে রাত কাটানো কঠিন বিষয়গুলোর একটি। গত রাতে যেই দু-একবার ওর চোখ লেগে আসছিল, মানুষের কান্নাকাটিতে ঘুম ভেঙে গেছে। গত রাতে দুইটা ছোট বাচ্চা মারা গেছে। তার মধ্যে একটা বাচ্চা রিতুদের সাথে বারান্দাতেই ছিল। বাচ্চাটা একমাস বয়সী। জন্মের সময় তার মা মারা গেছে। নানী আর খালা সেই অসুস্থ বাচ্চাটাকে সঙ্গে করে এনেছিল। কিন্তু ছোট্ট বাচ্চাটিকেও বাঁচানো গেল না। শুনে রিতুর চোখে জল চলে আসে। ভয়ে, চিন্তায় রাতটা আরো দীর্ঘ হতে থাকে। হাসপাতালে পাইচারি করে রাত কেটেছে রিতুর। আর হাসপাতালে কখন দিন কখন রাত বাইরে না তাকালে বোঝার উপায় নেই। সবসময় কথাবার্তা, চিৎকার চেঁচামেচি, কান্নাকাটিতে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ। আর ভোর ভোর থাকতেই শুরু হয়ে যায় হাজারো কাকের মিছিল। 

গতকাল রাতে রিতুর ভাই তাদের সাথে ছিল কিন্তু আজ বাচ্চার অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ায় আজ তার ভাই রাতে বাড়ি গিয়েছে। আজ সারাদিন তার অফিসের চাপ আবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালে ছিল। তাই রেস্ট করতে বাড়িতে গিয়েছে।
রিতু পাশে বসা সেই মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করলো,
-- আপনার বাড়ি কোথায়?
-- আমি নওগা থাইকা আসছি।
-- আপনার সাথে আর কেউ আসে নি?
-- আমার স্বামী আসছে। সে বাইরের বারান্দায়
   শুইছে।
-- আপনার স্বামী কি করে?
-- সে ভ্যান চালায়।
-- এখানে কতদিন থেকে আছেন?
-- আজ চারদিন।
-- হাসপাতালের খাবার খাচ্ছেন?
-- হ।
রিতু আর কিছুই বলল না।

সকালে রিতুর বাড়ি থেকে অনেক রকমের খাবার এনেছে বাড়ির লোক। এছাড়া আত্মীয়রা বাচ্চা দেখতে এসে অনেক খাবার দিয়ে গেছে। রিতুর ভাবী বলল,
-- এতো খাবার কে খাবে? আমরা তো এখানে
   তেমন খেতেই পারছিনা। খাবারগুলো শুধু শুধু
   নষ্ট হবে। 
হাসপাতালে সকালের খাবার হিসেবে পাউরুটি, কলা আর একটা ডিম দিচ্ছে। পাশের মহিলাটি হাসপাতালের খাবার নিল। তার স্বামী পাশে বসে ছিল। মহিলাটি তার স্বামীকে খাবারটা খেতে বললেন। খাবারটা দুইজন মানুষের জন্য খুবই অল্প কারণ রোগীর সাথে যেকোন একজনের খাবার দেওয়া হয়। রিতুর নজরে ব্যাপারটা এলো। রিতু তার ভাবীর কানে কানে বলল,
-- ভাবী পাশের উনারা অনেক দূর থেকে
   এসেছে। চারদিন হলো হাসপাতালের খাবার
   খাচ্ছে। আমাদের খাবার তো অনেক বেঁচে
   যাবে। উনাদের যদি আগেই খানিকটা দিয়ে
   দি?
-- হ্যা হ্যা অবশ্যই। কিন্তু উনারা যদি কিছু মনে
   করে?
-- করবে না। 

রিতু মহিলাটিকে বললো,
-- আমাদের জন্য বাড়ি থেকে অনেক খাবার
   পাঠিয়েছে। আপনারা যদি কিছু মনে না
   করেন আমাদের খাবারগুলো খান।
মহিলার স্বামী বেশ ইতস্ততভাবে বললেন,
-- আমরা ক্যামনে আপনাদের খাবার খাই?
-- দেখুন লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এখানে
   আমরা সবাই বিপদে পড়ে এসেছি। আমরা
   যদি একে অপরের প্রয়োজনে আসি তাতে
   ক্ষতি কি?
রিতুর ভাবীও জোর দিয়ে উনাদের খাবার নিতে বললেন। 

ভাত, মুরগীর মাংস, মাছ, ডাল, ডিম বিভিন্ন রকম খাবার রিতুর বাড়ি থেকে পাঠিয়েছে। রিতু প্লেটে সব খাবার তুলে মহিলাটিকে ধরিয়ে দিলো। খাবারটা পেয়ে মহিলার চোখে জল চলে এলো। উনি বললেন,
-- আপনারা অনেক ভালো মানুষ আপা।
   আমাদের মতো গরিব মানুষের লগে যে কথা
   কইছেন এই অনেক। আবার খাওয়ারও
   দিছেন। আল্লাহ্ আপনাদের ভালো করুক। 

রিতুর ভাতিজার অবস্থার উন্নতি হয়েছে। ওরা ছাড়পত্র পেয়েছে। পাশের মহিলাটার বাচ্চারও উন্নতি হয়েছে তবে তারা কাল ছুটি পাবে। আসার সময় রিতু মহিলার হাতে দুই হাজার টাকা ধরিয়ে দিল। মহিলাটি টাকা নিতে সংকোচ করলো। কিন্তু রিতু জোর করে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-- দোয়া করি আপনার বাবুটা তাড়াতাড়ি সুস্থ
   হয়ে যাক। সুস্থ হলে ওকে কিছু কিনে দিবেন।
   এটা আমাদের তরফ থেকে উপহার।   মহিলাটি প্রচন্ড খুশি হয়ে প্রাণভোরে ওদের জন্য দোয়া করলেন।

জিনিসপত্র গুছিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছে রিতু। একের পর এক ওয়ার্ড পার করছে সে। সিঁড়ি বেয়ে নামছে। কত মানুষ অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে হাসপাতালে। মনে মনে ভাবছে, " সামর্থ্যবানরা যদি গরিব মানুষগুলোর পাশে সামান্য কিছু দিয়ে হলেও এগিয়ে আসতো তাহলে মানুষের ভেদাভেদ দূর হয়ে যেত। যে যার প্রয়োজন মেটাতে পারতো। যে যার স্থান থেকে যদি দায়িত্বগুলো অন্তত সঠিকভাবে পালন করতো তাহলে কোন অসুবিধাই ছিল না।
ঠিক যেভাবে ডা. শিরিন তার দায়িত্ব পালন করলেন। অথচ গরীবদের কত অবহেলা অপমানের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। "

গল্প: হাসপাতালের অভিজ্ঞতা
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post