জীবনের গল্প - নীলার চিঠি jiboner golpo Bengali
জীবনের গল্প - নীলার চিঠি jiboner golpo Bengali


হাত দিয়ে নীলার চোখ জোড়া ধরে একটা দোলনায় এনে বসিয়ে দিল মুগ্ধ। নীলাকে বলল, 
" আমি না বলা পর্যন্ত চোখ খুলবা না কিন্তু " পুরোপুরি রেডি হয়ে হাটু গেড়ে হাতে একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে মুগ্ধ নীলাকে চোখ খুলতে বলল। তাকিয়েই নীলা অবাক হয়ে গেল। দোলনা টা হলুদ গাঁদা আর গোলাপের লম্বা মালা গেঁথে  সুন্দরভাবে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সাজানো। খোলা আকাশের নিচে পার্কের কিছু অংশ বেলুন, বিভিন্ন ধরনের ফুল দিয়ে সাজানো হলুদের ইভেন্টের মতো করে। নীলা একটা হলুদ শাড়ি পরে সুন্দর করে সেজেছে। চুলে বেনী, হাতে চুড়ি, কানে ফুলের গয়না। এগুলো সবকিছু অবশ্য কালকে সন্ধ্যায় মুগ্ধই কিনে পাঠিয়েছিল।মুগ্ধ নিজেও একটা হলুদ পাঞ্জাবি পরে এসেছে। "এজন্যই বোধহয় মুগ্ধ আমাকে এভাবে সেজে আসতে বলেছে" নীলা মনে মনে ভাবলো। ফুলগুলো হাতে ধরিয়ে দিয়ে মুগ্ধ নীলাকে বলল,
-- তুমি বলেছিলে, তুমি আমাদের হলুদ সন্ধ্যায়
   এইরকমই ফুলে সাজানো দোলনায় ফটোশুট
   করতে চাও। ঠিক যেমনটা তুমি চেয়েছিলে
   আমি সবটা করেছি নীলা। তুমি খুশি হয়েছো?

কথাগুলো বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল মুগ্ধ। আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না ও। নীলা ও কেঁদে ফেলল। মুগ্ধ ওর চোখের পানি মুছে দিল। ফটোগ্রাফার কে দিয়ে কিছু ফটোশুট করিয়ে নিল। মুগ্ধ খানিকক্ষণ নীলাকে দোলনায় দোলা দিল। ফটোগ্রাফার খুব সুন্দর একটা ভিডিও ক্যামেরাবন্দি করে দিল।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে নীলা। ওর হাত ধরে মাথা নিচু করে কাঁদছে মুগ্ধ। নিঃশব্দ কান্না, শুধু চোয়াল বেয়ে পানি ঝরে পড়ছে। 
-- দেখো তুমি যদি এইভাবে কান্না করো, আমি
   তো মরেও শান্তি পাবো না। তুমি ভেঙ্গে পড়লে
   আমাদের স্বপ্নগুলোর কি হবে? (নীলা)
-- (মুগ্ধ নিরবে কেঁদেই চলেছে)

  ১২/০১/২০১৭
-------------------------

চারদিন হলো নীলার সেন্স নেই। আজকের রাতটা হয়তো পাড়ি দিবে না। ঘড়িতে রাত একটা বাজে। নীলার হাত ধরে বসে থাকতে থাকতে চোখটা একটু লেগে গেছে মুগ্ধর। অনেকদিন ভালোভাবে ঘুমাই না। ইসিজি মেশিনে বিপিং শুরু হলো। মুগ্ধ থমকে উঠল।নীলা চলে গেছে। ওর বাবা-মা আত্মীয়স্বজন কান্নাকাটি শুরু করেছে। মুগ্ধ উঠেই বেরিয়ে গেল। নীলাকে কবর দিয়েই বাড়িতে এসে রুমে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। নীলার মৃত্যুর পরে একফোঁটা ও কাঁদে নি মুগ্ধ। সমস্ত কান্না যেন রাতে সাইক্লোনের রূপ নিচ্ছে। মুগ্ধ নিজেকে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
" কি হলো আমার জীবনে ডাক্তার হয়ে? এত টাকাপয়সা দিয়ে কি হবে জীবনে? আমি তো আমার প্রিয় মানুষটাকেই বাঁচাতে পারলাম না। " 

নীলার যখন লিউকেমিয়া ধরা পড়ে প্রথম কয়েকদিন সে অনেক আপসেট ছিল। মুগ্ধর সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছিল। বাড়িতে গেলেও দেখা করতো না। সপ্তাহখানেক পরে হসপিটালে এসে প্রথম মুগ্ধর সাথে কথা বলল নীলা। মুগ্ধ মাথা নিচু করে ছিল। একজন ডাক্তার সারাজীবন রোগীকে বুঝাতে পারে, কিন্তু নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে সে কিভাবে বুঝাবে যে, তার হাতে সময় খুব কম, খুব শিঘ্রই সে মারা যাবে। নিজেকেই তো বুঝাতে পারছে না এখনও। ওকে অবাক করে নীলা বলল,
-- ভালোই হলো, তোমার আগে মারা যাবো।
   অন্তত তোমার মৃত্যু টা তো আমাকে দেখতে
   হবে না। তোমাকে ছাড়া আমি একা একা
   থাকতে পারতাম না দুনিয়াতে। আমার মৃত্যুর
   পরে তুমি একটু কেঁদো প্লিজ। (নীলা চোখে
   জল আর বরাবরের মুচকি হাসিটা নিয়ে
   কথাগুলো বলল)
-- (মুগ্ধ প্রচ্ন্ড কান্নায় ভেঙে পড়ল, নীলাকে
    জড়িয়ে ধরে বলল) তোমার কিচ্ছু হবে না।
    নিশ্চয়ই তুমি রিকভার করবা। আমরা
    সবচেয়ে ভালো ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট
    করবো। প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে
    ট্রিটমেন্ট করাবো।
--  হা হা। আমার চুলগুলো নাকি তোমার খুব
    প্রিয় ছিল তুমি সবসময় বলতে মুগ্ধ।
    কয়েকদিন পরে আমার চুলগুলো ঝরে যাবে।
    চেহারা টাও নষ্ট হয়ে যাবে। তুমি কি তখনও
    আমাকে ভালোবাসতে পারবা? (নীলাও কেঁদে
    ফেলল) 
-- প্লিজ চুপ করো তুমি, আমি আর সহ্য করতে
   পারছি না। (মুগ্ধ চিৎকার করে বলল)

      মুগ্ধ চেয়েছিল নীলাকে বিয়ে করতে। দুইদিন হোক না কেন তবুও নীলা যেন তার বউ হয়। নীলা রাজি হয় নি। নীলার শেষ ইচ্ছা ছিল অসুস্থ বাচ্চাদের জন্য একটা চ্যারিটি ফান্ড ক্রিয়েট করা। এমন অবস্থায় ওর অসুখ টা
ধরা পড়ে যখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ট্রিটমেন্ট করে কোন লাভ হয় নি। নীলা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। মুগ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত। টাকাপয়সার কোনো অভাব নেই। কিন্তু টাকাই কি মানুষ বাঁচে যদি ভাগ্যে না থাকে?? 

  ২৭/১২/২০২০
~~~~~~~~~~
  নীলার হলুদ শাড়ি, নকল চুলের বেনীটা, লাল হলুদ চুড়ি আর শুকনো গাঁদা ফুলগুলো সঙ্গে নিয়ে এসেছিল মুগ্ধ। খুব সযত্নে তুলে রেখেছে আলমারীতে। আলমারীটা খুলে সবটা উল্টে পাল্টে দেখছে মুগ্ধর বউ বৃষ্টি।  মুগ্ধ বৃষ্টির হাতে ফোন দিয়ে বলল, "ফোনে কিছু ছবি আর  ভিডিও আছে চাইলে দেখতে পারো"। বৃষ্টি কিছুই বলল না। বৃষ্টি গ্যালারিতে গিয়ে মুগ্ধ আর নীলার হলুদের ছবি আর ভিডিও গুলো দেখলো। বৃষ্টির চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলো, 
" ভাগ্য মানুষকে কোন জায়গায় এনে দাঁড় করায়। আজ লাল শাড়িতে বউ সেজে এখানে নীলার থাকার কথা ছিল। অবশ্য মুগ্ধর সমস্ত ভালোবাসা সে নিয়ে চলে গেছে। স্ত্রী নামক সিলমোহর টা আমার জন্য রেখে গেছে শুধু। জানিনা মুগ্ধ আদৌ কখনো আমাকে ভালোবাসতে পারবে কি না , আমিই না হয় ওকে ভালোবেসে যাবো। কাউকে ভালোবাসার মাঝেও অন্যরকম একটা অানন্দ আছে "।

    আজ মুগ্ধ আর বৃষ্টির বিয়ের রাত। নীলার মৃত্যুর চার বছর পরে পরিবারের চাপে বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছে মুগ্ধ। বিয়ের আগে বৃষ্টিকে সবকিছু জানিয়েই বিয়ে করেছে । বিয়েতে কোন প্রকার অনুষ্ঠানও হয়নি।  মুগ্ধ যেদিন ওকে প্রথম দেখতে যায় সেদিনই ওর ওপর একটা অদ্ভুত মায়ায় পড়ে গিয়েছিল বৃষ্টি। মুগ্ধ যখন বৃষ্টিকে আলাদা ভাবে ডেকে অতীতের সবকিছু বলে, শুনে খুব ঘাবড়ে যায় বৃষ্টি। পরে অবশ্য অনেক ভেবেচিন্তেই মুগ্ধকে বিয়ের সিদ্ধান্তটা নিয়েছে সে। মুগ্ধর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। হয়তো ভাগ্যেই ছিল, আল্লাহ্ চেয়েছিল বলেই সবকিছু জেনেও দুরে সরে যেতে পারেনি। মুগ্ধ এসে বিছানায় বসলো। খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে বৃষ্টিকে বললো,
-- ছাদে যাবা? 
-- জ্বী। (বৃষ্টি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো)
-- জানো নীলার খুব ইচ্ছা ছিল আমরা ছাদে
   গিয়ে একসাথে তারা গুনি। 
মুগ্ধ আর বৃষ্টি ছাদে গেল। ছাদে গিয়ে বৃষ্টির হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে মুগ্ধ বলল,
-- নীলার চিঠি, তোমার জন্য। 
বৃষ্টি চিঠির ভাজ খুলে পড়তে শুরু করলো,

                                            ১৫/০৭/২০১৬ ইং
" প্রিয় মুগ্ধর বউ,                        

নাম জানিনা তোমার। যদি মুগ্ধ আমার কথা অনুযায়ী তোমাকে চিঠি টা দেয় তাহলে এখন তোমাদের ছাদে দাঁড়িয়ে এটা পড়ার কথা। লাল শাড়ি পরেছো তো? শাড়িটা অবশ্য আমিই পছন্দ করে কিনে রেখে গেছি। নিশ্চয়ই তোমাকে বউ সেজে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। আমারও ছোট থেকে খুব ইচ্ছা ছিল লাল টুকটুকে বেনারসি পরে বউ সাজার। সবার ভাগ্যে তো আর সবকিছু থাকে না। মুগ্ধ খুব ছেলেমানুষ। ওকে আমি তেমন কিছুই বলে আসতে পারিনি। ওতোটা সাহসী ছিলাম না যে নিজের মৃত্যু নিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিয়ে আসবো। ওকে সামলানোর জন্যই আল্লাহ্ তোমাকে পাঠিয়েছে। জানো, ও কাচ্চি খেতে খুব পছন্দ করে। তুমি রান্না শিখে নিও। মাঝেমাঝে শাড়ি পরে খোলাচুলে মুগ্ধর সামনে এসে দাঁড়িও। ও কিন্তু সবটা মুখে বলে প্রকাশ করে না। বরাবরই চুপচাপ। ওর মন খারাপ থাকলে তুমি বুঝে নিও। আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে তোমার হাতে দিয়ে গেলাম। কখনো অযত্ন হতে দিও না। ওর মিষ্টি হাসিটা যেন লুকায়িত না হয়ে যায়। ছাদে দাঁড়িয়ে প্রথম চুমু টা না হয় তুমিই আগে দিও আমার প্রিয়তম কে। ইস, খুব জেলাস ফিল হচ্ছে লিখতে গিয়ে। চোখের পানিতে পৃষ্ঠা টা ভিজে যাচ্ছে। আমার মুগ্ধ কে তুমি অনেক ভালোবেসো। আমি পর্যাপ্ত সময় পাইনি। আমি আমার আব্বু আম্মুর একমাত্র মেয়ে ছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে তুমি যদি তাদের একটু দেখতে যাও খুব খুশি হবে তারা। আমার রুমটাও ঘুরে যেও। দেয়ালে মুগ্ধর আর আমার একটা ছবি আছে। ছবিটা আমাদের এঙ্গেজমেন্টের। কখনো মনে পড়লে সময় করে একটা বার আমার কবর টা দেখে যেও। এখানে এখন একাই থাকে মুগ্ধর সেই চঞ্চল-প্রাণোচ্ছল নীলা। 
                                               ইতি,
                              মুগ্ধর ভালোবাসা চোর নীলা

বৃষ্টি-মুগ্ধ দুজনেই কাঁদছে। বৃষ্টি ওর মেহেদি রাঙা হাত দিয়ে মুগ্ধর চোখের পানি মুছে দিল। মুগ্ধর গালে একটা চুমু খেলো।
 
    ১২/০১/২০২২
→→→→→→→→

আজ নীলার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। সকালে মুগ্ধ আর বৃষ্টি নীলার কবরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি নীলার কবরের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি তোমাকে দেখতে এসেছি নীলা।তোমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। বাবা-মার ভালোবাসা কাকে বলে এই এতিমকে তুমি বুঝার সৌভাগ্য করে দিয়ে গেছো। প্রতি মাসে ঘুরতে যাই ওখানে। (কিছুক্ষণ থামলো বৃষ্টি)
 তোমার মুগ্ধ আজও তোমারই আছে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি ওর যত্ন নেয়ার। জানিনা কতটুকু পারি। তোমাকে খুব মিস করে ও। এখনো কাঁদে তোমার জন্য। তুমি অনেক লাকি নীলা, তুমি এমন একজনের ভালোবাসার মানুষ ছিলে। "

    মুগ্ধ বৃষ্টির হাত ধরে বলল, " নীলা, তোমার দেওয়া দায়িত্বগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য, তোমার মুগ্ধকে ভালো রাখার জন্য আল্লাহ্ একটা সঠিক মানুষকে পাঠিয়েছে। আমি ঠিক আছি, নীলা। কিন্তু তোমাকে ভীষণ  মিস করি। জানিনা কেন, তবে ওর ওপরে একটা মায়া জন্মে গেছে। গত সপ্তাহে জানতে পেরেছি আমাদের পরিবারে নতুন অতিথি আসতে চলেছে। তোমারও তো ছোট্ট বাবু অনেক পছন্দ ছিল। সুখবরটা প্রথমে তোমাকেই দিয়ে গেলাম। "

কথাগুলো শুনে মুগ্ধর দিকে অবাক চোখে তাকালো বৃষ্টি। মুগ্ধ প্রথমবার বৃষ্টিকে নিয়ে কিছু বলেছে। বাসায় ফিরে মুগ্ধ বৃষ্টিকে বলল,
-- আজকে দুপুরে নীলার ফাউন্ডেশনের
   উদ্বোধন। আমি চাই তুমি আমার সাথে চলো।
   আমার ভালো লাগবে। 
-- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি রেডি থাকবো।

মুগ্ধ বেরিয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু কি যেন ভেবে দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বলল,
-- বৃষ্টি?
-- জ্বী বলেন। (জামাকাপড় গুছাচ্ছিল, মুগ্ধর
   কথায় চমকে উঠে ঘুরে তাকালো)
-- আমাকে সামলে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

বৃষ্টি মুচকি হাসলো। মুগ্ধ ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বের হয়ে গেল। বৃষ্টি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বারবার দেখতে থাকলো।                                           
                                                    (সমাপ্তি) 

গল্প-- নীলার চিঠি
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post