জীবনের গল্প - সিজোফ্রেনিয়া jiboner golpo in Bengali
জীবনের গল্প - সিজোফ্রেনিয়া jiboner golpo in Bengali


বেশ কয়েকদিন হলো রাতে ঘুমাতে পারে না পরিধি। বিষয়টা ভালোভাবেই লক্ষ্য করছে নিলয়। প্রতি রাতে অদ্ভুত কিছুর অস্তিত্ব টের পায় সে। একসময় পরিধি খুব সাহসী প্রাণোচ্ছল মেয়ে ছিল। বন্ধুবান্ধবদের হাসি ঠাট্টাতে মাতিয়ে রাখতো। কখনো এরকম চাঞ্চল্যকর রাতের পর রাত কাটাতে হবে ভাবে নি সে। এইসবের শুরুটা হয় ভাড়া বাড়ি চেঞ্জ করার পর থেকে। নিলয়ের অফিসের বদলির কারণে তাদের বাড়িটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। 

এ বাড়িতে যখন পরিধি প্রথম আসে তখন বাড়িটা অসম্ভব ভালো লেগে যায় তার। আর বাড়িটা নিলয়ের অফিস থেকে কাছেও। প্রথম কিছুদিন সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে সবকিছু ভৌতিক হতে শুরু করে ওর কাছে। প্রথম যেদিন এসবের সূচনা হয় সেদিন প্রায় রাত দুইটার পরপর পরিধি ওয়াশরুমে যাচ্ছিল। তার মনে হলো পেছনে ছায়ার মতো কিছু তাকে ফলো করছে। ঘুরে দেখলো কিছুই নেই। বাথরুমে থেকে বের হওয়ার সময় পরিধি ছিটকানিটা কোনমতেই খুলতে পারছিল না। সে বারবার নিলয়কে ডাকছে কিন্তু  নিলয় ঘুমের মধ্যে আছে তাই ওর আওয়াজ নিলয়ের কান পর্যন্ত পৌছাচ্ছে না। মিনিট পনেরো বাথরুমে আটকে থেকে পরিধির দম বন্ধ হবে হবে ভাব। সেসময় অটোমেটিকালি বাথরুমের দরজাটা খুলে যায়। পরিধি বেরিয়ে এসে আশপাশটা লক্ষ্য করে তারপরে ভেতরে চলে যায়। রুমে গিয়ে সে নিলয়কে এই মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিল। বাথরুমের ঘটনাটা নিলয়কে খুলে বলল। নিলয় খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
-- বাথরুমের লকে মনে হয় কোন সমস্যা
   হয়েছে। কাল চেক করে দেখবো। তুমি শুয়ে
   পড়ো।
পরিধিও তখন ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিলো। এক গ্লাস পানি খেয়ে সে শুয়ে পড়লো। 
পরের দিন সকালে নিলয় লক চেক করে দেখলো লক পুরোপুরি ঠিক আছে। মাঝে মাঝে জ্যাম লাগতে পারে ভেবে নিলয় তেমন গুরুত্ব দিল না। 

নিলয় চলে যাওয়ার পরে পরিধি বাড়িতে একা থাকে। সকালে একবেলা রান্না করে আবার রাতে নিলয় আসার পরে রান্না করে। এখানে এসে সময়টা একদম কাটছেনা ওর। বাড়ির সামনে একটু ফাঁকা জায়গা আছে সেখানে ঘুরতে বের হলো সে। বাড়িওয়ালার বউ এর সাথে দেখা ওর। বাড়িওয়ালা মারা গেছে হার্ট অ্যাটাকে। বাড়িওয়ালী মিসেস রাবেয়া বেগম। উনারও বয়স আছে কিন্তু অতটা নয়। বেশ স্মার্ট প্রকৃতির মানুষ। উনার ছেলে বউমা অামেরিকাতে সেটেলড। এক মেয়ে আছে তার বিয়ে হয়েছে। জামাই সমেত সে চট্টগ্রামে থাকে। শুধু বাড়িতে থাকা বলতে উনার সাথে একটা কাজের মেয়ে থাকে তার নাম সুমি। বাড়িতে আসার পরে ভালোভাবেই পরিচয় হয়েছে সবার সাথে। 

পরিধিকে বাড়ির বাগানে ঘুরাফেরা করতে দেখে মিসেস রাবেয়া রুমের জানালা থেকে বললেন,
-- একটু দাঁড়াও। আমি আসছি। 
-- জ্বী আন্টি। 
মিসেস রাবেয়া তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলেন। এসে বেশ উৎফুল্ল মেজাজে বললেন,
-- বাব্বাহ্। তোমার তো পাত্তাই নেই। আন্টির
   সাথে গল্প করতে ইচ্ছা হয় না তাইনা? অবশ্য
   হবেই বা কিভাবে। বয়স্ক মানুষের সাথে বকতে
   কারই বা ভালো লাগে?
-- কি যে বলেন আন্টি। আপনি এই বয়সে যা
   ফিট আপনাকে এখনো অনেক ইয়াং লাগে।
   আর গল্প করতে আমার অনেক ভালো লাগে।
   এই কদিন ঘরবাড়ি গুছাতে একটু সময় চলে
   গেল।
-- আচ্ছা শোনো। তোমরা এখন এ বাড়ির
   সদস্য। আমার ছেলেমেয়ের মতো। যখন যা
   লাগবে আমাকে বলবে কিন্তু। 
-- অনেক ধন্যবাদ আন্টি। অবশ্যই বলবো।
-- বাড়ির সামনের স্পেসটা অনেক বড়।
   চেয়েছিলাম ফুল বাগান করতে। কিন্তু পরে
   সবজি বাগান করে বসে আছি। 
-- তারপরেও বেশ সুন্দর। 
-- বাম সাইডটা ফাঁকা আছে। তুমি ওখানে কিছু
   সবজির গাছ লাগাতে পারো। বিকেলে সুমি
   বাজার যাবে গাছের চারা আর বিজ আনতে।
-- আচ্ছা আন্টি কি কি গাছে লাগানো যায়
   সাজেস্ট করুন।
-- বিকেলে নিচে এসো। আমি তোমাকে সবটা
   শিখিয়ে দিবো। টাটকা নির্ভেজাল সবজি
   পাওয়া অনেক মুশকিল আজকালকার
   বাজারে। 
-- জ্বী ঠিকই বলেছেন। 

রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে দুপুরে ঘুমিয়েছে পরিধি। বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে পরিধির ওঠার নাম নেই। সুমিকে দিয়ে ডাকতে পাঠিয়েছেন মিসেস রাবেয়া। সুমি এসে " আপা, ও আপা " বলে ডাকতেই পরিধি চোখ মেলে তাকালো। ভূত দেখার মতো করে লাফিয়ে উঠলো সে। সুমি বেশ অবাক হলো। পরক্ষণে বলল,
-- আপা আমি সুমি। ভয় পাইছেন নাকি?
-- না না। 
-- আপনেরে খালা নিচে ডাকে। গাছ আনছি
   লাগানোর জন্য।
-- তুমি যাও আমি দুই মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসি। 
-- আইচ্ছা।
বলে সুমি চলে গেল। পরিধি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। তারপরে ফ্রেশ হয়ে পরিধি নিচে গেল।

বেগুন, পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, ঢেঁড়স  অনেক রকমের সবজির চারা বীজ এনেছে সুমি। কয়েকটা চারা নিয়ে জায়গায় জায়গায় খুঁড়ে গাছ লাগাচ্ছিল পরিধি। হঠাৎ এক জায়গায় খুঁড়ে হাত দিয়ে মাটি তোলার সময় কিছু একটা মনে হলো পরিধির হাতটা চেপে ধরল। পরিধি হাতে খুব ব্যাথা পেল কিন্তু ছোট্ট গর্তে কিছুই ছিল না। গাছের চারায় পানি দিচ্ছিল ওরা তখন নিলয় অফিস থেকে বাড়ি ফিরলো। পরিধিকে বাগানে দেখে বলল,
-- কি করছো তোমরা?
-- আন্টি আমাকে এই জায়গায় ফসল ফলানোর
   অফার দিয়েছে। সেটাই করছি। তোমার টাকা
   বাঁচাচ্ছি।
পরিধির কথা শুনে নিলয়, মিসেস রাবেয়া, সুমি সবাই হাসলো। 

রাতে শুয়ে ঘুমের মধ্যে ভুল বকছিল পরিধি। নিলয় টের পেয়ে পরিধিকে সামান্য ঝাঁকালো। পরিধি জেগে গেল। তারপরে উঠে সোজা ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। নিলয়েরও ঘুম ভেঙে গেছে। পরিধি ওয়াশরুম থেকে এসে হঠাৎ ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো, ' খুন, খুন', বলে।
তারপরে মুহূর্তেই সে অজ্ঞান হয়ে গেল। নিলয় বেশ ভয় পেয়ে গেছে। ওর শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। পরিধির চোখেমুখে পানি ছেটালো নিলয় কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। নিলয় দ্রুত দরজা খুলে নিচতলায় গিয়ে মিসেস রাবেয়াকে ডাকলো। মিসেস রাবেয়া উঠে চশমাটা পরে দরজার কাছাকাছি গিয়ে বললেন, 
-- কে বাইরে?
-- আন্টি আমি নিলয়। একটু সমস্যাই পড়েছি।
   প্লিজ তাড়াতাড়ি বের হন। 
-- কি হয়েছে বাবা?
-- পরিধি হঠাৎ সেন্সলেস হয়ে গেছে। কি করবো
   বুঝতে পারছি না।

মিসেস রাবেয়া নিলয়ের সঙ্গে ওপরে গিয়ে দেখলো পরিধির জ্ঞান ফিরেছে। সে ভীষণ কান্নাকাটি করছে। নিলয়কে দেখে পরিধি দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলল,
-- তুমি বেঁচে আছো? 
-- মানে? আমি বেঁচে থাকবো না কেন?
পরিধি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল,
-- আমি যে দেখলাম তোমার রক্তাক্ত শরীরটা
   মেঝেতে পড়ে থাকতে। তোমার গলা দিয়ে
   রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। শরীরে অনেক
   আঘাতের চিহ্ন ছিল। 
-- তুমি বোধহয় স্বপ্ন দেখেছো মা। (মিসেস
   রাবেয়া)
-- না আন্টি স্বপ্ন কিভাবে দেখবো। আমি ঘুম
   ভাঙার পরে ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। এসে
   নিলয়কে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখি। 
নিলয় পরিধিকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
-- এইতো দেখো। আমার কিছু হয় নি। আমি
   সম্পূর্ণ ঠিক আছি। 
-- আমি কেন এমন অদ্ভুত কিছু দেখলাম?
নিলয় মিসেস রাবেয়াকে বলল,
-- আন্টি আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমি
   দেখছি। 
মিসেস রাবেয়া চলে গেলেন। নিলয়ও বেশ অবাক হয়ে ভাবছে, "পরিধি তো সত্যি কথা বলছে। সে ওয়াশরুম থেকে এসেই ভয় পেয়েছে। ঘুমের ঘোরে না। ও কি তাহলে হ্যালুসিনেট করছে?" 

পরের দিনের ঘটনা। সেদিন শুক্রবার ছিল। অফিস ছুটি তাই অনেক সময় ধরে ঘুমাচ্ছে নিলয়। নিলয় ঘুম থেকে উঠে দেখলো পরিধি বমি করছে। নিলয় খুব খুশি হয়ে পরিধিকে জিজ্ঞেস করলো,
-- আমি কি বাবা হতে যাচ্ছি? 
-- ধুর। দেখো না, সকাল থেকে কেমন একটা
   বাজে গন্ধ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে
   নাড়িভুড়ি ছিড়ে উঠে আসবে। 
-- কই, কিসের গন্ধ?
-- এত্ত গন্ধ আর তুমি টের পাচ্ছ না? তোমার কি
   সর্দি লেগেছে?
-- না তো।
অন্যান্য রুম, ডাইনিং, কিচেন সব ঘুরে নিলয় দেখলো কোথাও কোন গন্ধ নেই। নিলয় এসে বলল,
-- এখানে কোথাও কোন দুর্গন্ধ নেই।
-- আমি কিন্তু মজা করছি না তোমার সাথে।
-- আমিও মজা করছি না। 
-- আচ্ছা আমার ওপর কি তাহলে কোন আত্মা
   ভর করেছে? বাথরুমে আটকে যাওয়া,
   তোমাকে মৃত দেখতে পাওয়া, এই দুর্গন্ধ
   পাওয়া এগুলো কি স্বাভাবিক মনে হচ্ছে
   তোমার?
-- তুমি আবার এসব ভূত প্রেতে কবে থেকে
   বিশ্বাস করতে শুরু করলে?
পরিধি কোন উত্তর দিল না। 

পরিধি এখন প্রায়ই ভয় পায়। এক রাতে সে ঘুম ভাঙ্গিয়ে নিলয়কে দেখালো দেয়াল দিয়ে সাদা কাফন পরা একটা মানুষ উল্টো ভাবে হাটছে। কিন্তু নিলয় কিছুই দেখতে পেল না। একদিন কিচেনে গিয়ে নিলয় দেখলো পরিধির হাত অনেকটা কেটে গেছে। কিন্তু ওর কোন অনুভূতি নেই। সে গুনগুন করছে ওর কড়াইয়ে তরকারি নাড়ছে। পরে নিলয় পরিধিকে জিজ্ঞেস করলে সে জানালো একটা ছোট্ট বাচ্চা নাকি খেলার সময় তার হাত কেটে দিয়েছে। আজব!  এ বাড়িতে কোন বাচ্চা নেই। এগুলো সম্পূর্ণ অবাস্তব কথা। আবার মাঝেমাঝে পরিধি ভয়ানাক কন্ঠস্বর শুনতে পেত। সে অনেকবার নিলয়কে শুনানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু নিলয় কিছুই শুনতে পায় নি। অনেক সময় পরিধি এমন অদ্ভুত কিছু দেখতো যে সে ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকে। প্রায়ই নিলয় বাড়ি এসে দেখে পরিধি কিছুই রান্না করেনি অথচ সে বলতো সে রান্না করেছে। পরবর্তীতে নিলয়কে রান্না করে খেতে হতো। নিলয়ের কখনো কখনো বেশ অসহ্য লাগতো সারাদিন অফিস করে এসে এসব অদ্ভুত কথা শুনতে কিন্তু সে নিজেকে কনট্রোল করে নিতো।
রাতে পরিধি ভালোভাবে ঘুমায় না। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে ওর। বেশ শুকিয়ে যাচ্ছে সে আগের তুলনায়। পরিধি সবসময় মন খারাপ করে থাকে। টেনশন করে। নিলয় যদি পরিধির সব হ্যা তে হ্যা না মিলায় তাহলে সারাদিন সে রাগে নিলয়ের সাথে কথা বলে না।

নিলয় অনেকবার চেষ্টা করেছে পরিধিকে চিয়ার আপ করার। কিন্তু কোনমতেই কিছু হচ্ছে না। পরিধি এখন বাইরে কোথাও ঘুরতে যেতে চায় না। টিভি, বাইরে গিয়ে সিনেমা দেখা, ডিনার ডেট কোনকিছুতেই নিলয় ওর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছে না।

এদিকে পরিধির অবাস্তব কথাগুলো বেড়েই চলেছে। নিলয় কি করবে বুঝতে পারছে না। একদিন সে পরিধির বাবা মাকে তার আচরণ সম্পর্কে জানালো। অতীতে পরিধির কোনকিছু নিয়ে আগেও এমন ভয় পেতো কি না। কিন্তু পরিধির বাবা মা জানালো পরিধির এমন কোনো সমস্যা ছিল না। নিলয় ওর শাশুড়িকে কয়েকদিনের জন্য এখানে আসতে বলল। 

পরের দিন পরিধির মা মিসেস মহিমা বেগম আসলেন মেয়ের বাড়ি ছুটি কাটাতে। কিন্তু নিলয়ের কথা অনুযায়ী উনি পরিধিকে জানালেন না উনি কি কারণে এসেছেন। শুধু জানালেন উনি বেড়াতে এসেছেন। দু-তিনদিনে মহিমা বেগম তার মেয়ের আচরণে অনেক উদ্ভট পরিবর্তন দেখতে পেয়ে উনি নিজেও বেশ চিন্তিত হলেন। 

এক রাতে নিলয় আর পরিধি ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে একটা খট করে শব্দ হওয়াতে নিলয়ের ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখল পাশে পরিধি নেই। নিলয় বেশ ভয় পেয়ে গেল। উঠে আশেপাশে খুঁজতে শুরু করলো। মেইন দরজায় তালা লাগানো। নিলয়ের সন্দেহ হলো তাহলে কি পরিধি ছাদে যেতে পারে? নিলয় দ্রুত ছাদে গিয়ে দেখলো ছাদের দরজা খোলা। নিলয় দূর থেকে দেখলো পরিধি খোলাচুলে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। নিলয় পরিধিকে বেশ কয়েকবার পেছন থেকে ডাকলো। সে কোন কথাই শুনছে না। নিলয়কে ওর পিছু আসতে দেখে সে সোজা হাটতে শুরু করলো। নিলয় ওকে থামানোর চেষ্টা করলো। ছাদটা ঘেরা নেই। সামান্য কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। যদি নিলয় দৌড়ে পেছন থেকে ওকে টেনে না ধরতো তাহলে পরিধি এতক্ষণে তিনতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে যেত। নিলয় পরিধিকে পিছন থেকে জোরে টানতে গিয়ে নিলয় পরিধি দুজনেই ছাদের ওপরে পড়ে গেল। নিলয়ের হাতের কনুইয়ে খানিকটা ছিলে গেল। পরিধি তখন সেন্সলেস। নিলয় চিৎকার করে ওর শাশুড়িকে ডাকতে শুরু করলো। ওর চিৎকার শুনে নিচের ফ্ল্যাট থেকে মিসেস রাবেয়া, সুমি, মহিমা বেগম সবাই দৌড়ে এলো। নিলয় পুরো ঘটনাটা সবাইকে খুলে বলল। 
পরে জ্ঞান ফেরার পরে পরিধিকে নিলয় জিজ্ঞেস করলো,
-- তুমি ছাদে কেন গিয়েছিলে?
-- আমাকে কেউ একজন ডাকছিল। 
নিলয় আর কিছুই বলল না। 

নিলয় সিদ্ধান্ত নিলো সে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলবে এ ব্যাপারে। সে শহরের একটা ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. অশিত বড়ুয়ার অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিলো। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে সে ডাক্তারকে তার স্ত্রী পরিধির ব্যাপারে সবটা খুলে বলল। শুনে ডা. অশিত বলল,
-- আপনার স্ত্রী সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত। এটি
   একটি মানসিক রোগ। 
-- মানে?
-- সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক পরিস্থিতি। যা
   শতকরা একজন মানুষের হয়। এই রোগে
   মানুষের হ্যালুসিনেশন হয়। সে অদ্ভুত কিছু
   দেখতে পায়, নাকে গন্ধ পায়, অস্বাভাবিক
   আওয়াজ পায় বা অদৃশ্য কিছু দেখার দাবী
   করে। লাইক ইউ সেইড, আপনার স্ত্রীর
   বেশিরভাগ সিম্পটম আছে। 
-- কিন্তু এগুলো কিভাবে হয়?
-- রোগীর মস্তিষ্কে এই শব্দগুলো বা দৃশ্য রোগীর
   মন সৃষ্টি করে। কিন্তু ভুলবশত রোগী মনে করে
   এগুলো বাইরের পরিবেশ থেকে আসছে।
   কখনো কখনো রোগীর মনে হয় যে তারা যা
   বলছে তা করতেই  হবে, এমনকি যদি তারা
   আত্মহত্যা করতে বলে তাহলে তাও করতে
   হবে। যদি তারা অন্যায় কাজ করতে বলে,
   তাহলে অন্যায় জেনেও তা করতে হবে। 
-- জ্বী আমার স্ত্রীও ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার
   চেষ্টা করেছিল কিন্তু আমি সময়মতো পৌছে
   গিয়েছিলাম বলে সে জীবিত।
-- এ ধরনের রোগীরা মনোবল হারিয়ে ফেলে
   কারণ তারা যা দেখে বা শোনে অন্য কেউ তা
   বিশ্বাস করতে চায় না। ফলে অনেকেই
   আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। চেষ্টা করবেন
   উনাকে মেন্টালি সাপোর্ট করার। আপনি
   উনাকে সঙ্গে নিয়ে কাল আসবেন। তারপরে
   ট্রিটমেন্ট কি দেওয়া হবে আমি প্রেসক্রাইব
   করবো।
-- জ্বী অসংখ্য ধন্যবাদ। 

ট্রিটমেন্ট শুরুর পরে নিলয় পরিধিকে নিয়ে অন্য বাড়িতে শিফট হলো যেন পুরোনো কোনকিছুর দ্বারা পরিধি বিভ্রান্ত না হয়। পরিধিকে দেখাশোনার জন্য মহিমা বেগম মাঝেমাঝে ওদের সাথে থাকতেন। ওকে সর্বক্ষণ নজরে রাখতেন। কয়েকমাসের মধ্যে পরিধির অদ্ভুত আচরণগুলোর খানিকটা পরিবর্তন হতে শুরু করলো। পরিধি স্বাভাবিক জীবন শুরু করলো। দুইবছর পরে পরিধি এখন সন্তান সম্ভাবা। নিলয় প্রতিনিয়ত ওর যত্ন নিচ্ছে। ওদের সংসার আলো করে ছোট দুইটা গুটিগুটি পায়ের আগমন হতে চলেছে। 

গল্প: সিজোফ্রেনিয়া
লেখনীতে-- নূর-এ সাবা জান্নাত

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post