জীবনের গল্প - অণুগল্প -তৃপ্তি Kostir jiboner golpo
জীবনের গল্প - অণুগল্প -তৃপ্তি Kostir jiboner golpo



ভাবি আপনি ইদের কেনাকাটা করবেন না?  আমার কেনা হয়ে গিয়েছে। আরো একটা জামদানি শাড়ি নেব। এতেই হবে যাবে। জানেন ভাবি, এই ইদে পনেরো হাজার টাকার শপিং করেছি।'

জবাবে  আমি কিছু বললাম না। আমার প্রতিবেশী ভাবি, এতক্ষণ নিজের কথাই বললেন। উনার  কেনাকাটার গল্প আমার সাথে বলতে আসলো। ইফতারের পর আমার বাসায় আসলেন উনি। দুজনে চা খাচ্ছি আর কথা বলছি। আমার চুপ থাকা দেখে উনি আবার বললেন, 
ভাবি কিছু নিয়ে মন খারাপ?  আমার সাথে চুপ করে আছেন যে?  

আসলে আমার এখনো কেনাকাটা করা হয়নি। আমার বর এখনো বেতন পায়নি। ইদের জন্য অনেক সময় বাকি। আর দশদিন। আটাশ তারিখ বেতন পেলে। মার্কেটে যাবো। 

আমার কথা শুনে একটু হতাশ হয়ে ভাবি বলেন, 'আসলে ভাবি কম বেতনের চাকুরী করা বর বিয়ে করলে যা হয়৷ আপনার টাকা লাগলে ধার নিতে পারেন। আমাকে টাকা দিয়েছে যে, আমার কাছে এখনো পাঁচ হাজার আছে। 

আমি এবার কি জবাব দিবো ভেবে পাচ্ছি না৷ আসলে আমাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো যাচ্ছে না। সেটাও প্রকাশ করতে পারবো না। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এটা জানলে সবার সামনে ছোটো করবে হয়তো। 

আমি বললাম, 'ভাবি বরের যা আয় এতেই আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সুখেই আছি। এরচেয়ে বেশি জীবনে কিছুর চাওয়ার নেই।'

আমার কথা শুনে। চুপ করে রইলো। আরো কিছুক্ষণ বসে থেকে বাসা থেকে চলে গিয়েছেন উনি। 

আমার স্বামী রাত নয়টার দিকে বাসায় ফিরে আসলেন। বাসায় আসলে আমি পানি হাতে দিলে, উনি পান করলেন। ফ্রেশ হয়ে সোফায় হেলান দিলেন৷ আমার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন মন খারাপ করে আছি। 

আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'কেয়া কিছু নিয়ে মন খারাপ? অন্য দিনের মতো, আজকে মুখে সেই সুখের হাসিটা নেই। কোন কিছু নিয়ে সমস্যা? '

'আমরা কেনাকাটা করবো কখন? পাশের বাসার ভাবি এসে আমায় তাদের কেনাকাটার গল্প শুনিয়ে গেছে। প্রতিবেশী সবাই মার্কেটে যাওয়ার সময় বলে যায়। আমি কেনাকাটা করতে যাবো কিনা। '

'এটা নিয়ে মন খারাপ। আমাদের সব অবস্থা তোমার জানা আছে৷ বেতন পেলে তোমায় একটা সুন্দর শাড়ি কিনে দেবো। রাগ করো না। '

আমার স্বামীর জবাবে বললাম, আমি রাগ করিনি। আমারও ইচ্ছে হয় সবার সাথে কেনাকাটা করতে যেতে। তবে আমি আপনার আয় ও সংসার সব কিছু মিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ। আমার চাহিদা সবার মতো নয়। আমি সবার ভেতর আলাদা। মাঝে সবার আচরণ দেখে মনে এমন হয়। ওদের মতো কেনাকাটা করিয়ে দেখা। পরে ভাবি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ করা অপচয়। আমার কেনাকাটা করার প্রয়োজন নেই। বাসায় যত শাড়ি আছে। আমার এক বছরে কিছু না নিলেও চলবে। 

আমার কথা শুনে আমার স্বামী আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে। আর বলে, আমার সকল কিছুতে তুমিই আমার সাথী। বিয়ের পর আমি যা দিয়েছি এতেই তৃপ্তি সহকারে গ্রহণ করে নিয়েছো। আল্লাহ আমাদের নিশ্চয়ই ভালো কিছু দিবে। আমার আয়ও বেশি হবে, একদিন আমাদের সব কিছু হবে। 

আমি আমার স্বামীর কথা শুনে চুপ করে আছি। আল্লাহ আর্থিক অসচ্ছলতা দিয়েছে। তবে ভালোবাসায় সেটা কম দেয়নি। আল্লাহ আমাদের একদিন সব সমস্যা দূর করে দিবেন। 

আমার স্বামীকে রাতের খাবার দিলাম। খাবার খেয়ে দুজনে শুয়ে পড়লাম। 

আমি ভাবছি আমাদের সংসার নিয়ে৷ একদিন দুজনের একটা নিজস্ব ফ্লাট বাসা হবে। আমরা আমাদের সন্তান নিয়ে সুখেই থাকবো। কয়েকমাস আগে আমার স্বামীর চাকুরী চলে যায়৷ নতুন একটা চাকুরী নিয়েছে। বেতন সব মিলিয়ে পনেরো হাজার। আমাদের বাসা ভাড়া চলে যায় আট হাজার৷ বাকি টাকা দিয়ে কোন রকম সংসার খরচ চলে দুজনের৷ ব্যাংকে কিছু টাকা জমা আছে৷ আরো কিছু হলে একটা ফ্লাট বাসা নিবো৷ বর্তমানে যেমনই যাক। আমাদের সন্তানের যেন কষ্ট না হয়। সেটা নিয়ে আমার স্বামী আগে থেকেই টাকা সেভ করছে৷ বিয়ে হয়েছে আমাদের দু'বছর হয়েছে। আমাদের প্রথম সন্তান দুনিয়ায় আসার আগেই আমাদের ছেড়ে গিয়েছে। একটা দূর্ঘটনায় আমাদের সন্তান পেটেই মারা যায়। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার জন্য  চিকিৎসা হাসপাতাল করতে গিয়ে স্বামীর অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। তবুও এক মুহুর্তের জন্য আমাকে ভালোবাসা কম দেয় নাই। 

সবসময়ই আল্লাহর উপর ভরসা করে আছি আমরা। আল্লাহ আমাদের সকল বিপদ ও সমস্যা দূর করবেন। 

নানান কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গিয়েছি।

ভোরবেলা সেহরি খেয়ে আমরা শুয়ে রইলাম। সকালে আমার স্বামী অফিয়ে গিয়েছে। পাশের বাসার সেই ভাবির রুম থেকে অনেক চিৎকার, চেচামেচির শব্দ আসছে। আমি লক্ষ করলাম, ভাই বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছে। ভাইয়ের চোখর কোণের জল। 

একটু পর ভাবি আসলেন আমার কাছে। ভাবিও অনেকটা কান্না করার মতো অবস্থা। আমাদের বাসা পাশাপাশি। আমরা থাকি একটা পাঁচ তলার বাড়ির ২য় তলায়। আমাদের তলায় থাকি ৫টা পরিবার৷ বাসার মালিক ফ্যামিলি বাসার  জন্য দুটা রুম একটা কিচেন এমন করে বানিয়েছেন।

সেই ভাবির স্বামী চিৎকার করে যা বলেছিলো। ততটুকু বুঝলাম। উনি ভাবিকে বলছে, "তুমি জানো আমার কত বড় সমস্যা হয়ে আছে? আমি টাকা গুলো জমা রেখেছি। আর তুমি সেই টাকায় শপিং করেছো?  আমার মরার পর বেশি বেশি কেনাকাটা করো। মানুষকে দেখিয়ে দেখিয়ে। চাহিদা এত বেশি ভালো নয়। লোক দেখানো বড়লোক বাদ দাও। জীবনটা সম্পর্কে ভেবে চলো "

ভাবিকে আমি সান্ত্বনা দিয়ে সোফায় বসতে বললাম। উনার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমি ভাবির ঘটনা জানতে চাইলাম। উনিও বলতে শুরু করলেন। 

ভাবি বললেন, 'আমার স্বামীর চাকুরী বেশি বেতন পায় এমন নয়। করোনার সময় কোম্পানির চাকুরীটা চলে যায়। তখন উনার বেতন ছিলো ত্রিশ হাজার। আমরা বাসা ভাড়া দিয়ে ভালোই দিন চলতো। তখন আমার মেয়েটা হয়।আমার স্বামীর চাকুরীও চলে যায়। বাচ্চার খরচ সব মিলিয়ে হিমশিম খেতে হয়। আরেকটা চাকুরী পায় সেলসম্যান হিসাবে। বেতন নাকি বিশ হাজার। এখনও ওটা করে। বেতন কম হওয়ায় আমরা এখানে আসি। অল্প টাকায় বাসা পেয়ে। 
সংসার আমাদের চলছে কোন রকম। প্রতিমাসে সংসার খরচ ছাড়াও কিছু টাকা জমা রেখেছে আমার কাছে। বিশ হাজার জমা করেছে। আমি সেটাই খরচ করে গতকাল কেনাকাটা করেছি। আজকে জানতে পারলো উনি '

আমি ভাবির কথা শুনে থ মেরে বসে আছি। ভাবির স্বামী কম বেতন পায় আর চাহিদা দেখায় মানুষের সাথে যেনো কোটিপতি। মানুষকে বুঝায় কত খরচ করে চলে উনারা। আমি ভাবিকে আবার বললাম, 'খরচ করা নিয়ে রাগান্বিত হয় কেউ?  '

ভাবি চোখের পানি ছেড়ে বলেন,'আসলে উনার নাকি হাঁটুতে সমস্যা। ডাক্তার দেখিয়েছে আরো আগে। ডাক্তার অপারেশন করতে বলেছিলো।অপারেশন খরচ পঞ্চাশ- ষাট হাজার খরচ হবে। বিশ হাজার জমা করেছে। ব্যাংকেও কিছু আছে। সব মিলিয়ে ইদের পর অপারেশন করবে। আর ঘরে আমার কাছে থাকা, টাকাটা খরচ করে ফেলছি। এখন এটা জোগাড় করতে আরো সময় লাগবে। আমি সবাইকে দেখাতে এত টাকার শপিং করলাম৷ আজকে আমার স্বামীর চোখে পানি দেখলাম। '

ভাবির এই কথা শুনে কি বলে সান্ত্বনা দিবো ভেবে পাচ্ছি না। চুপ করে রইলাম। একজন পুরুষের চোখে জল খুব কষ্ট না পেলে, আসে না৷ আমি অনুভব করেছি ভাবির স্বামী কতটা কষ্ট পেয়েছেন। 
ভাবিকে বললাম, "সবসময়ই অল্পতে তৃপ্তি খুঁজবেন। বেশি চাহিদা আর মানুষ দেখানোতে কিছু নেই। "

ভাবি আরো বেশ কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলেন। যোহরের আযান  হয়ে যাওয়ায় যোহরের নামাজ পড়ে নিলাম। বাসার একটু কাজ করে, শুয়ে রইলাম। বাসায় আর কেউ থাকে না। তাই কাজও বেশি নয়। 

ভাবির কষ্ট দেখে মনটায় অনেক চিন্তা আসলো। আজকে আমি যদি ভাবির মতো এমন করতাম। স্বামীর চোখের জলটা সহ্য করতে পারতাম না। 

আসরের নামাজ পড়ে অল্প ইফতারও বানিয়ে নিলাম। ইফতার করে মাগরিবের নামাজ পড়ে নিলাম। রাতের জন্য রান্না বসিয়ে দিলাম। আজকে তাড়াতাড়ি চলে আসছে আমার স্বামী। 

কলিং বেল বাজালে দরজা খোলে দিলাম। আমার হাতে একটা প্যাকেট দিলো। আমি সেটা রেখে পানি দিলাম। 
একটু রেস্ট করার পর। উনার সামনেই সেই প্যাকেট খুললাম। দেখি একটা শাড়ি। শাড়িটাও বেশ পছন্দ হয়েছে। দাম সেটা না হয় নাই বা বলি। সাধ্যের ভেতর যতটুকু দিয়েছে। আল্লাহর নিকট শুকরিয়া। হয়তো এমন শাড়ি অনেকে কেনার স্বপ্ন দেখে, আবার কারো কাছে সেটা কমদামি। 

এতটুকুতেই তৃপ্তি। আল্লাহর যেনো সবসময়ই আমাদের অল্প তে সন্তোষ থাকি, এমন রাখে। আমাদের চারপাশে  কিছু লোক দেখানোর জন্য নিজের ক্ষতি করে। সবাই যদি অল্পে তৃপ্তি থাকতো, কতই না সুন্দর হতো সংসার গুলো। 

---সমাপ্ত---

অণুগল্প -তৃপ্তি 
লেখা-সোলাইমান রানা (দাদা)

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post