জীবনের গল্প - পূর্ণতা love story
জীবনের গল্প - পূর্ণতা love story


ভদ্রমহিলা আমার দিকে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। ভদ্রমহিলাও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন, তবে কিছু বলছেন না। ভাবছেন হয়তো আমি লজ্জা পাচ্ছি। আসলে তা নয়। যেকোনো মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলার অঢেল সাহস আমার আছে। দুটো কারণে ভদ্রমহিলার থেকে চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছি। প্রথমতঃ ভদ্রমহিলা অত্যন্ত সুন্দরী। অতিরিক্ত সুন্দর এমন কিছুর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। চাঁদের চেয়ে সূর্যের সৌন্দর্য বেশি হলেও আমরা চাঁদকেই বেশি দেখি, সূর্যের সৌন্দর্য আমাদের সহ্য হয় না। এর কারণ কী? চাঁদের সৌন্দর্য মোলায়েম এজন্য আমরা চাঁদকে সহজভাবে দেখতে পারি। আর সূর্যের সৌন্দর্য প্রখর এজন্যই সূর্যের দিকে চোখ পড়লে চোখ নামিয়ে নিতে হয়। দ্বিতীয়তঃ ভদ্রমহিলা আমাকে কঠিন কোন প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমার খুব অস্বস্তি লাগছে। 

বাচ্চার মা কোথায়? আচমকাই প্রশ্নটি করলেন তিনি। আমি চুপচাপ বসে আছি। উত্তর না পেয়ে ভদ্রমহিলা ফের জিজ্ঞেস করলেন,  আপনার স্ত্রী বোধহয় জানেন না আপনার মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি। উনাকে খবর দিন, দ্রুত আসতে বলুন। বাচ্চাদের অসুস্থতার সময় মায়ের সঙ্গ বেশি প্রয়োজন। মায়ের আদর, যত্ন, ভালোবাসা ঔষধের মতোই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। ভদ্রমহিলার কথা বলার ভঙ্গিটা দারুণ। হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলেন। আমি অস্ফুটে বললাম, তুলির আম্মু নেই। ভদ্রমহিলা একটু থমকে গেলেন। বাচ্চার মা নেই মানে? আপনার স্ত্রী কি চলে গেছেন, মানে ডিভোর্স হয়ে গেছে নাকি মারা গেছে? 

তুলির আম্মু আর বেঁচে নেই। সোজা সহজ একটি কথা অথচ, বলার সময় আমার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছিলো। ভদ্রমহিলা খানিক চুপ থেকে বললেন, দুঃখিত, আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম। আমি বললাম, না, না, ঠিক আছে। তুলির অবস্থা এখন কেমন? তিনি বললেন, তুলির আঘাতটা গুরুতর। প্রচন্ড মানসিক চোট পেয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত সে একাকীত্বে ভুগছে। বাচ্চারা সাধারণত একা থাকলে ভয় পায় বেশি। আপনার মেয়ে কিছু একটা নিয়ে বেশ ভয়ে ছিলো। অনেকটা ডিপ্রেশনে ভুগছিলো। ডিপ্রেশন কতটা ভয়াবহ ব্যাধি সেটা আপনিও জানেন। তুলির বয়সটা অল্প হলেও একা একা ডিপ্রশনের সাথে এতটা লড়াই করেছে তা কল্পনিও। বিষয়টা আপনার লক্ষ করা উচিত ছিলো। মেয়েকে তেমন একটা সময় দেন বলে মনে হচ্ছে না। আপনার হেয়ালিপনার কারণেই আজ মেয়ের এই অবস্থা। 

ভদ্রমহিলা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। আজকাল একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। দিন-রাত ব্যবসা বাণিজ্য আর মিটিং ফিটিং নিয়ে পড়ে থাকি। তুলিকে তেমন একটা সময় দিতে পারি না। শেষ কবে তুলির সাথে বসে খেয়েছিলাম তা ঠিক মনে নেই। কতোদিন হয় মেয়েটার সাথে গল্প করা হয় না, ঘুরতে নিয়ে বের হই না, বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেই না। মেয়েটার শত অভিযোগ ছিলো আমার ওপর। সময় দিতে পারি না কেন? সারাদিন বাসায় একা একা থাকতো। খুব যখন ইচ্ছে হতো আমাকে কল দিতো। সারাদিনের জমানো সব কথা আমাকে বলতো। মেয়েটার সব কথায় আমাকে বলতো। আমি ভাবছিলাম, সবকিছু ঠিক-ঠাকই চলছে তাই এতোটা গায়ে লাগাইনি। কিন্তু মেয়েটা ভিতরে ভিতরে এতোটা কষ্ট পাচ্ছে জানতাম না। আমাকে কোনোদিন বলেওনি। আমার ব্যস্ততা তাকে একা করে দিয়েছে আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আমার দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ তুলি অসুস্থ হয়েছে। মা মরা মেয়েটা এত কষ্ট পাচ্ছে মেনে নিতে পারছি না। বাবা হিসেবে নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে। খুব খারাপ লাগছে, খুউব।

ভদ্রমহিলার অন্তর্দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। চট করে আমার মনের কথাগুলো পড়ে ফেললেন। বললেন, মেয়ের জন্য আপনার খারাপ লাগছে, খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। ভয়ের কোন কারণ নেই। তবে সুস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। আপনি চাইলে কালই তুলিকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন। আমি কিছু ঔষধ লিখে দিব এগুলো ঠিকমতো খাওয়াবেন আর খুব খেয়াল রাখবেন। মেয়ের প্রতি আপনাকে আরো যত্নশীল হতে হবে। ভালো হয় সবসময় ওর পাশে থাকতে পারলে।

ডাক্তার সাহেবার কথায় একটু স্বস্তি পেলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, আমিতো সবসময় তুলির পাশে থাকতে পারবো না, এদিকে ব্যবসা সামলাবে কে? আচ্ছা, তুলির দেখাশোনার জন্য একজন মানুষ রেখে দিলে কেমন হয়? এমনিতেও বাসায় কাজের লোক আছে, আর একজন না হয় শুধুমাত্র তুলির দেখাশোনা করবে। 

ভদ্রমহিলা আমার দিকে ক্ষিপ্ত চোখে তাকালেন। উনার এমন হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারণটা বুঝলাম না। আমি কি ভুল কিছু বলেছি? তিনি বললেন, সোহাগ সাহেব, আপনি ব্যবসায়ী মানুষ, অঢেল টাকাপয়সা কামিয়েছেন। চাইলে আপনি একজন নয় দশজন রেখে তুলির সেবাযত্ন করাতে পারবেন, তাতে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না। আপনার মেয়েকে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন যে, সবসময় তুলির পাশে থাকবে, গল্প, আড্ডা, হাসি, আনন্দে মাথিয়ে রাখবে, ওর ভালোলাগা, ভালোবাসা মন খারাপের কথাগুলো বুঝবে। সন্তানের মুখ দেখে মনের কথা বলে দেওয়া শুধুমাত্র একজন মায়ের পক্ষেই সম্ভব। তুলির আম্মু বেঁচে নেই। দুধের তৃষ্ণা যেমন শরবতে মিটে না তেমনি মায়ের অভাব মাসি দিয়ে পূরণ হয় না। এমনকি বাবাও পারে না। যদি পারেন আপনার মেয়ের জন্য একজন মায়ের ব্যবস্থা করুন।

ভদ্রমহিলার কথার ইঙ্গিতটা কী? তিনি কি আমাকে দ্বিতীয় বিবাহ করার কথা বলছেন? এটা সম্ভব নয়। আমার স্ত্রী দুনিয়া থেকে চলে গেছে কিন্তু আমি থাকে সবসময় অনুভব করি। আমি এখনো তাকে অসম্ভব ভালোবাসি। তাঁর সাথে তাঁর ভালোবাসাকেও কবর দিয়ে নতুন করে কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আপনি চাইলেই সম্ভব। চোখ তুলে বললেন তিনি। আমরা প্রত্যেকে কাউকে না কাউকে ভালোবাসি। কিন্তু সবাই ভালোবাসার মানুষকে আপন করে পায় না। সব ভালোবাসা বুকে চেপে দিব্যি অন্য কাউকে বুকে জড়িয়ে নিতে হয়। ধরে নিলাম, মৃত স্ত্রীর ভালোবাসা বুকে জড়িয়ে আপনি একাই থাকতে পারবেন। কিন্তু কতোদিন পারবেন? আর তুলির বিষয়টা একটু ভাবুন। আজ ওর মা বেঁচে থাকলে এমন অবস্থা হতো না। তুলিকে আপনি কি দিয়ে বুঝাবেন? মা ছাড়া সেই বা কতোটুকু ভালো থাকতে পারবে?
কথাগুলো যুক্তিসঙ্গতই বলেছেন। এমন করে কোনোদিন ভাবিনি। মেয়েটা আমায় প্রায়শই প্রশ্ন করে, সবার আম্মু আছে আমার আম্মু নেই কেন? আমাকে একটা আম্মু এনে দাও না। বাচ্চা মানুষ ভুলবাল বলে বুঝিয়ে রাখি। মা ফিরে আসবে একদিন মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়ে রাখি। কিন্তু এই চরম সত্যটাকে আর কতোদিন লুকিয়ে রাখবো? আমার ভীষণ ভয় করে, কিছু ভাবতে পারি না। তুলির জন্য আমি সব করতে পারি কিন্তু ওর কোন কষ্ট সহ্য করতে পারবো না।

সৎ মা নামটা শব্দটা শুনতেই কেমন জানি লাগে! সারা পৃথিবী জুড়ে সৎ মায়ের কত-শত গল্প। সবাই জানে সৎ মায়ের নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার কথা। আমি চাই না আমার মেয়েটার ওপর সৎ মায়ের আঁচড় পড়ুক। ভদ্রমহিলা খানিক চুপ করে রইলেন তারপর বললেন, গর্ভে ধারণ করা সন্তানকেও অনেক মা সহ্য করতে পারে না। চারপাশে একটু নজর দিয়ে তাকালেই দেখতে পারবেন। নিজের সন্তানকে দু'চোখের বিষ মনে করে। পরকিয়া কিংবা স্বাথের কারণে সন্তানকে হত্যা করছে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। একটু বর্তামানের কথা চিন্তা করুন, যৌবনের চাহিদা মেটাতে কত নারী সন্তান গর্ভে ধরে, তারপর কলঙ্কের ভয়ে পৃথিবীর আলো মুখ দেখার আগেই সন্তানকে মেরে ফেলে।  তাদের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?  সব সৎ মা খারাপ হয় না, কিছু সন্তানও সৎ মাকে দেখতে পারে। সৎ মায়ের আচার ব্যাবহার কেমন হবে তা নির্ভর করে সন্তান এবং স্বামী তাকে কীভাবে নিবে তার ওপর।  আপনি এমন কাউকে খুঁজে বের করুন যে সেচ্ছায় আপনার মেয়ের দায়িত্ব নিতে রাজি হবে। 

মানুষ বুঝা ও খোঁজা বড় কঠিন কাজ। এই আমি একদমই পারি না। আলাপচারিতার খাতিরে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আজ তাহলে উঠি বলে চেয়ার ছেড়ে  উঠে দাঁড়ালাম। তিনি লাজুক হেসে বললেন, শুনুন! তুলিকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি ওর দায়িত্ব নিতে চাই যদি আপনার আপত্তি না থাকে।  
বেশ অবাক হলাম। ভদ্রমহিলার মাথায় তারটাত ছিঁড়ে গেল নাকি? এই ভাবে কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয়? তিনি কি আমার সাথে রসিকতা করছেন? তিনি রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসছেন। আমি চলে আসতে চাইলাম। ভদ্রমহিলা পিছু ডেকে বললেন, এইযে শুনুন! আমি সজ্ঞানে সেচ্ছায় তুলির দায়িত্ব নিতে রাজি। আপনার সম্পর্কে যতটুকু জানার আমি জেনেছি। আপনি চাইলে আমার সম্পর্কেও খোঁজ খবর নিতে পারেন। আমি কথা না শুনার ভঙ্গি করে চলে আসলাম। সুন্দরী মেয়েদের কাছে বেশিক্ষণ থাকতে নেই, মায়া পড়ে যায়। আমি তার মায়ায় বাঁধা পড়তে চাই না।

তুলিকে বাসায় নিয়ে আসার পর থেকে ডাক্তার সাহেবা প্রায়শই আমার বাসায় আসেন। তুলি কখন কী করছে, টাইম মতো খাচ্ছে কি-না, ঘুমোচ্ছে কি-না, পড়াশোনা করছে কি-না ইত্যাদি ইত্যাদি খোঁজ-খবর নেন। আমিতো ব্যস্ত থাকি অতোটাও সময় দিতে পারি না। ভদ্রমহিলা এসে তুলিকে খাইয়ে দেয়, কখনো বসে গল্প করে, মাঝে মধ্যে ঘুরতেও নিয়ে যায়। খুবই যত্নশীল মানুষ। তুলির সাথে তার খুব ভাব জমে উঠেছে। আমার সাথে তেমন একটা কথা হয় না। আসলে আমি একরু দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করি। কখনো দেখা হয়ে গেলে আমি নিচের দিকে তাকিয়ে থাকি। তিনি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, আমি এখনো তার প্রশ্নের উত্তর দেই নি। আমি অবশ্য উনার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছিলাম। ডাক্তার সাহেবার নাম, 'কেয়া চৌধুরী'। বাবা-মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে মিরপুরের একটা বাসায় থাকেন। কিছুদিন আগে তিনি আমাকে একটা পত্র লিখেছিলেন। সেখানে তিনি অতীতের সব কথা তুলে ধরেছেন। ছাত্র জীবনে একজনকে ভালোবেসে ছিলেন। পারিবারিক আপত্তির কারণে তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি। পরবর্তীতে পরিবার থেকে অনেক পাত্র দেখা হলেও বিয়ে করতে রাজি হননি। অপূর্ণ ভালোবাসার স্মৃতি বুকে জড়িয়ে জীবন পাড় করছেন। পত্রটিতে তিনি আরো অনেক কথায় লিখেছেন। আমার আর তুলির বিষয়টাও তুলে ধরেছেন। 

কেয়া চৌধুরী শুধু একজন ভালো ডাক্তারই নয় খুব সুন্দর গুছিয়ে লিখতেও পারেন। তার লেখা একটা কবিতা আমার খুব মনে ধরেছে। মনের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করছি। আচ্ছা, আমি কি তার প্রেমে পড়েছি? মানুষ প্রেমে পড়ে, বারবার প্রেমে পড়ে। নতুন পুরাতন প্রেম বলে কিছু নেই। প্রেমে পড়লেই মানুষ নতুন করে ভাবতে শিখে।

নতুন মানুষের সাথে তুলির দিনকাল খুব ভালোই চলছে। কত সহজে দু'জন দু'জনকে আপন করে নিয়েছে। আমি তাদের ভালোবাসা দেখি আর ভাবি, এবার তাহলে একটা পূর্ণতার গল্প লেখা যেতেই পারে। ... সমাপ্ত 

গল্পঃ পূর্ণতা
লেখাঃ আলম সরকার ধ্রুব

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post