ছোট গল্প এক বৃষ্টিতে তোমাকে ফিরে পাওয়া Short story in bengali obohelajibon blog
ছোটগল্প: এক বৃষ্টিতে তোমাকে ফিরে পাওয়া


সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। এসময় বাইরে আড্ডা দেয় নিয়ন। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাই বের হতে পারেনি সে। হাতে একটা জলন্ত সিগারেট নিয়ে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে নিয়ন। বৃষ্টি দেখছে সে। বৃষ্টির দিনগুলো বড়ই অদ্ভুত হয়। এই বৃষ্টি পুরোনো সব স্মৃতিগুলো যেন পরিষ্কার করে চোখের সামনে তুলে ধরে। আর মানুষের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যায়। এই মুহুূর্তে ঠিক তাই অনুভূতি হচ্ছে নিয়নের। নিয়ন প্রচন্ড মিস করছে লিয়াকে। 

একটা ভুল বুঝাবুঝি কিভাবে সুন্দর সম্পর্ককে নষ্ট করে দুইটা মানুষকে আলাদা করে দিতে পারে তা কাছ থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। লিয়া আর নিয়ন দুজন দুজনকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। সবার নজরে তারা পারফেক্ট জুটি ছিল। কিন্তু একটা ভুল বুঝাবুঝি ব্রেকআপে গড়িয়ে গেল যা কেউ ভাবতে পারে নি। 

যেদিন ওদের সম্পর্কের শেষ দিন ছিল সেদিন নিয়ন লিয়াকে বলেছিল সে ভার্সিটিতে আসতে পারবে না। তার একজন আত্মীয় হাসপাতালে আছে তাই তাকে হাসপাতালে যেতে হবে। লিয়া একাই ভার্সিটিতে চলে আসে। হাসপাতালে ভিজিটিং তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ায় 
নিয়ন লিয়াকে সারপ্রাইজ দিবে বলে ভার্সিটিতে আসছিল। আসার সময় সে লিয়ার জন্য একটা গোলাপ কিনে নিয়ে এসেছিল।

লিয়ার ক্লাস শেষ হতে দেরি তাই নিয়ন ইবলিশ চত্তরে বসে অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ তার সামনে একটা আনএক্সপেক্টেড মানুষ এসে দাঁড়ালো। তার নাম অাদিনা। বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া মেয়ে। সে নিয়নের প্রতি খুবই অবসেসড।
যদিও সে খুব ভালোভাবেই লিয়া আর নিয়নের সম্পর্কের কথা জানে। তবুও সে নিয়নের পেছনে ছুটে। আদিনার ব্যাপারে লিয়াও সামান্য জানে। আদিনা নিয়নের সামনে এসে দাঁড়ালে নিয়ন অপ্রস্তুতভাবে বলল,
-- আপনি এখানে?
-- হ্যা আমি। লিসেন মিস্টার, হাজারটা ছেলে
   আমার পেছনে ঘুরে। আমি পাত্তা দেই না।
   কিন্তু তুমি আমাকে নিয়ে মজা নিচ্ছো। তুমি
   আমার দম দেখতে চাও আমি চাইলে কি
   করতে পারি?
-- আপনি ভালোভাবেই জানেন আমার
   গার্লফ্রেন্ড আছে। 
-- হা হা। দ্যাট গার্ল, লিয়া? ওহ্ মাই গড, সে
   আমার নখের যোগ্যও না। ওর মধ্যে কি আছে
   যা আমার মধ্যে নেই?
-- সে আমার ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র
   যোগ্য মানুষ। ওর মধ্যে আর যাই হোক
   আপনার মতো বেহায়াপনা নেই। আপনি যা
   ভালো মনে হয় করুন বাট আমাকে বিরক্ত
   করবেন না প্লিজ।
কথাটা শুনে আদিনা বেশ অপমানিত হলো। রাগে সে ব্যাগ থেকে একটা ব্লেড বের করে হাতে ধরলো। নিয়ন প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল। সে জোর করে ব্লেডটা কেড়ে নিতে যাচ্ছিল কিন্তু ব্লেডে লেগে আদিনার হাত সামান্য একটু কেটে গেছে। নিয়ন কি করবে উপায় না পেয়ে পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে আদিনার হাতটা চেপে ধরলো। আদিনা হাসছিল। 

লিয়ার একটা ক্লাস না হওয়ায় সে তার বেস্ট ফ্রেন্ড ইহানার সাথে সাথে ঘুরছিল। একজ্যাক্টলি যখন নিয়ন আদিনার হাতটা চেপে ধরে ঠিক সেই মুহুূর্তে লিয়া পাশের রাস্তা দিয়ে ক্রস করছিল। সে দূর থেকে নিয়নকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিন্তু আদিনা উল্টোদিকে ঘুরে ছিল বলে লিয়া ওকে দেখতে পায় নি। লিয়া ইহানাকে থামিয়ে দ্রুত পায়ে হেটে নিয়নের সামনে দাঁড়ালো। লিয়া নিয়নকে আদিনার হাত চেপে ধরে থাকতে দেখে চমকে গেল। নিয়নও লিয়ার দিকে খুব অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। তা দেখে আদিনা পেছনে ঘুরে তাকালো এবং সে সিচুয়েশনের মজা নেওয়ার জন্য নিয়নের হাত থেকে ফুলটা নিয়ে মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেল। নিয়ন শূন্য হাত পা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিয়ার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। নিয়ন ঘোর কাটিয়ে দ্রুত এসে লিয়ার হাত ধরে বলল,
-- দেখো তুমি যা ভাবতেছো তার বিন্দুমাত্র কিছু
   না। দিজ ওয়াজ এ ট্র্যাপ। আমি সত্যি বলছি
   লিয়া। বিশ্বাস করো। 
লিয়া শুধু এইটুকু বলল,
-- আমার হাত ছাড়ো। 
নিয়ন ভয়ে হাতটা ছেড়ে দিল। তারপরে লিয়া সেখান থেকে চলে গেল। পরে অনেকবার নিয়ন ফোনে লিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, সামনাসামনি কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু লিয়া কিছুই শোনে নি। নিয়নও হাত পা গুটিয়ে নিয়েছে। সে সরি পর্যন্ত বলে নি কারণ যেই লিয়াকে সে এতো ভালোবাসে সে কিনা তাকে বিশ্বাস পর্যন্ত করলো না। একটাবার তার কথাও শুনলো না।
নিয়ন আর লিয়ার ব্রেকআপের ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। তারপর থেকে পথে ঘাটে অনেক জায়গায় দুজন দুজনকে দেখেছে কিন্তু কেউ কারো সামনে যায়নি। নিয়ন ইহানার কাছ থেকে নিয়মিত লিয়ার খোঁজ নেয়, লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে দেখে আর কষ্ট পায়। ইহানাও লিয়াকে বুঝিয়েছে কিন্তু সে কোন জবাব পায়নি। দিন এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল।

বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। আর নিয়নের মনে ছটপটানিও বেড়ে যাচ্ছে। সে সিগারেটটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে রুমে এসে ফোনটা হাতে নিল। তারপরে ফেভারিটে সেভ করা পুরোনো নাম্বারটা বের করলো। খুব অস্থির ফিল হচ্ছে নিয়নের। ফোন দিবে কি দিবে না এই দ্বিধায় ভুগছে সে। আদৌ নাম্বারটা সচল কিনা, ফোনটা রিসিভ হবে কি না, রিসিভ করলেই বা এতদিন পরে সে লিয়াকে কি বলবে এসব ভাবনা নিয়নকে কাঁপিয়ে তুলছে। কল অপশনে হাত দিতে গিয়েও দিচ্ছে না সে। কিন্তু আজকে তার যেভাবেই হোক লিয়ার সাথে কথা বলতেই হবে। 

হঠাৎ কি যেন ভেবে নিয়ন বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। ঝুম বৃষ্টি। চারিপাশে অন্ধকার প্রায়। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। চারপাশে শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক। লিয়ার হোস্টেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো নিয়ন। লিয়ার রুম সে ভালোভাবেই চিনে। এর আগে হোস্টেলের পেছন দিকের জানালা দিয়ে বহুবার লুকিয়ে লিয়ার সাথে দেখা করেছে নিয়ন। তখন রাত নয়টার কাছাকাছি। বাইরের মাঠ থেকে কিছু নুড়ি পাথর কুড়িয়ে সে হাতে নিলো। ধরা পড়লে জরিমানা গুনতে গুনতে অবস্থা খারাপ হবে কিন্তু আজ সে কোনকিছু পরওয়া করছে না। সে সাত পাঁচ না ভেবে লিয়ার জানালা বরাবর একটা পাথর ছুঁড়ে মারলো। 

লিয়া তখন শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছিল। কাঁচের জানালায় পাথরের টোকা লাগতেই সে চমকে গেল। কিন্তু সে উঠে দেখলো না। নিয়ন আবার একটা পাথর ছুঁড়ে মারলো। এভাবে পরপর কয়েকটা পাথর সে ছুঁড়তে থাকলো। এবার লিয়া বইটা পাশে রেখে জানালায় এসে দাঁড়ালো। কাঁচটা খুলতেই তার হৃৎপিন্ড বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় হলো। লিয়া কল্পনাতেও ভাবেনি নিয়ন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাও এতগুলো মাস পরে। লিয়া জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। নিয়নও নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে কাঁকভেজা ভিজছে। পাঁচ মিনিট দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবতা ভেঙ্গে নিয়ন বলল,
-- প্লিজ একটাবার নিচে আসতে পারবা? প্লিজ...
লিয়া কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার আজ নিয়নকে ফিরিয়ে দিতেও ইচ্ছা করছে না। সে জানালাটা বন্ধ করে দিল। এতে নিয়ন খুব আশাহত হলো। তারপরেও সে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ রুমের মধ্যে পাইচারি করছে লিয়া। তার খুব অস্থির অনুভব হচ্ছে। সে আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে নিচে নেমে গেল। 

নিয়ন ঠান্ডায় কাঁপছে। লিয়াকে আসতে দেখে তার মুখে হাসি ফুটলো। লিয়া এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। নিয়ন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-- আমি সরি। আমি যেই কাজ করিনি তার
   জন্যেও আমি সরি বলছি। বিশ্বাস করো আমি
   শুধু তোমাকে ভালোবাসি। আমি প্রত্যেকটা
   দিন তোমাকে মিস করি। আমি আর পারছি
   না তোমাকে ছাড়া থাকতে। আমার তোমাকে
   চাই লিয়া। 
লিয়া চুপ করে আছে। আর নিয়ন সেদিনের অব্যক্ত থাকা কথাগুলো গড়গড় করে অক্ষরে অক্ষরে বলে যাচ্ছে। লিয়ার চোখ ভর্তি পানি। লিয়া নিয়নকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-- আমার রাগ ভাঙ্গার পরে আমি প্রত্যেকটা দিন
   অপেক্ষা করেছি তোমার ফেরত আসার। কিন্তু
   তুমি আসো নি। আমি সরি যে আমি তোমাকে
   ভুল বুঝেছিলাম। তুমি কেন এতো দেরি করে
   এলে? আমাকে এতো কাঁদালে কেন নিয়ন?
   আমাকে আর কখনো ছেড়ে যেও না প্লিজ।
নিয়নও লিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
-- আমি কোনদিন তোমাকে ছেড়ে যাবো না।
   আই প্রমিস।

ছোটগল্প: এক বৃষ্টিতে তোমাকে ফিরে পাওয়া
লেখনীতে: নূর-এ সাবা জান্নাত

Post a Comment

কমেন্টে স্প্যাম লিংক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন

Previous Post Next Post